মিলির হারিয়ে যাওয়া

লিফট থেকে বের হয়ে বাঁ দিকের ফ্ল্যাটের কলিং বেল চাপ দিল সোহান। সাথে সাথে অজানা এক আতঙ্ক শরীরে ভর করল। শক্ত করে নিল নিজেকে। দরজা খুলতেই মাথা নিচু করে সোজা নিজের রুমে চলে যায়। কাঁধের ব্যাগটি রেখে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিল। মাধ্যমিক শেষ করে সবে মাত্র উচ্চমাধ্যমিকে উঠেছে সে।প্রাইভেট পড়া শেষ করে ফিরতে কিছুটা রাত হয়। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এসিটা ছাড়তেই মিলি এসে বসলো পাশে।
 – ভাইয়া, আমার না এ বাসায় থাকতে আর একটুও ভালো লাগছে না। রোজ রোজ আর সহ্য হচ্ছে না এসব।
 সোহানের ছোট বোন মিলি। দেশের নামকরা স্কুল থেকে সামনের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। 
-আজও কি কেউ কিছু ভেঙেছে নাকি? জিজ্ঞেস করল সোহান।
– দেখিসনা প্রতিদিন কি হয়? এ বাসা ছেড়ে যদি অন্য কোথাও চলে যেতাম, তবেই শান্তি লাগত। উত্তর দিল মিলি।
 কি হয়েছে বুঝতে বাকি রইল না সোহানের। 
প্রতিদিন একবার এমন না হলে বোধ হয় সবুর চৌধুরী আর সালমা চৌধুরী ভাত হজম হয়না। মিস্টার চৌধুরী ও মিসেস চৌধুরী মিলি সোহানের বাবা- মা। 
সবুর চৌধুরী উচ্চ বেতনে বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। এ বাড়িটি সবুর চৌধুরীর  মালিকানাধীন। সোহানের সাথে সবুর চৌধুরীর অনেক দূরত্ব। শেষ কবে কথা হয়েছে মনে নেই। মিলির সাথে ও একই অবস্থা। অথচ এক বাসাতেই থাকে সবাই। সকালবেলা সালমা চৌধুরীর সাথে ঝগড়া করতে করতে বেরিয়ে যাওয়া, আর রাতে বাসায় ফিরে ঝগড়া করতে করতে  ঘুমিয়ে যাওয়া তার জীবনের রুটিন। অবশ্য মাঝে মাঝে অফিস থেকে রাতে বাসায় ফিরে না মিস্টার চৌধুরী। পরদিন সালমা চৌধুরীর প্রচন্ড জেরার সম্মুখীন হন। চলতে থাকলে দুজনের প্রশ্ন আর পাল্টা প্রশ্ন। এ সময়টাতে শব্দ দূষণ বোধহয় ১২০ ডেসিবেল থেকেও বেশি হয়।
 ওদিকে মা সালমা চৌধুরী ফ্যাশন সচেতন মানুষ। মাসে মোটা অংকের টাকা ফ্যাশন চর্চার পেছনে ব্যয় হয়। উচ্চশিক্ষিত সালমা কোনোভাবেই চাকরি ছাড়তে নারাজ। এ নিয়েই কত ঝগড়া হয়েছে। কিন্তু মিসেস চৌধুরীর একটাই যুক্তি।
– পড়াশুনা করেছি ঘরে বসে থাকার জন্য না। চাকরি না করে তোমার কাছে ভিক্ষুকের মতো হাত পাতবো, এটাই তো চাও তুমি। এ আমার দ্বারা হবে না। আর চাকরি ছাড়বোই বা কেন? তুমি কতটুকু সময় দাও  সংসারে? যে রাতে অফিসের কথা বলে বাসায় থাকনা, সে রাতে মোবাইল বন্ধ থাকে কেন? এর জবাব দাও।
জবাবে চৌধুরী সাহেব বলে:
– দেখো সালমা এত সন্দেহ করলে চলে না। আর আমার ব্যক্তিগত কাজের কৈফিয়ৎ চেওনা।
– তাহলে আমার চাকরি নিয়েও কথা বলবেনা। জবাব দেয় মিসেজ সালমা।
– কি বললে? তোমার চাকরি নিয়ে কথা বলা যাবেনা। তাহলে আমাকে স্বীকৃতি দিলে কতটুকু? তোমার প্রমোশন কিভাবে হয়েছে কিছু বুঝিনা মনে করেছ? 
– দেখ সবুর,  সবাইকে তোমার মত মনে করবে না বলে দিলাম। আর স্বীকৃতির কথা তোমার মুখে মানায় না। যে লোক অফিসের কথা বলে…. (কিছুক্ষন চুপ থেকে) তার আবার স্বীকৃতি! 
 উত্তেজিত হয়ে ওঠে মিস্টার চৌধুরী। মিসেজ চৌধুরীর ও উত্তেজনার পারদ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত কোন দিন কি হয় কেউ বলতে পারে না।
– কিছু খেয়েছিস? মিলির প্রশ্ন। 
– নাহ। উত্তর দিলো সোহান। 
-আয়, ভাত খেয়ে নেই। তোর জন্য বসে আছি। 
-মা বাবা কই? সোহানের প্রশ্ন।
-কই আবার? তাদের রুমে বসে আছে। মেজাজ খারাপ। তাই এখন কিছু বললে উল্টো আমাদের উপর ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়ে যাবে, জানিস না।
 ভাত খেতে খেতে দু চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে মিলির।
– কিরে কাঁদছিস কেন? প্রশ্ন করে সোহান। 
-ভাইয়া, কতদিন বাবা মার সাথে বসে একসাথে খাওয়া হয়না বলতো? 
চুপ করে রয় সোহান।
২.
পরদিন স্কুলের মাঠে একা বসে আছে মিলি। দূরে কোথাও এক পলকে তাকিয়ে আছে।মনটা ভাল নেই। মিলির মন খারাপ দেখে সামিয়া প্রশ্ন করে:
– কিরে ক্লাসে দেখলাম মন খারাপ। টিফিন টাইমেও একা একা বসে আছিস। কি হয়েছে তোর? শরীর অসুস্থ নাকি? নাস্তা খাবিনা? 
-নারে, শরীর খারাপ না।আর কিছু খেতে ভাল লাগছে না। তুই খেয়ে আয়। উত্তর দেয় মিলি। 
সামিয়া চলে যায়। সে মিলির বান্ধবী। দুজনে  আগে কত মজা করত! ক্লাসে একসাথে বসা, একসাথে নাস্তা খাওয়া, এক গ্রুপে প্র্যাকটিক্যাল করা.. মনে হত যেন জোড়ের কবুতর। কিন্তু এখন  সবই অতীত। আগের মত প্রাণবন্ত নেই মিলি। বান্ধবীদেরকে  কেমন জানি এড়িয়ে চলে। একা একা থাকতে চায়। এদিকে ক্লাসের পড়া ও ঠিকঠাক মতো আদায় করছে না। প্রায়ই ম্যামের বকা শুনতে হয়। তার জীবনটা কেমন যেন ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে।
 মিলি বান্ধবীদের কাছে বাবা-মার সাথে বেড়াতে যাবার গল্প শুনে। আজ আব্বু এটা গিফট করেছে, ওটা গিফট করেছে। ফেসবুকে পারিবারিক আনন্দের মুহূর্ত গুলো শেয়ার করে তারা।কিন্তু মিলির জন্য এগুলো যেন বামন হয়ে চাঁদ ধরার মতো। সেই ছোটবেলায় বাবা-মা আর ভাইয়া সহ কক্সবাজারে গিয়েছিল। এখন সব কথা মনে নেই। কিন্তু অনেক মজা হয়েছিল সে বার। 
এরই মধ্যে ঘন্টা বেজে উঠল। মিলি ক্লাসে চলে যায়।
৩.
রিক্সা থেকে নেমে মিলি টাকা দিচ্ছিল রিকশাওয়ালাকে। পাশেই কয়েকটি চা দোকান। দোকানের মানুষগুলো কেমন করে জানি তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হয় সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু সে। সাথে বড় কেউ থাকলে অবশ্য এমন হয় না। কিন্তু একা থাকলেই কেমন জানি হয়ে যায় এরা। টাকা দিয়ে তড়িঘড়ি করে বাসায় চলে আসে। 
মা-বাবা এখনো ফেরেনি। সন্ধ্যা হবে ফিরতে। মিলি নিজের রুমে এসে বসল। মাথায় ওই দৃশ্যটা এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে। রিক্সা দিয়ে বাসায় আসছে সে। আর রাস্তাঘাটের ছেলেগুলো বারবার তার দিকে তাকাচ্ছিল। কেউ কেউ হাসছিল। কিন্তু  হাসিটা যেন স্বাভাবিক নয়। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকে মিলি। রাস্তায় বের হতে এখন কেমন জানি সংকোচ কাজ করে। ঘরের ভেতরে কিছুক্ষণ পর কি শুরু হয় কে জানে? পরিবেশটাও যেন মিলিকে  পর করে দিয়েছে। কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে হতে থাকে দূরে কোথাও যদি হারিয়ে যেতাম তবেই শান্তি পেতাম। যেখানে থাকবে না কোন অশান্তি, কোন ভয়।কিন্তু কোথায় আছে এমন পরিবেশ? কোথায় গেলে পাওয়া যাবে? আর ভালো লাগছে না এ সব। হারিয়ে গেলেই বাঁচি। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। ভাইয়া আসার সময় হয়েছে।
৪.
পরদিন ক্লাস শেষ করে স্কুল গেটের দিকে আসতেই পেছন থেকে আওয়াজ এলো।
– এই মিলি, দাড়াও।
 মিলি পেছনে তাকিয়ে দেখে সুমি ম্যাডাম। মনোবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক। মিলির মায়ের বান্ধবী।  তাকে খুব স্নেহ করে। মিলি সামনের দিকে এগিয়ে ম্যাডামের কাছাকাছি যেতেই
–  একটু আমার রুমে এসো। তোমার সাথে কথা আছে।
 রুমে গিয়ে মিস সুমি মিলিকে বসতে বলে। সুমি বুঝতে পারছে পড়াশুনা নিয়ে কিছু না কিছু কৈফিয়ত দিতে হবে। এভাবে পড়াশুনা করলে চলবে না। আরো সিরিয়াস হতে হবে। তা না হলে তোমার মায়ের কাছে কিন্তু নালিশ যাবে। আরো কত কি? 
ইতিমধ্যে সুমি ম্যাডাম কথা বলা শুরু করে:
– মা, আজকের ক্লাসে তোমাকে কেমন জানি মনে হলো। অনেকদিন যাবত দেখছি তুমি আগের মতো পড়াশুনা করছ না। কেমন মন মরা হয়ে বসে থাকো। কোন অসুখ-বিসুখ করেছে নাকি?
– না ম্যাম, অসুখ হয়নি। সামনের ক্লাস থেকে আর এমন হবে না। উত্তর দেয় মিলি।
– শোন, আমরা সাইকোলজি নিয়ে পড়েছি। মানুষ দেখলেই বলতে পারি কার মনে কি আছে। তোমার নিশ্চয়ই কোন না কোন সমস্যা হচ্ছে। আমাকে খুলে বল। কোন সংকোচ করো না মা । 
তার পর আরো অনেক কথা বলে।সুমি ম্যামের কথার জালে  আটকে যায় মিলি। জীবনের সমস্ত বিষয় খুলে বলে। তারপর বলে:
–  মেম, ঘরে বাইরে এমন সমস্যা নিয়ে পড়াশুনায় মনোযোগ  বসেনা। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় হারিয়ে যাই। 
-এমন কথা বলবে না মা। তুমি ছোট হলেও তোমার চিন্তা করার ক্ষমতা ভালো। দেখো মিলি 
life is not a bed of rose. জীবন পুষ্পশয্যা নয় ।
এখানে ভালো-মন্দ উভয়ই আছে। সুখ – দুঃখ আছে। সুখের সাথে দুঃখটাকেও মেনে নিতে হয়। আর দুঃখ কখনোই চিরস্থায়ী নয়। একদিন এর শেষ হবেই। তোমার সাথে যা ঘটছে তাতে তো তোমার কোন দোষ নেই। তাহলে তুমি নিজেকে দোষী ভাবছো কেন? যারা দোষ করছে তারা তো দিব্যি আছে । তাহলে তুমি কেন নিজেকে ছোট ভাবছো? মনে রেখো, আমাদের সমাজে ভালো মানুষের পাশাপাশি মন্দ মানুষ ও আছে। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তোমাদের বয়সে থাকতে আমাদের সাথেও কমবেশি এমন হতো। কিন্তু আমরা ভয় পাইনি। মন্দদের ছাড় দেইনি। হার মানিনি। আবার ভালো মানুষদের কাছ থেকেও পেয়েছি সম্মান,আদর-স্নেহ। তখন পূর্বের সব কষ্ট ভুলে গিয়েছি। পৃথিবীতে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। শুধু তুমি সৎ থেক। তাহলেই সঠিক পথ খুঁজে পাবে। 
আর একটা কথা মা তোমার মায়ের সাথে আমার কেমন সম্পর্ক তুমিতো জানো। কিন্তু বাসায় এত সমস্যার কথা আগে বলনি কেন আমাকে?
– আসলে ম্যাম, আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না। উত্তর দেয় মিলি।
– অসুবিধা নেই। সকল সমস্যার সমাধান তো একটা আছে। এমন সমস্যা শুধু তোমাদের না, অনেক ঘরেই হয়ে থাকে। তোমার মায়ের সাথে এই বিষয়ে আমি কথা বলব। দেখি কি করা যায়। 
একটু খেয়াল করে দেখো মিলি, তুমি কারো না কারো থেকে ভালো আছো। সেজন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ থেক। সব সময় সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখবে। তিনিই মানুষকে ভাল বা মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলেন।  মন্দ অবস্থায় তাঁর বান্দার আচরণ খেয়াল করেন। তার পরীক্ষা নেন। এ সময়  বান্দা তার প্রতি নাখোশ না হয়ে ধৈর্য্য ধরে সাহায্য চাইলে তিনি খুশি হন। তাকে আগের থেকে আরো ভাল অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন। 
আর ভাল অবস্থায় রাখলেও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখাতে হয়। এতে তিনি খুশি হন।  তাই যে অবস্থায় থাকো না কেন সৃষ্টিকর্তার কাছে তোমার মনের কথাটা বলবে। তিনি তোমার অবস্থা পরিবর্তন করবেন। তার কাছেই সাহায্য চাইবে। তিনি তার বান্দাদের উপর যুলুম করেন না।তার সাহায্য থেকে হতাশ হবেনা।
 ম্যামের সাথে কথা শেষ করে বাইরে বের হয় মিলি। বিস্তৃত আকাশের সাদা মেঘগুলো আজ অপূর্ব লাগছে। চারদিকের সবুজ গাছ গুলোকে আরো সুন্দর লাগছে। বুক ভরা নি:শ্বাস নিল মিলি। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা অনেক বড়।
লেখক,
জোনাইদ হোসেন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়