পৃথিবীর অপরাজিত এক যোদ্ধা জেনারেল খালিদ বিন ওয়ালিদ 

পৃথিবীর ইতিহাসে অপরাজিত এক যোদ্ধার নাম জেনারেল খালিদ বিন ওয়ালিদ 

 

ছোটো-বড়ো প্রায় ১০০ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও আজীবন অপরাজিত ছিলেন, তাই ইতিহাসবিদেরা খালিদ বিন ওয়ালিদকে সমর-ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেনাপতি মেনে নিয়েছেন। তাছাড়া অপেক্ষাকৃত ছোটো সেনাদল নিয়েও অপ্রতিরোধ্য সব ক্যাভালরি রণকৌশলের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের বিশাল সব শত্রুবাহিনীকে বারবার পরাস্ত করে তিনি সর্বকালের সেরা ‘ক্যাভালরি জেনারেল’ হিসেবেও স্বীকৃত।

 

হজরত আবু সুলায়মান খালিদ ইবনে আল ওয়ালিদ ইবনে আল মুঘিরাহ (রা.)-কে আরবের লোকেরা খালিদ, খালিদ বিন ওয়ালিদ অথবা আবু সুলায়মান বা সুলায়মানের পিতা নামে ডাকত (খালিদের বড়ো ছেলের নাম ছিল সুলায়মান)।

 

[যেসব যোদ্ধা ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করে তাদের বাহিনীকে ক্যাভালরি বলে।] 

 

বাইজান্টাইন রোমান শাসনামলে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২৯ সালে বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি লিখলেন। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সেই দাওয়াতের চিঠি বহনকারী দূত লেভান্টের মুতা গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছালে ঘাসানিদ আরবেরা তাকে হত্যা করে। দূত-হত্যা সব সময়ই অগ্রহণযোগ্য। অতএব মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুতাবাসী বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হলেন।

 

নোট: প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য যখন আকারে বিশাল হয়ে পড়ে, তখন সাম্রাজ্য শাসনের সুবিধার্থে দুটো রাজধানী স্থাপন করা হয়। একটি রোমে, আরেকটি তুরস্কের কনস্টান্টিনোপলে। কনস্টান্টিনোপল থেকে একজন সম্রাট পূর্ব ইউরোপ আর প্রাচ্য শাসন করতেন। এই সাম্রাজ্যকে বলা হতো বাইজান্টাইন রোমান বা শুধু বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য। বাইজান্টাইন রোমান শাসনামলে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাশে অবস্থিত ফিলিস্তিন, ইসরায়েল, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া এবং তুরস্কের কিছু অংশকে একত্রে লেভান্ট ডাকা হতো।

 

 

জায়িদ বিন হারিজাহর নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলমান বাহিনী মুতা অভিযানে রওনা দিয়েছে জেনে সম্রাট হেরাক্লিয়াস দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এগিয়ে এলেন। শুরু হলো অসম এক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে খালিদ যুদ্ধ করতে করতে ইতিমধ্যে নয়টি তরবারি ভেঙে ফেলে দশমটি নিয়ে লড়ছিলেন। কিন্তু সংখ্যায় বাইজান্টাইনরা অনেক বেশি হওয়ায় মুসলমানেরা কোনোমতেই তাদের সঙ্গে আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। যুদ্ধ করতে করতে জায়িদ বিন হারিজাহ শহিদ হলে জাফর বিন আবু তালিব মুসলমান সেনাপতির দায়িত্ব নিলেন। যুদ্ধ করতে করতে তিনিও শহিদ হলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা কমান্ড (বাহিনী পরিচালনা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব) নিজের কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু তিনিও শাহাদতবরণ করার পর যুদ্ধরত মুসলমান যোদ্ধারা খালিদের হাতে সেনাপতিত্ব সঁপে দেন। 

 

দায়িত্ব পাওয়ার পর খালিদ সুকৌশলে মুসলমান বাহিনীকে বাইজান্টাইনদের থাবা থেকে সরিয়ে আনেন। তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করে নিশ্চিত পরাজয় থেকে মুসলমান বাহিনীকে রক্ষা করেন এবং তাদের নিরাপদে মদিনায় ফিরিয়ে আনেন। খালিদের এই কৃতিত্বের কথা শোনার পর মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) বললেন, “অবশেষে একজন ‘সাইফুল্লাহ’ যুদ্ধের হাল ধরেছে।” সেই থেকে খালিদের নাম হয়ে গেল ‘সাইফুল্লাহ আল মাসলুল।’ ‘সাইফুল্লাহ’ শব্দের অর্থ ‘আল্লহর তরবারি’।

 

আবু সুলায়মান খালিদ ইবনে আল ওয়ালিদ ইবনে আল মুঘিরাহ ৫৯২ সালে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু মাখজুম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ওয়ালিদ ইবনে আল মুঘিরাহ ছিলেন বনু মাখজুম গোত্রের প্রধান। খালিদরা ছিলেন পাঁচ ভাই আর দুই বোন। জন্মের পরপরই আরব প্রথা অনুযায়ী তাকে এক বেদুইন দুধ-মায়ের কোলে তুলে দেওয়া হয়। এরপর পাঁচ কি ছয় বছর 

 

বয়সে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ গড়নের আর অসম্ভব ডানপিটে। ঐতিহ্যগতভাবেই কোরাইশদের সেরা যোদ্ধা আর কমান্ডাররা সবাই ছিলেন বনু মাখজুম গোত্রের। তাই ছেলেবেলা থেকেই তিনি ঘোড়ায় চড়া ও তরবারি, তির, বর্শা আর বল্লম চালানো শিখতে শুরু করেন। 

 

যদিও বল্লমই ছিল তার প্রিয় অস্ত্র; কিন্তু অন্য সব অস্ত্রেই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। এ ছাড়া তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের সেরা কুস্তিগিরদের একজন এবং একবার মল্লযুদ্ধে উমর বিন খাত্তাবকে আছড়ে ফেলে তার পা ভেঙে দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, সম্পর্কের দিক থেকে উমর বনি খাত্তাব ছিলেন খালিদেরে ভাগনে।

 

 

 

খালিদের বাবা আল ওয়ালিদ ছিলেন ইসলামের ঘোর বিরোধী। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর থেকে মক্কাবিজয়ের আগ পর্যন্ত মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে মদিনাবাসীর যুদ্ধ লেগেই ছিল। বদরের যুদ্ধ ছিল মক্কাবাসীর সঙ্গে মদিনাবাসীর প্রথম যুদ্ধ। কিন্তু খালিদ এই যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়িক কাফেলার সঙ্গে সিরিয়ায় ছিলেন। বদরের যুদ্ধে খালিদের ভাই ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ মুসলমানদের হাতে বন্দি হন। যুদ্ধশেষে খালিদ তার বড়ো ভাই হাশাম বিন ওয়ালিদকে নিয়ে মদিনা যান মুক্তিপণ দিয়ে ওয়ালিদকে ছাড়িয়ে আনতে। 

 

চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ দিয়ে তিনি ওয়ালিদকে ছাড়িয়ে আনেন। কিন্তু ফেরার পথে ওয়ালিদ পালিয়ে মদিনায় ফিরে যান এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

 

এরপর খালিদ উহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধে কোরাইশদের হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েন। ৬২৮ সালে হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে ১০ বছরের জন্য মক্কা আর মদিনাবাসীর ভেতর শান্তি নেমে আসে। এরই মধ্যে ওয়ালিদ মদিনা থেকে চিঠির মাধ্যমে খালিদকে বারবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দিতে থাকেন। একপর্যায়ে খালিদ মদিনা গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং তার এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তার বাল্যবন্ধু ইকিরিমাহ এবং কোরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ক্ষিপ্তভাবে তাকে বিরত করার চেষ্টা করেন। 

 

কিন্তু ৩১ মে ৬২৯ সালে খালিদ মদিনা গমন করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তিনি একজন যোদ্ধা হিসেবে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেন। 

 

তখন প্রায় আরবজুড়েই নানান দেবদেবীর মূর্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। আর প্রাচীন আরববাসী এসব দেবদেবীর মূর্তি পূজা করত। মক্কার কাছেই ছিল আল উজ্জার মূর্তি ও মন্দির। আল উজ্জাকে গ্রিক পৌরাণিক দেবী আফ্রোদিতির আরব্য সংস্করণ বলা যেতে পারে আফ্রোদিতি বা অ্যাফ্রোডাইটি গ্রিক পুরাণের প্রেম, আনন্দ, আবেগ এবং সৌন্দর্যের দেবী। রোমান পুরাণে দেবী আফ্রোদিতির আরেক নাম ভেনাস। কোরাইশরা আফ্রোদিতি বা ভেনাসকে নিরাপত্তার দেবী হিসেবে পূজা করত। মক্কা বিজয়ের পর মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা এবং অন্যান্য আরব এলাকা থেকে মূর্তি অপসারণ শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৬৩০ সালের রমজান মাসে তার নির্দেশে খালিদ আল উজ্জার মূর্তি ধ্বংস করতে নাখলাহ যান। 

 

 

 

মূর্তি ধ্বংস করে ফিরে আসার পর মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) জানতে চাইলেন মূর্তি ধ্বংসের সময় খালিদ অস্বাভাবিক কিছু দেখেছেন কি না। উত্তরে খালিদ যখন ‘না’ বললেন, তখন মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) বললেন যে খালিদ যে মূর্তিটি ভেঙে এসেছে তা আল উজ্জার আসল মূর্তি না। লজ্জিত খালিদ পুনরায় নাখলাহ গিয়ে আসল আল উজ্জার মূর্তি খুঁজে বের করেন। খালিদের আসার সংবাদ পেয়ে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত আল উজ্জার মূর্তির গলায় একটি তরবারি ঝুলিয়ে দিয়ে পালিয়ে যান। সম্ভবত, পুরোহিতের ধারণা ছিল যে, সেই তরবারি ব্যবহার করে অন্তিম মুহূর্তে আল উজ্জা নিজ মূর্তিকে রক্ষা করতে পারবে। খালিদ আল উজ্জার মূর্তি ভাঙা শুরু করতে যেতেই নগ্ন এক সেবাদাসী অপ্রকৃতিস্থের মতো খালিদের পথরোধ করে দাঁড়ায় এবং ইথিওপিয়ান সেই সুন্দরী তাকে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু খালিদ নির্দ্বিধায় এক কোপে সেই নারীকে হত্যা করে আল উজ্জার মূর্তি ধ্বংস করে ফিরে আসেন। 

 

এরপর খালিদ যান বনু জাধিমাহ গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে। কিন্তু তারা ইসলাম কবুল করতে সম্মত না হওয়ায় তিনি তাদের বন্দি করে নির্যাতন করতে শুরু করেন। ঘটনা শুনে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) খালিদের ঊপর অত্যন্ত রুষ্ট হন এবং খালিদকে ভর্ৎসনা করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করেন। পরে খালিদ বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে মুতার যুদ্ধে গমন করেন এবং যুদ্ধের মধ্যেই সেনাপতিত্ব পেয়ে সফলভাবে অভিযান পরিচালনার জন্য মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। পরের বছর ৬৩০ সালে কুরাইশদের বিরুদ্ধে মক্কাবিজয় অভিযানে খালিদ চার মুসলমান বাহিনীর একটির সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সে-বছরেই তিনি বেদুইনদের বিরুদ্ধে হুনাইনের যুদ্ধে এবং তাইফ অবরোধ অভিযানে অংশ নেন। এরপর তিনি বাইজান্টাইনদের আগ্রাসন ঠেকাতে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে তাবুক অভিযানে অংশ নেন। কিন্তু মুসলমান বাহিনী তাবুক পৌঁছানোর আগেই বাইজান্টাইনরা তাবুক ত্যাগ করে ফিরে যাওয়ায় মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) খালিদকে চার শত সৈন্যসহ দুমা অভিযানে পাঠান। 

 

দুমাতুল জান্দালের রাজকুমার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তার ইহুদি আর খ্রিষ্টান প্রজাদের নিয়ে ইসলামের দাওয়াত কবুল করেছিলেন। ৬৩১ সালের এপ্রিল মাসে খালিদ দুমাতুল জান্দালে পুনরায় অভিযান চালান এবং এবার সর্পদেবতা ওয়াদের মূর্তি ধ্বংস করেন। এরপর ৬৩১ সালে তিনি মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজে যোগ দেন এবং কথিত আছে যে হজের সময় তিনি মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কিছু চুল সংগ্রহ করেছিলেন; যা তাকে যুদ্ধে অপরাজেয় করেছিল।

 

কথিত আছে যে, খালিদ মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সেই চুল একটি লাল টুপিতে সেলাই করিয়ে নিয়েছিলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সব সময় ওই টুপি মাথায় দিয়ে যুদ্ধ করতেন।

 

৬৩২ সালে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর অনেক শক্তিশালী আরব গোত্র মুসলমান খেলাফত শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে শুরু করে। 

 

ফলে শুরু হয় রিদ্দাহ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে খলিফা আবু বকর খালিদকে সেনাপতি নিয়োগ করলে তিনি মধ্যআরবে অভিযান পরিচালনা শুরু করেন। বুজাখা আর ঘামরার যুদ্ধে তিনি স্বঘোষিত নবী তুলেইহার বাহিনীকে পরাস্ত করেন। 

 

পরে তুলেইহা স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আবুবকরের কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাইলে আবু বকর তাকে ক্ষমা করে দেন। আরও পরে সাসানিদদের বিরুদ্ধে বিখ্যাত নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে তুলেইহা শাহাদতবরণ করেন। এরপর খালিদ নাক্রা এবং জাফারের যুদ্ধে বনু সালিম গোত্রের নেত্রী সালমার সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সালমাকে হত্যা করেন। এ যুদ্ধের পর মদিনার আশপাশের অন্যান্য গোত্র খেলাফতের বশ্যতা স্বীকার করে নিলেও মালিক বিন আবু নুয়ারাহ-এর বনু ইয়ারবু গোত্র মুসলমান হয়েও খেলাফতকে অস্বীকার করল।

 

মালিক সরাসরি খালিদের সঙ্গে কোনো যুদ্ধে না জড়িয়ে আরেক স্বঘোষিত নবী সাজ্জাহর সঙ্গে হাত মেলান। কিন্তু খালিদ দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হন। খালিদ রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মালিককে হত্যা করেন এবং তার স্ত্রী লায়লাকে বিয়ে করেন। উমর বিন খাত্তাব খালিদের এমন আচরণের ঘোর বিরোধিতা করেন এবং অনেকেই মনে করেন খালিদ-উমরের মনোমালিন্যের অনেক কারণের ভেতর এ ঘটনাটি অন্যতম। পরে ৬৩২ সালের ডিসেম্বরে ইয়ামামার যুদ্ধে আরেক স্বঘোষিত নবী মুসাইলিমাহর বাহিনীকে পরাস্ত করার মধ্য দিয়ে রিদ্দাহ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয়। 

 

রিদ্দাহ যুদ্ধের পর খলিফা আবু বকর খেলাফতকে সুসংহত আর সম্প্রসারিত করতে বাইজান্টাইন আর পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে আঠার হাজার সৈন্য নিয়ে খালিদ পার্সিয়ান অভিযান শুরু করেন। সেখানে তিনি সালাসিল, ইউফ্রেতিস, ওয়ালাজা আর উল্লাইসের যুদ্ধে জয়ী হয়ে ৬৩৩ সালের মে মাসের ভেতর পার্সিয়ানদের হাত থেকে লোয়ার মেসোপটেমিয়া দখল করে নেন। এরপর তিনি আনবার শহর অবরোধ করেন এবং জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ নাগাদ আইন আল তামর পর্যন্ত দখল করে নেন।

 

[মেসোপটেমিয়া (প্রাচীন গ্রিক: Μεσοποταμία অর্থ-দুটি নদীর মধ্যবর্তী ভূমি, বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস বা দজলা ও ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী দুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। অধুনা ইরাক, সিরিয়ার উত্তরাংশ, তুরষ্কের উত্তরাংশ এবং ইরানের খুযেস্তান প্রদেশের অঞ্চলগুলোই প্রাচীন কালে মেসোপটেমিয়ার অন্তর্গত ছিল বলে মনে করা হয় । মেসোপটেমিয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম]

 

এ পর্যায়ে দুমাতুল জান্দালে বিদ্রোহীরা আয়াজ বিন ঘানামের ছোটো্ট মুসলমান বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে জেনে দুমাতুল জান্দালে ছুটে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। সেখান থেকে তিনি পবিত্র হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করেন এবং ফেরার পথে বিশাল এক পার্সিয়ান বাহিনী জড়ো হওয়ার সংবাদ পেলেন। বিশাল এই সেনাবাহিনী চারটি গ্যারিসনে (সেনাছাউনি, সেনানিবাস অথবা দুর্গ) জড়ো হয়েছিল। খালিদ মুজাইয়াহ, সানিঈ ও জুমাইলের পৃথক যুদ্ধে এই বাহিনীকে একে একে পর্যুদস্ত করেন। 

 

এবার খালিদ পার্সিয়ান রাজধানী দখলের পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু পার্সিয়ান রাজধানী দখলের আগে ফিরাজ আর কাদেশিয়াহর গ্যারিসন দখল করা জরুরি। অতএব ৬৩৩ সালের ডিসেম্বরে ফিরাজের যুদ্ধে তিনি ফিরাজ শহর দখল করে এবার কাদেশিয়াহর পথে রওনা দেন। পথিমধ্যেই তিনি বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে সিরিয়ান রণাঙ্গনের কমান্ডার হিসেবে যোগদানের নির্দেশ পান এবং পার্সিয়ান রণাঙ্গন ত্যাগ করে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ৬৩৪ সালের জুন নাগাদ খালিদ সিরিয়ান রণাঙ্গনে যোগ দেন। পথে কারাতাইন আর হাওয়ারিনের যুদ্ধে দুটো বাইজান্টাইন মরুদুর্গ দখল করেন। 

 

এরপর তিনি বসরার দিকে এগোতে থাকেন, যেখানে আবু উবায়দার মুসলমান বাহিনী বসরা অবরোধ করে আছেন। ৬৩৪ সালের মধ্য জুলাইয়ে বসরার পতনের মধ্য দিয়ে ঘাসানিদ বংশের পতন ঘটে। ৩০ জুলাই খালিদ আজনাদাইনের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের পরাজিত করেন এবং লেভান্টজুড়ে বাইজান্টাইন আধিপত্যকে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। 

 

এবার খালিদ দামেস্ক দখলের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলে দামেস্কের গভর্নর থমাস খালিদ বিন ওয়ালিদকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসেন। বলে নেওয়া ভালো যে, থমাস ছিলেন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের মেয়ের জামাই।

 

থমাসের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে ৬৩৪ সালের ২০ আগস্ট খালিদের মুসলমান বাহিনী দামেস্ক অবরোধ করে এবং ৩০ দিনের মাথায় দামেস্ক দখল করে নেয়। দামেস্ক অবরোধ চলাকালেই খলিফা আবু বকর মারা যান এবং উমর বিন খাত্তাব খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন। খলিফা হয়েই উমর খালিদকে সিরিয়ান রণাঙ্গনের কমান্ড থেকে অপসারণ করে আবু উবায়দাকে সেনাপতি মনোনীত করেন। 

 

মধ্য-সিরিয়া মুসলমানদের দখলে আসার পর উত্তর সিরিয়ার সঙ্গে প্যালেস্টাইনের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। আবু উবায়দা তার সেনাবাহিনীকে চার ভাগে ভাগ করে চারদিকে অভিযান চালাতে শুরুকরলেন। মুসলমানদের এমন অগ্রাভিযান অব্যাহত থাকলে দ্রুতই একসময় তারা গোটা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে জেনে সম্রাট হেরাক্লিয়াস বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনী জড়ো করে মুসলমান সেনাবাহিনীকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলেন। আবু উবায়দা খালিদকে তার ক্যাভালরি 

 

কমান্ডার এবং প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিলেন। খালিদের পরামর্শে ৬৩৬ সালের ২০ আগস্ট ইয়ারমুক প্রান্তরে মুসলমান বাহিনী বাইজান্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে।

 

ইয়ারমুখে বাইজান্টাইনদের পরাস্ত করার পর মুসলমান বাহিনী লেভান্টে বাইজান্টাইনদের শেষ শক্ত ঘাঁটি জেরুজালেম অবরোধ করে। দীর্ঘ চার মাস অবরোধের পর ৬৩৭ সালের এপ্রিলে খলিফা উমরের উপস্থিতিতে জেরুজালেম আত্মসমর্পণ করে। জেরুজালেম পতনের পর আবু উবায়দা আর খালিদ উত্তর সিরিয়া অভিযানে নামলেন। পথে হাজিরের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের পরাস্ত করে ৬৩৭ সালের অক্টোবরের ভেতর আলেপ্পো পর্যন্ত দখলে নিয়ে নেন। 

 

এরপর আয়রন ব্রিজের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের ফের পরাজিত করে তারা বাইজান্টাইন রাজধানী এন্টিওখ অবরোধ করেন এবং ৩০ অক্টোবর এন্টিওখের পতন হয়। 

 

এরপর খালিদ আরও উত্তরে এগোতে থাকেন। তিনি সফল অভিযানের মাধ্যমে জাজিরা, এডেসা, আমিদা, মালাটিয়া, আর্মেনিয়া আর মধ্য আনাতলিয়া পর্যন্ত দখল করে নেন। এমতাবস্থায় খলিফা উমর মুসলমান বাহিনীদের অগ্রাভিযান বন্ধ করে ইতিমধ্যে দখল করা এলাকায় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা জোরদারে মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে আনাতলিয়া আর আর্মেনিয়া অভিযানের মাধ্যমে খালিদের বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

 

এমেসা থাকাকালে একবার খালিদ এক বিশেষ পানীয় দ্বারা গোসল করেন যাতে অ্যালকোহল মেশানো ছিল। গুপ্তচরের মাধ্যমে খলিফা উমর বিষয়টি জানতে পারেন এবং খালিদের কাছে এ ঘটনার লিখিত ব্যাখ্যা চান। ইসলামে অ্যালকোহল পানে নিষেধাজ্ঞা আছে কিন্তু গোসলের ব্যাপারে কিছু বলা নেই মর্মে ব্যাখ্যা দেন খালিদ; এবং খলিফা উমর তা মেনে নেন।

 

আবার ৬৩৮ সালে মারাস দখলের পর বিখ্যাত কবি আসওয়াস খালিদের গুণকীর্তন করে এক কবিতা লিখে খালিদের মন জয় করে নেন। খুশি হয়ে খালিদ তাকে ১০ হাজার দিরহাম উপহার দেন। খলিফা উমর এ ঘটনা জানতে পেরে আবু উবায়দাকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। কারণ খালিদ যদি সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ দিয়ে থাকেন, তবে তা ছিল খেয়ানত। 

 

আর যদি নিজ সম্পদ থেকে তা দিয়ে থাকেন তা হলে তিনি অপব্যয়ী। কিন্তু আবু উবায়দা নিজেই খালিদের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। তাই তিনি এই অপ্রিয় কাজটি করতে অপারগতা প্রকাশ করলে অবশেষে বিলাল ইবনে রিবাহ খালিদকে এমেসা ডেকে পাঠান এবং ঐ অর্থের উৎস জানতে চান। খালিদ ঐ অর্থ তার নিজের বলে দাবি করলে অমিতব্যয়িতার অভিযোগে খলিফা উমরের নির্দেশে তাকে মুসলমান সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করেন।

 

বরখাস্ত হওয়ার পর খালিদ তার মোবাইল গার্ডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মদিনা ফিরে যান এবং খলিফা উমরের দরবারে হাজির হয়ে খলিফা উমরের এমন সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চান। খালিদের বিরুদ্ধে খলিফা উমর তার অবস্থান এভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে মুসলমানেরা ভাবতে শুরু করেছে যে খালিদকে ছাড়া মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধে জেতা অসম্ভব, যা অগ্রহণযোগ্য। 

 

খালিদ খলিফা উমরের এই আশঙ্কাকে মেনে নিলেন এবং এমেসা ফিরে গিয়ে অবসর জীবনযাপন শুরু করলেন। ৬৪২ সালের হজ শেষে খলিফা উমর অসমাপ্ত পার্সিয়ান অভিযান পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা করেন এবং খালিদকে সে-অভিযানের সেনাপতি হিসেবে পুনর্নিয়োগের কথা চিন্তা করেন। কিন্তু মদিনা পৌঁছাতেই তিনি জানতে পারলেন যে খালিদ বিন ওয়ালিদ আর নেই।

 

৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেছেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। উল্লেখ্য, খালিদ বিন ওয়ালিদ মক্কায় নাকি এমেসায় মৃত্যুবরণ করেছেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

 

সিরিয়ার এমেসায় খালিদ বিন ওয়ালিদ মসজিদ। ধারণা করা হয় এখানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

খালিদ যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদতবরণের জন্য উদগ্রীব ছিলেন। তিনি বলতেন, “আমি এত উদ্গ্রীব হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদতবরণ করতে চেয়েছি যে আমার শরীরে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে কোনো আঁচড় বা ক্ষতের দাগ নেই। অথচ আজ আমি একটা বৃদ্ধ উটের মতো বিছানায় শুয়ে মরতে বসেছি।” 

 

উত্তরে খালিদের স্ত্রী বলতেন, “আপনি আল্লাহর তরবারি, আর আল্লাহর তরবারি কি কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ভাঙতে পারে? আপনার নিয়তি শহিদ হওয়ার নয়, আপনার নিয়তি অপরাজেয় হয়ে মরবার।”

 

খলিফা উমর কারো মৃত্যুর পর সেই মৃতের জন্য বিলাপ করা পছন্দ করতেন না এবং এ ব্যাপারে তিনি কড়া নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিলেন। কিন্তু খালিদের মৃত্যুর পর বনু মখজুমের নারীরা যখন মাটিতে গড়াগড়ি করে বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন, তখন উমর তাদের বাধা দিতে মানা করলেন। কারণ তিনি নিজেও জানতেন যে মানবসভ্যতার ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো খালিদ হয়তো আর কখনোই জন্মাবে না, তাই তাদের এই বিলাপ আর আহাজারি অনর্থক নয়।

 

এখানে একটি বিষয় না বললেই নয় আর তা হলো— খালিদ এবং উমরের মনোমালিন্য ইতিহাসস্বীকৃত। কিন্তু তারা কখনোই একে অন্যের প্রতি বিরাগ বা কুৎসা প্রকাশ করেননি। উমর খলিফা হওয়ার পর খালিদকে মুসলমান সেনাবাহিনীর কমান্ড থেকে সরিয়ে দিলে খালিদ তা বিনা তর্কে মেনে নেন এবং বলেন, “যদি আবু বকর ইন্তেকাল করে থাকেন আর উমর নতুন খলিফা নির্বাচিত হয়ে থাকেন, তো আমাদের সবারই উচিত খলিফা উমরের প্রতি অনুগত থাকা এবং তার নির্দেশ মেনে চলা।” কথিত আছে যে উমর তার মৃত্যুশয্যায় এই বলে আফসোস করেছিলেন যে খালিদ বেঁচে থাকলে তিনি খালিদের হাতেই খেলাফতের দায়িত্ব তুলে দিতেন। সত্যি ছিলেন ইসলামের ঢালস্বরূপ খালিদ বিন ওয়ালিদ।