ঈদুল ফিতরের বয়ান

ঈদুল ফিতরের এ মহান পুণ্যময় দিবসটির উদযাপন কালের সূচনা হয় আজ থেকে ১৪ শত বছ পূর্বে। মদীনা নগরীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের অব্যবহিত পরেই ঈদুল ফিতর উৎসব পালনের সূচনা হয়। তখন মদীনাবাসী পারসিক অপসংস্কৃতির প্রভাবে শরতের পূর্ণিমায় নওরোয নামে এবং বসন্তের পূর্ণিমায় মেহেরজান নামে দুটি উৎসব বিভিন্ন ধরনের আনন্দ আহ্লাদ ও নানা রকম কুরুচিপূর্ণ রংতামাশার মাধ্যমে উদযাপন করত। উৎসব দুটির রীতি নীতি ও আচার ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। জরথুস্ত্র প্রবর্তিত নওরোয ছিল একটি নববার্ষিক উৎসব। উৎসবটি ছয় দিন ব্যাপী উদযাপিত হত। এর মধ্যে নওরোযে আম্মা বা কুসাফ নামক দিবসটি ছিল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। আর অন্য দিনগুলো ছিল অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের জন্য নির্ধারিত। তদ্রƒপ ছয় দিন ব্যাপী উদযাপিত মেহেরজান অনুষ্ঠানেও শুধুমাত্র একটি দিবস সাধারণ দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল। শ্রেণী বৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রের মাঝে কৃত্রিম প্রবেধ এবং ঐশ্বর্য-অহমিকা ও অশালীনতা প্রকাশে কলুষিত ছিল এ দুটি উৎসব। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসলিম উম্মাহর প্রতি রহমত হিসেবে দান করেন অনাবিল আনন্দঘন উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনাতে আগমন করেন তখন মদিনাবাসীর দুটি উৎসব দিবস ছিল। এ উৎসব দিবসে তারা খেলাধুলা করত।

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন এ দুটি উৎসবের তাৎপর্য কী? মদিনাবাসী উত্তর দিলেন : আমরা মূর্খতার যুগে এ দুটি উৎসব দিনে খেলাধুলা করতাম। তখন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ দুটি উৎসব দিবসের পরিবর্তে তোমাদের জন্য এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটি উৎসব দিবস দান করেছেন। তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১১৩৪) অনুপম ইসলামী আদর্শে উজ্জ্বীবিত আরববাসীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে সূচনা করে সুনির্মল আনন্দ বিধৌত ঈদ উৎসব উদযাপন। জন্ম নেয় শ্রেণী বৈষম্য বিবর্জিত পঙ্কিলতা ও অশালীনতামুক্ত প্রীতি স্নিগ্ধ মিলন উৎসব ঈদুল ফিতর। নিছক খেলাধুলা, আমোদ-ফুর্তির উৎসব দুটিকে আল্লাহ তা‘আলা পরিবর্তন করে এমন দুটি উৎসব দান করলেন যাতে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া জ্ঞাপন, জিকির আজকার এবং ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সাথে রয়েছে শালীন আমোদ-ফুর্তি, সাজসজ্জা ও পানাহারের সুনির্মল বিধান।

 

ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য

 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনে, রোজাদার ব্যক্তির জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে। ১। যখন সে ইফতার ( দৈনিক ইফতার ও ঈদের ইফতার) করে তখন সে বিনোদিত হয়। ২। যখন সে তার প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন সে তার রোযার কারণে আনন্দিত হবে। সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০৪

ইফতার দু ধরনের ১। রমাযানের রোযার ইফতার। দিন শেষে সান্ধ্য আয়োজনে ইফতার করে রোযাদার ব্যক্তি ভাষাতীত আনন্দ অনুভব করে। এটা হলো ছোট ইফতার। ২। রমাযানের দীর্ঘ একটি মাস সমপানান্তে সমাগত ইফতার। রমাযান মাসের পবিত্র আবহ শেষে দিনের বেলা ইফতার করে মুসলিম জাতি সীমাহীন আনন্দ উৎসব পালন করে। এটা হলো বড় ইফতার। সুতরাং ঈদুল ফিতর হলো রোযার পূর্ণতার পুরস্কার। ঈদুল ফিতর সর্বদিক বিবেচনায়ই এক অনন্য বিশিষ্টতা ধারণ করে। প্রাত্যহিক সালাত, সাপ্তাহিক জমায়েত এবং বার্ষিক পুনর্মিলনী মুমিন জীবনের এ তিনটি বৈশিষ্ট্যই ঈদ উৎসবের দিনটিতে অত্যন্ত প্রত্যুজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠে। এ পবিত্র দিনটিতে এর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণকর বৈশিষ্ট্যগুলোও বিপুল বিস্ময়ে জলজল করে উঠে। কারণ ঈদের এ পবিত্র আয়োজন মহামহিমের পবিত্র আপ্যায়ন। একজন নিষ্ঠাবান রোজাদার ব্যক্তিমাত্রই ঐশী এ আতিথেয়তার মর্ম উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। ঈদের দিনের প্রতিটি মুহূর্তেই সে ঐশী বিনোদনের অমৃত সুধায় সিক্ত হয়। ভাললাগার এক অপার আনন্দে শিহরিত হয় তার তন ও মন। প্রাপ্তির আনন্দে রোমাঞ্চিত হয় তার কোমল হৃদয়।

 

 

ঈদুল ফিতরের প্রস্তুতি

 

 

বিশ্ববরেণ্য ইসলামিক স্কলার জাস্টিস আল্লাম তাকী উসমানী রাহ. বলেন, রমাযান মাসে আমাদের সবচেয়ে ব্যাপক ও সীমাহীন কর্ম এটাই যে, এ বর্কতপূর্ণ মাসে নিজেদের জাগতিক চাহিদা ও ব্যায়ের পরিধি সঙ্কুচিত করার পরিবর্তে তা আরো অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি করে দেই। ব্যবসায়ী মহোদয়গণ তো এ মাসকে বিশেষ উপার্জনের মাস ঘোষণা দিয়ে রাত দিন সে ধ্যানেই মগ্ন থাকেন। অনেক সময় এ ধ্যান মগ্নতার কারণে নামাযও কুরবান হয়ে যায়। ঈদের প্রস্তুতি আমাদের জন্য এখন একটা বড় ধরনের নৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা ঈদুল ফিতরকে মুসলিমদের জন্য আনন্দ উৎসবের দিন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সার্বজনীন বাৎসরিক আনন্দের বিশেষ দিবস হিসেবে মনোনিত করেছেন। এমন কি এ বিষয়টিও শরীয়তে স্বীকৃত ও প্রমাণিত যে, এ দিনে কেউ যদি সর্বোত্তম পোষাক সহজে লাভ করতে পারে তাহলে সে যেন তা পরিধান করে।

 

কিন্তু বর্তমানে এ উপলক্ষে উত্তম পোষাকের অজুহাতে যে অসীম অগণিত অনর্থক খরচের জোয়ার সৃষ্টি করা হয়, অন্যায় অপব্যয়ের যে মহাপ্লাবন বইয়ে দেয়া হয় এবং সেটাকে ঈদের অপরিহার্য অনুষঙ্গ বলে মনে করা হয় তার সঙ্গে দীন ও ইসলামী শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই। বর্তমান যুগে ঈদ পালনের জন্য এ বিষয়টি অতি আবশ্যকীয় জরুরী বিষয় মনে করা হয় যে, আর্থিক সচ্ছলতা থাক বা না থাক- যে কোনো উপায়ে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য নিত্য নতুন ডিজাইনের ফ্যাশনাবল পরিধেয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হবে। ঘরের প্রত্যেক সদস্যের জন্য জুতা-টুপি থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিস নতুন নতুন ক্রয় করা হবে। শুধু তাই নয় ঈদের প্রকৃত স্বাদ অনুভবের জন্য ঘরের সাজ সজ্জা শোভাবর্ধনের জন্য নিত্য-নতুন আসবাবপত্র ও আকর্ষণীয় ডিজাইনের ফার্ণিচারের ব্যবস্থাও করা হয়। দূর-দূরান্তে বসবাসকারী আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের নিকট মূল্যবান গিফট ও দামী ঈদকার্ড প্রেরণ করা হয়। আর এসব কাজ এমন এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা নিয়ে সম্পন্ন করা হয় যে, কেউ যেন কারো থেকে পিছনে পড়ে না যায়। কেউ যেন কারো কাছে কোনো ক্ষেত্রে হেরে না যায়।

 

এসবের অনিবার্য পরিণতি এটাই হয় যে, একজন মধ্যম স্তরের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জন্য ঈদের প্রস্তুতি একটি বাড়তি দুশ্চিন্তা ও আলাদা মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায় যখন সে দেখে যে, হালাল উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের সবার চাহিদা ও আবদার পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং বৈধ টাকা পয়সা তার জন্য পর্যাপ্ত হচ্ছে না তখন সে অবৈধ পথের সন্ধান করে। বিভিন্ন পন্থায় অন্যের পকেট মেরে টাকা পয়সার ব্যবস্থা করে। এবং এর দ্বারা তার সেই লাগামহীন চাহিদা ও অন্তহীন কৃপ্রবৃত্তির উদর পূর্তি করে। মাওলানা মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান সংকলিত ঈদ বার্তা পৃষ্ঠা ১৭

 

সুতরাং পার্থিব ঝুট ঝামেলা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পবিত্র রমাযানের অফুরন্ত রহমত, বরকত ও মাগফিরাত অর্জনের সুমহান কর্মে নিরত থাকাই হলো ঈদুল ফিতরের আসল প্রস্তুতি। এ প্রস্তুতি গ্রহণের মাঝেই রয়েছে ইহকালীন ও পারলৌকিক সুমহান সাফল্যের হাতছানি।

 

ঈদুল ফিতর ও আনন্দ উৎসব

 

ঈদুল ফিতর নিছক কোনো আনন্দ উৎসবই নয়; বরং ঈদুল ফিতর উদযাপন করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদতও বটে। অথচ আমরা আজ পবিত্র এ উৎসব দিবসটিকে নিছক একটি আনন্দ উৎসব দিবসে পরিণত করছি। ফলে এ দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে নীতি নৈতিকতার কোনো পরওয়া করি না। যে পবিত্র সত্তা আমাদের এ আনন্দ উৎসবটির ব্যবস্থা করেছেন তাঁর বিধি নিষেধের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করছি না। আমরা ভিন জাতির উৎসব-পার্বনের সাথে ঈদুল ফিতরকে একাকার করে ফেলছি। ঈদ উদযাপনের নামে সপ্তাহ ব্যাপী যেসব অনুচিত ও গর্হিত কাজে জড়িয়ে পড়ি তা সত্যিই নিতান্ত দুঃখজনক ব্যাপার। নির্মল আনন্দ প্রকাশ, সুস্থ বিনোদন চর্চা ইসলামী শরীয়ত সমর্থিত। সারাক্ষণ চেহারায় বিষণœতা ও গাম্ভীর্যের ছাপ সন্ন্যাসিত্ব গ্রহণ করা ইসলামী শরীয়াসঙ্গত নয়। বরং সুস্থ ও নির্মল আনন্দ প্রকাশের নিমত্তই ঈদুল ফিতরের প্রবর্তন। এবং পবিত্র এ আনন্দ ও বিনোদন চর্চাও ইবাদাত হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং ঈদুল ফিতরের আনন্দ ও বিনোদন হবে স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও সুনির্মল। ধর্ম ও বিবেকের সীমার ভিতর থেকেই ঈদকেন্দ্রিক বিনোদন চর্চা করতে হবে। নতুবা হাসি আনন্দের এ ইবাদাত উল্টো পরিণতি ডেকে আনবে।

 

 

ঈদের দিনের অবাঞ্ছিত বাধ্যবাধকতা

 

আমরা ইসলামী শরীয়ত নির্দেশিত বিশেষ কিছু দিবস রজনীকে কেন্দ্র করে অবাঞ্ছিত কিছু কর্মকা-কে আবশ্যক করে ফেলি। ফলে পুণ্যের কাজটিও মন্দত্বের রূপ পরিগ্রহ করে। ঈদের দিন ফিরনী সেমাইয়ের আয়োজন, ঈদ মোবারক বলে কোলাকুলি করা, ঈদের নামাযান্তে আত্মীয় স্বজনের কবর যিয়ারত করা এবং ঈদ বখশিশ বা সালামীর লেনদেন- এগুলোর কোনোটিই স্বতন্ত্রভাবে মন্দ কাজ নয়। কিন্তু ঈদের দিনের সাথে এ বিষয়গুলোকে নির্দিষ্ট করে নিলেই সৃষ্টি হয় বিপত্তি । তাই অবাঞ্ছি এ বাধ্যবাধকতা পরিহার করা চাই। আর পটকাবাজি, আতশবাজি এবং গান বাজনা তো মৌলিকভাবেই পাপের ভাগাড়। সেটা যদি পবিত্র কোনো দিবসকেন্দ্রিক হয় তাহলে তো পাপাচারের ভয়াবহতা আরো শতগুণে বৃদ্ধি পাবে। সারকথা, যদি ঈদুল ফিতরকে শুধু একটি বার্ষিক উৎসব হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অন্যান্য জাতির মত ঈদের সাথে মনগড়া অবিধানিক কার্যকলাপ যুক্ত করা হয় তবে এ ঈদ ওঈদ তথা অভিশাপে পরিণত হবে।

 

তাঁদের ঘরেও যেন পৌঁছে যায় ঈদের আনন্দ

 

ঈদ আনন্দের শুভ দিনে যেন নিম্নবিত্ত অসহায় মানুষগুলোর চেহারায় ফুটে উঠে ঈদের অকৃত্রিম আনন্দ রেখা। এর জন্য সামর্থবানদের সবটুকু সাধ্য ব্যয় করে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঈদের এ নির্মল আনন্দঘন দিবসে স্বচ্ছ আনন্দ ও পবিত্র বিনোদনের জায়গাটিতে এসে যেন ধনী গরীবের মধ্যকার অবাঞ্ছিত প্রাচীর উঠে যায়। আনন্দ উৎসবে সবাই একাকার হয়ে যায়। পথশিশু আর বস্তিবাসী মানুষের চোখের পানি যেন আমাদের সামাজিক আবহ ও বিবেকবোধকে কলুষিত না করে। এ দিকে দৃষ্টি দেয়া আমাদের সামাজিক দায়িত্বের সাথে ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। সাথে সাথে আমাদের ঐসব মুসলিম মা বোনদের কথাও স্মরণে রাখা প্রয়োজন পবিত্র রমাযানে গুলির সাইরেনে যাদের সাহরী হয়েছে, খেজুরের পরিবর্তে বোমার গ্রাস দিয়েই যাদের ইফতার হয়েছে। নির্মল আনন্দের এ ঈদের দিনে কি তাঁদের চেহারায়ও ঈদের আনন্দ রেখা ফুটবে? তারাও কি নতুন জামা কাপড় পরিধান করবে? তাকবীর ধ্বনি দিয়ে তারাও কি ঈদগাহে সমবেত হতে পারবে? তাঁদের জন্য কি আমার হাত দুটি আকাশের দিকে উত্তোলিত হবে? তাদের জন্য কি আমার দু চোখের কোণা একটু ভিজে উঠবে?