ঘরোয়া উপায়ে তোতলামো দূর করার উপায়

ছোট শিশুদের মধ্যে আদো আদো কথা বলা কিংবা সামান্য তোতলামি কোন নতুন বিষয় নয়। একটি শিশু যখন কথা বলতে শেখে সেই সময় বেশ কিছু শব্দ শিশুটি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না কিংবা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না, তবে এই বিষয়টি একেবারেই সাধারণ। শিশু বেড়ে ওঠার সাথে সাথে তার এই কথা আটকে যাওয়ার সমস্যাটি যদি থেকে যায় তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেননা যদি সঠিক সময় মতো শিশুদের মধ্যে থেকে এই তোতলামির ভাব সরানো না যায় তাহলে পরবর্তী সময় শিশুদের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হয়, যার ফলে বাচ্চারা কারো সাথে মন খুলে কথা বলার কিংবা তার মনের কথা কাউকে বলা বন্ধ করে দেয়, লোকজনের সামনে হঠাৎ করে কথা বলতে ইতস্তত বোধ করে। একটা সময় পর থেকে এই তোতলামি টা শিশুর পক্ষে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এটি এমন কিছু বিষয় নয়, শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ছাড়াই বড় হওয়ার সাথে সাথে এগুলো কমে যায়। তবে অনেক সময় শিশু অবস্থাতে ঠিকভাবে বাবা মায়েরা লক্ষ্য না করার ফলে বড় হওয়া অবধি এটা থেকে যায়, যা পরবর্তী সময়ে এক অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি তোতলামির সমস্যায় ভুগছে তাকে স্বাচ্ছন্দ এবং আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে এবং বিভিন্ন স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে নিজের এই সমস্যা দূর করতে হবে। আসুন আজকের নিবন্ধ থেকে আমরা জেনে নিই কিভাবে ঘরোয়া উপায়ে এই তোতলামির সমস্যার সমাধান আমরা করতে পারবো।

 

১. অভ্যাসগুলো বোঝার চেষ্টা করুন

কথা বলতে গিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি কি একই বর্ণ বা একই সিলেবল বারবার উচ্চারণ করছেন, নাকি শব্দটি লম্বা সময় ধরে টেনে উচ্চারণ করছেন।

 

আপনি আপনার তোতলামির সমস্যা কে কিভাবে দেখছেন, সেটাও একটা বড় ব্যাপার। কোনো পরিস্থিতিতে বা কারো সাথে কথা বলার সময়, আপনি এই সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে পারছেন কিনা লক্ষ্য করুন। আপনার অভ্যাসগুলো ঠিকমত বুঝতে পারলে, আপনি আপনার তোতলামির সমস্যাটি সহজেই দূর করতে পারবেন।

 

২. মনকে রিল্যাক্স রাখুন

দুশ্চিন্তা বা নার্ভাসনেস তোতলামির সমস্যার একটি বড় কারণ। যথাযথ উদ্বেগমুক্ত হওয়ার মাধ্যমে সমস্যাটি সহজেই দূর করা যায়। কথা বলতে গিয়ে তোতলানোর সমস্যা দূর করার জন্য মনকে রিল্যাক্স রাখতে হয়। মনকে রিল্যাক্স রাখার বেশ কিছু পদ্ধতি আছে।

 

কথা বলার প্রয়োজন হলে বা কাউকে আপনার কথা শোনাতে চাইলে, প্রথমে কিছু সময় নিয়ে নিজের মনকে শান্ত করুন। এক্ষেত্রে আপনার যতটুকু সময় প্রয়োজন আপনি ততটুকু সময়ই নিন।

 

৩. কথা বলতে স্বচ্ছন্দবোধ হয় এমন কারো কথা ভাবুন

প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী বক্তারাও নার্ভাসনেসের কারণে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ আটকে যান। যাদের তোতলামির সমস্যা আছে তাদের ক্ষেত্রে এরকম পরিস্থিতি আরো দুর্বিষহ। ভয় পান বা অপছন্দ করেন এমন কোনো ব্যক্তির মুখোমুখি হলে, এই সমস্যাটি আরো বেড়ে যাচ্ছে? তাহলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করুন।

 

সবাই আপনার এই সমস্যা নিয়ে মজা করার জন্য সুযোগ খুঁজছে। প্রথমেই এমন চিন্তাভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসুন।

 

 

নতুবা আপনি আরো বেশি তোতলামির সমস্যায় জড়িয়ে পরবেন। এবং সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে পারবেন না। বরং এটা ভাবুন, সবাই আপনার কথা শুনতে বেশ আগ্রহী।  

 

যখন আপনি আপনার কাজের সহকর্মীদের সাথে কথা বলতে ভয় পান তখন কল্পনা করুন, যে এই মানুষগুলো আপনার কাছের বন্ধু বা আপনার পরিবারের কেউ। এরকম চিন্তাভাবনার ফলে আপনি শীঘ্রই আত্মবিশ্বাসী এবং সাহসী হয়ে উঠবেন।

 

৪. ধীরে ধীরে কথা বলুন

এই পদ্ধতিটি অদ্ভুত মনে হলেও বেশ কার্যকরী। তাই ধীরে ধীরে কথা বলা শুরু করুন। কথা বলার সময় বা তোতলানোর সময় দুশ্চিন্তা করলে, ঠোঁট এবং জিভের উপরও প্রভাব পড়ে। তাই ধীরে ধীরে এবং নরমভাবে কথা বলুন।

 

আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট শব্দ বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন না? বা পছন্দ করেন না এমন শব্দ বলতে গেলে সমস্যা হচ্ছে?আবার, বলতে ভয় পান এমন শব্দ আপনাকে কথা বলতে বাঁধা দিচ্ছে?

 

তাহলে শব্দটি শুধু একটু সময় নিয়ে উচ্চারণ করুন। যেমন ফ্যাশন শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়ে সমস্যা হলে বলতে পারেন ফ্যা-শন।

 

কথা বলতে গিয়ে আপনার কতটুকু সময় লাগছে তা নিয়ে ভাববেন না। দুশ্চিন্তা করবেন না এবং খেয়াল রাখবেন দুশ্চিন্তা আপনার মুখের পেশীতে যেন কোনো প্রভাব না ফেলতে পারে।

 

এভাবে চর্চা করলে আপনি একসময় শিখে যাবেন কিভাবে ধীরে ধীরে কথা বলতে হয়। তখন কথা বলার সময় আপনার আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে যাবে।

 

এই পদ্ধতির সাহায্যে আপনি তোতলামির সমস্যাকে চিরতরে দূর করতে পারবেন।

 

৫. চিন্তাভাবনা এবং শব্দগুলো কল্পনা করুন

গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কে কিছু অনিয়মের কারণে তোতলামির সমস্যা দেখা দেয়। বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ভূমিকা হল-এটি প্রথমে আমাদের চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়াকে ধারণ করে।

 

এরপর আমাদের ভাবনাগুলোকে শব্দে রূপান্তর শেষে বাক্য হিসেবে তৈরি করে দেয়। তোতলামির সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে কল্পনা করা বা ভিজুয়ালাইজেশন একটি পরীক্ষিত উপায়। কথা বলার সময় এটি মস্তিষ্ককে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।

 

কল্পনা করা বা ভিজুয়ালাইজেশন অন্যদের সাথে কমুউনিকেশন বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। স্পিচ বিশেষজ্ঞরা তাদের আর্টিকুলেশন থেরাপিতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা তোতলামির সমস্যা সহজেই দূর করতে কার্যকরী।

 

এই পদ্ধতি মস্তিষ্ককে দ্রুত তথ্য সাজাতে, শব্দ গঠন করতে এবং কথা সাবলীলভাবে বলতে সাহায্য করে। কথা বলার সময় সেই শব্দগুলো কল্পনা করে, আপনি সহজেই আপনার জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

 

৬. জোরে পড়ুন

পড়ার জন্য মজার কোনো বই নিন এবং আপনার পছন্দমত জায়গা বা আপনার ঘরে গিয়ে বসুন। এবার সর্বোচ্চ ভলিউমে গান ছেড়ে দিয়ে জোরে জোরে পড়ার চেষ্টা করুন। পাশেই একটি রেকর্ডার রাখুন আপনার কথা রেকর্ড করার জন্য।

 

বইটি পড়ে শেষ করার পর, আপনার করা রেকর্ডিংটি শুনুন। আপনি খুবই অবাক হবেন যে, সম্পূর্ণ রেকর্ডিং এ খুব কমই আপনার তোতলানোর সমস্যা দেখা গেছে। কারণ আমাদের আমাদের বাম মস্তিষ্ক কথা বলা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ডান মস্তিষ্ক গান গাইতে সাহায্য করে।

 

তাই গান শুনতে শুনতে বা গানের সুরে কথা বলতে চেষ্টা করুন। এতে করে দুই পাশের মস্তিষ্ক নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের সেতু তৈরি করতে সক্ষম হবে। এই চর্চার মাধ্যমে আপনি আপনার জড়তা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

 

দৈনন্দিন কথাবার্তায় এই পদ্ধতিতে কথা বলা অসম্ভব। তবু এই অনুশীলন আপনাকে আপনার আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে সাহায্য করবে, যে আপনি আপনার তোতলামির সমস্যা জয় করতে সক্ষম।

 

৭. আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চর্চা করুন

তোতলামির সমস্যা দূর করতে আপনি এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আপনি যে কোনো কিছু নিয়ে কথা বলতে পারেন।

 

যেমন, আবহাওয়া, কোনো কিছু নিয়ে আপনার পরিকল্পনা ইত্যাদি।  এই পদ্ধতি আপনার ভেতর আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে সাহায্য করবে। ফলে আপনি তোতলানোর সমস্যা কাটিয়ে সহজ ও সাবলীল্ভাবে কথা বলতে পারবেন।

 

সর্বোপরি মনে রাখবেন তোতলামো কোনো লজ্জার বিষয় নয়।