গোরখাদক

হঠাৎ করেই শুরু হল ঝুম বৃষ্টি। ইদানিং ধরে রাতের এই সময়টায় প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে৷ অবশ্য দিনের বেলায় প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ মানুষগুলোর কাছে রাতের এই বৃষ্টিটা যেন অন্যরকম এক প্রশান্তি বয়ে আনে।   

তবে আজকের এই বৃষ্টিটাকেই ঝামেলা মনে হচ্ছে কাদেরের কাছে। বাজার করে বাড়ি ফিরছিল সে। মাঝপথেই শুরু হল এই বৃষ্টি৷ বাড়ি থেকে বের হবার সময় ছাতাটা না নিয়ে বের হওয়ার জন্য নিজেকে মনে মনে গালি দিল সে। কিন্তু কি আর করার। নিজেকে গালি দিয়ে তো ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করা যাবে না। তাই দ্রুত পা চালালো সে। 

বৃষ্টিতে ভিজে কিছুদূর হাঁটার পর গাঁয়ের গোরস্থানটার কাছে পৌঁছল কাদের। গোরস্থানটার কাছাকাছি আসতেই বিকট শব্দে একটা বাজ পড়ল। প্রচন্ড আলোর ঝলকানিতে দূর থেকেই চোখে পড়ল বিশাল গোরস্থানটার অসংখ্য কবরগুলো। প্রায় একশ বছরের পুরনো এই গোরস্থানটা নিয়ে অনেক ঘটনাই লোকমুখে শোনা যায়। রাতের বেলায় অনেকেই নাকি গোরস্তানের মাঝ দিয়ে সাদা কাপড় পরা কাকে যেন হেঁটে যেতেও দেখেছে। 

গোরস্তানের সীমানা থেকে কিছুটা দূরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল কাদের৷ টর্চটা জ্বালিয়ে একবার চারপাশটা দেখে নিল সে। দিনের বেলায় লোকের সামনে সে যতই বলুক ভুতটুত বলে কিছু নেই কিন্তু তারপরও এই রাতের বেলা বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে গোরস্তানটার দিকে তাকাতেই কেমন যেন বুকটা কেপে উঠল কাদেরের। 

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” বলে বুকে সাহস সঞ্চয় করে সামনের দিকে পা বাড়ালো কাদের। দুই পা যেতেই আবারও বিকট শব্দে বাজ পড়ল। আলোর একটা ঝলকানি দিয়েই চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ‘কি ব্যাপার? টর্চটার কি হল?’ গাঢ় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে টর্চটা মুখের সামনে নিয়ে সুইচটা অফ করে আবার অন করল সে। ‘নাহ জ্বলছে না তো। কি হল আবার এটার?’ আরো কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও টর্চটা জ্বালাতে পারল না কাদের৷ তার মন চাচ্ছে টর্চটা মাটিতে আছাড় মারে। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে আলো ছাড়া গোরস্থানটা পাড় হতে হবে ভেবেই গলা শুকিয়ে গেল কাদেরের।

ঢোক গিলে আল্লাহর নাম নিয়ে আবার সামনের দিকে হাটা ধরলো কাদের৷ আল্লাহর নাম নিতে নিতে দ্রুত পা চালাচ্ছে সে। গোরস্তানের গেটটা পার হতেই কাদেরের মনে হলো গেটে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। ‘মনের ভুল নয়ত? পিছন ফিরে কি একবার দেখব? না না বাবা দরকার নাই।’ হাঁটা থামালো না সে। 

কিছুদূর যেতেই কাদেরের মনে হল তার পিছন পিছন কেউ একজন আসছে। থমকে দাঁড়ালো সে। ‘পিছন ফিরে কি তাকাবো? হতেও তো পারে আমারই মত কেউ বাজার করে ফিরছে? নাকি অন্যকিছু?’ দোনোমোনো করতে করতে পিছন ফিরে তাকালো সে। দেখার চেষ্টা করল পিছনে কেউ আছে কিনা? নাহ কেউ নেই। তাহলে মনের ভুল হবে হয়ত। সামনে ফিরে আবার হাঁটা শুরু করল কাদের। কিন্তু দুই পা যেতেই আবার তার মনে হল পিছনে কেউ আছে। আবার দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় পিছন ফিরে তাকালো সে৷ পিছন ফিরে তাকাতেই বিদ্যুৎ চমকে উঠল আকাশে। বিদ্যুতের সেই আলোয় সে দেখতে পেল তার থেকে দুইহাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো মূর্তি। মাথাটা একটা কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। আর মুখের জায়গায় মনে হচ্ছে একটা কালো গহ্বর। 

জিনিসটা দেখার পর কয়েক সেকেন্ড মূর্তির মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল কাদের। তারপর হুশ হতেই পিছন ফিরে দৌড় দিল সে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। কিছুদূর যেতেই পায়ে পায়ে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ল কাদের। হাত থেকে ছিটকে গেল বাজারের ব্যাগ আর টর্চটা। ঠিক তখনই আবার বিদ্যুৎ চমকে উঠল। বিদ্যুতের আলোয় সে দেখতে পেল কালো মূর্তিটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার দিকে।   

 

“কার ভাগ্যে যে কি লেখা থাকে ভাইজান এইটা কেউ কইবার পারে না।” 

“হাচা কতা কইছ শামসু। তয় গত এক সপ্তাহে আমাগো গ্রামে এই নিয়া তিনজন মইরা গেল বাজ পইড়া। এইডা কিন্তু খুব চিন্তার বিষয়?”

“সবই কপাল ভাই কপাল। কপালের লেখন কি আর খন্ডানো যায় কন?” 

“তয় কাদের পোলাটা বহুত ভালা আছিল।” 

মাথা নাড়তে নাড়তে গোরস্থান থেকে বের হয়ে বাড়ির পথ ধরল শামসুদ্দীন আর সাবের আলী। 

আজ সকালে গোরস্তানের সামনের রাস্তায় কাদের লাশটা প্রথম দেখতে পায় মতি। কানের কাছে কিছুটা জায়গা পুড়ে যাওয়া ছাড়া আর তেমন কোনো ক্ষত নেই শরীরে। এরপর বাদ আসর জানাজার পর কবর দেয়া হয় কাদেরকে। 

 

“কালু তোর এই গোরস্থানে রাতের বেলা থাকতে ভয় করে না?” লাশটা বস্তায় ভরতে ভরতে প্রশ্নটা করে জামিল। 

“কিসের ভয় করব? এই কালু কাউরে ডরায় না। বুঝলা জামিল ভাই?” 

“নাহ এতোগুলো কবর চারিদিকে। ভয় তো করবারই পারে,” বস্তার মুখটা দড়ি দিয়ে বেধে ফেলল জামিল। 

“হেহে কি যে কন? কব্বর থাইকা লাভ আছেনি? কব্বর তো সব ফাঁকা। তোমারে সাপ্লাই দিতে দিতে তো এই গোরস্থানে মাটি ছাড়া আর কিছু নাই। যাই হোক কথা না বাড়ায় ট্যাকাটা দিয়া দেও তো,” তাগাদা দেয় কালু।

হাত থেকে মাটি ঝেড়ে পকেট থেকে টাকা বের করে কালুকে দেয় জামিল।

“এইডা কি হইল জামিল ভাই? এই কয়ডা ট্যাকা কেন? আরো তো বেশি দেওনের কথা আছিল?” টাকাগুলো গুনে ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠল কালু।

“আহা কালু রাগ করিস না ভাই। বাজার ভালো যাচ্ছে না। তারপর শহরে লাশ ঢুকানোর জন্য আবার পুলিশ রে সামলাইতে হয়। এইবার এইটা রাখ। পরেরবার বাড়ায় দিবো নে,” কাচুমাচু করে বলল জামিল। 

“না না। প্রত্যেকবার তোমার সেই এককথা। পরেরবার হইব না। এইবারই দেওন লাগবো,” ঝাঁঝালো কন্ঠে জবাব দেয় কালু।    

“আচ্ছা এইটা রাখ। আর জেদ করিস না ভাই আমার,” পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে কালুর হাতে গুজে দেয় জামিল। 

“পরেরবার যেন বেশি পাই,” টাকাগুলো পকেটে ঢুকিয়ে বলল কালু। 

এরপর লাশটা ভ্যানে তুলে জামিল চলে গেলে নিজের ঘরের দিকে এগোয় কালু। গোরস্তানের গেটের ডানপাশে ছোট একটা ঘরে থাকে সে। গোরস্থানে কবর খোঁড়ার এই কাজটা সে নিয়েছে মূলত জামিল ভাইয়ের কথাতেই। লাশের ব্যবসায় নাকি বিরাট লাভ। প্রথমে কথাটা বিশ্বাস না হলেও এখন এই ব্যবসাটাই একরকম নেশা হয়ে গেছে কালুর জন্য। 

 

ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টির শব্দ কানে যেতেই বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসল কালু। ঝটপট লুঙ্গিটা বদলে একটা পাজামা পড়ে নিল সে। তারপর কাধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে নিয়ে কালো রেইনকোটটা পড়ে নিল সে। ব্যাগটা থেকে বের হওয়া টেপ প্যাচানো তারটা হাতে নিয়ে ঘরের বাইরে পা রাখল কালু। 

গোরস্থানের কাজটা নেয়ার পর থেকেই কালু আর জামিল একের পর একের লাশ সরাতে থাকে এখান থেকে। এভাবেই লাশ লাশ সরাতে একসময় তারা খেয়াল করে যে গোরস্থানে আর একটাও লাশ অবশিষ্ট নেই। এরপর টাকার লোভ সামলাতে না পেয়ে এক চরম সিদ্ধান্ত নেয় কালু। বৃষ্টির দিনের বাজ পড়াটাকে হাতিয়ার করে সে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মানুষ মারতে শুরু করে। গতকাল রাতে কাদের মৃত্যুটাকে গ্রামের সবাই গতদুটো মৃত্যুর মতোই মাথায় বাজ পড়ে হয়েছে বলে ধরে নিলেও আসলে তা হয়নি। 

বৃষ্টির মাঝে নতুন শিকারের খোঁজে এগিয়ে যাচ্ছে কালু। দূর থেকে তার হাতে থাকা তারটাকে ছোবল মারতে উদ্ধত সাপের মতই মনে হচ্ছে।

 

লেখক,

গোরখাদক

আবির আনজুম