হার্নিয়া কে হারানোর পন্থা

হার্নিয়া কি

 

একটি বালতির মধ্যে ফুটো হয়ে গেলে জল বাইরে বেরিয়ে আসবে। হার্নিয়াও তাই। ডাক্তার গণ বললেন, ‘‘পেটের পিছনের দিকে থাকে হাড়, সামনে রয়েছে পেশি। তার ভিতরে থাকে অন্ত্র, নালি, চর্বি ইত্যাদি। কিন্তু পেটের মধ্যে কোথাও ফুটো হয়ে গেলে এই ভিতরের পদার্থগুলি বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইবে। একেই হার্নিয়া বলে।’’

 

আমাদের পেটের কিছু টিস্যু আছে যেগুলো আশপাশের অন্য টিস্যু থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল থাকে৷ যখন পেটের ভেতরের চাপ বেশি হয়, যেমন-অনেক দিনের পুরানো হাঁচি, কাশি বা কোষ্ঠকাঠিন্যের ফলে শক্তিশালী টিস্যুগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল টিস্যু ভেদ করে বেরিয়ে আসে তখন সেই অবস্থাকে হার্নিয়া বলা হয়। এটি স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষ হয়, এমনকি বাচ্চাদেরও হয়। তবে স্থূলকার ব্যক্তিদের এ রোগে আক্রান্ত হতে বেশি দেখা যায়।

 

হার্নিয়া হলে শরীরে বিশেষ কিছু লক্ষণ দেখা দেয়, সেগুলোকে হার্নিয়া সিমটাম বলে। নাভির চারদিক, কুঁচকি, উরুর সংযোগস্থল, পুরুষের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ, মহিলাদের ক্ষেত্রে উরুর ভেতরের দিকে ফুলে গেলে হার্নিয়া হয়েছে বলে সনাক্ত করা যায়। এর প্রভাবে কুচকি এবং অণ্ডথলি অস্বাভাবিক ফুলে যায় এবং ব্যথা অনুভূত হয়৷ ইতিপূর্বে সার্জারি হয়েছে এমন অংশেও হার্নিয়া দেখা দিতে পারে। জন্মগতভাবেও হার্নিয়া থাকতে পারে। হার্নিয়ার বহিঃপ্রকাশ সাধারণত ধীরগতিতে হয়, এটি কয়েক মাস এমনকি বছর ধরে হয়ে থাকে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই হার্নিয়া হতে পারে।

 

হার্নিয়া এর লক্ষ্মণ-

 

হার্নিয়ায় আক্রান্তের লক্ষণ:

 

  • পেটের নির্দিষ্ট অংশ ফুলে যাওয়া এবং সেই ফোলা থেকে প্রচণ্ড পেট ব্যথা অনুভূত হওয়া।

 

  • শরীর নিচু করলে ব্যথা অনুভব করা।

 

  • খাওয়া-দাওয়া না করার পরও পেট ভরা ভরা লাগা।

 

  • বমি বমি ভাব হওয়া।

 

  • নাভির আশপাশ ফুলে যাওয়া।

 

  • কুঁচকি বা অণ্ডথলি ফুলে যাওয়া
  • উরুর গোড়ার ভেতর দিক ফুলে যাওয়া।

 

  • পেটে পূর্বে অপারেশন করা হয়েছে এমন স্থান ফুলে যাওয়া।

 

  • শরীরে জ্বর চলে আসা।

 

  • আক্রান্ত স্থানের আশপাশের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া।

 

  • কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হওয়া।

 

হার্নিয়ায় আক্রান্তের কারণ:

 

১. পুরনো কাশি।

২. অতিরিক্ত হাঁচি।

৩. কোষ্ঠকাঠিন্য।

৪. ভারি বস্তু উত্তোলন।

৫. একই পেশির অতিরিক্ত ব্যবহার।

৬. শরীরের অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি।

৭.তামাক জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার।

 

হার্নিয়া এর চিকিৎসা – 

 

শল্য চিকিৎসা হার্ণীয়ার ভাল চিকিৎসা হল শল্য চিকিৎসা। অস্ত্রোপচারের সময়ে হার্ণীয়ার বস্তুগুলিকে ঠেলে উদরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বা কেটে বাদ দিয়ে জায়গাটা সেলাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে দুর্বল টিস্যু এবং পেশীগুলি ভেদ করে বস্তু বেড়িয়ে এসেছিল, সেগুলিকে সঠিক জায়গায় ধরে রাখার জন্য একটি জাল (কৃত্রিম বা পশুজাত) ব্যবহার করা হয়।

 

ইঙ্গুইনাল হার্ণীয়াতে হার্ণীয়ােটমি, হার্ণীয়ােহাফি বা হার্ণয়ােপ্লাস্টি’র মতন বিশেষ পদ্ধতির সুবিধা নেওয়া হয়। ইঙ্গুইনাল হার্ণীয়ার অন্যান্য চিকিৎসাগুলি হল কুন্ট’জ অস্ত্রোপচার, এন্ড্রিউ’জ ইস্ত্রিকেশানস বা ম্যাকভে বা নিহাস মেরামত, এবং তা নির্ভর করে কি ধরনের মেরামতি দরকার। অস্ত্রোপচারকারী ডাক্তার এই বিষয়ে নির্ণয় নেন। বিভিন্ন প্রকারের হানীয়ার চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ধরণের অস্ত্রোপচার করা হয়।

 

অস্ত্রোপচার সব সময় হার্ণীয়ার একমাত্র চিকিৎসা নয়। এর দরকার হয় না যদি আপনার হার্ণীয়া, যে ধরনেরই হােক না কেন, কোন স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় বড় সমস্যা না হয়। উপরন্তু, বয়স্কদের ক্ষেত্রে এবং যারা গুরুতর অসুস্থ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার এড়িয়ে যাওয়া হয়।

ওষুধপত্র

 

হিয়াটাল হার্ণীয়ার ক্ষেত্রে, কখনও কখনও বাজার চলতি ওষুধ দেওয়া হয় যাতে পাকস্থলীর অম্বল কম হয়। এতে অস্বস্তি এবং অন্যান্য উপসর্গ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই ওষুধগুলির মধ্যে কতকগুলি হল ব্যথা কমানাের কিছু হল এইচ-২ ব্লকারস যা হিস্টামিনের বিরুদ্ধে কাজ করে, কিছু হল পেটের এসিড কমানাের জন্য আর আছে প্রােটন পাম্প ইনহিবিটারস (যে ওষুধগুলি পেটে এসিড তৈরি বন্ধ করে)।

অস্ত্রোপচার দুই ভাবে করা যায়:

উন্মুক্ত করে বা প্রথাগত ভাবে এবং অল্প ক্ষত করে ল্যাপারস্কোপিক শল্য চিকিৎসা করে। উন্মুক্ত অস্ত্রোপচারে হার্ণীয়ার জায়গায় একটি বড় ও লম্বা গর্ত কাটা হয় এবং দুর্বল পেশীগুলিকে মেরামত করা হয়। ল্যাপারস্কোপিক বা কী-হােল শল্য চিকিৎসায় একাধিক ফুটো করা হয়। এবং সরু নলের মত যন্ত্র দিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। নলের মাথায় একটি ক্যামেরা লাগানাে থাকে যাতে শরীরের ভিতরের ছবি শরীরের বাইরে একটি মনিটারে দেখে কাজ করা যায়।

 

জীবনধারার নিয়ন্ত্রণ 

 

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে হিয়াটাল হার্ণীয়ার উপসর্গ কম করা যায় কিছু সারানাে যায় না। একবারে। অনেকটা ভারী (গুনে ও পরিমাণে) খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। ভােজনের পরেই শুয়ে পড়া অথবা শ্রমসাধ্য শারীরিক পরিশ্রম করা বন্ধ করতে হবে। যে খাবারগুলি অম্বলের কারণ হয় সেই মশলাদার বা টক খাদ্য পরিহার করে হিয়াটাল হার্ণীয়ার রােগীরা অম্বল থেকে মুক্তি পাবেন। যত দিন উপসর্গ থাকে তত দিন ধূমপান বন্ধ রাখুন। দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে আপনার উচ্চতার সাথে সামঞ্জস্য রাখুন। কিছু কিছু ব্যায়াম হার্ণীয়ার অঞ্চলের পেশীগুলিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। এতে কিছু উপসর্গ কম হবে। তবে অত্যধিক ব্যায়াম করা বা ডাক্তারবাবুর পরামর্শ ছাড়া ব্যায়াম করলে হিতে বিপরীত হবে। ভাল হয় যদি একজন ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে ব্যায়ামগুলি করেন।

যদি প্রয়ােজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা মেনে চলার পরও উপসর্গগুলি না যায় তাহলে অস্ত্রোপচার করেই হার্ণীয়াকে ঠিক করতে হবে।