ভয়ংকর সুন্দর সুন্দরবন চলুন ঘুরে আসা যাক

সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬০% রয়েছে বাংলাদেশ এবং বাকি অংশ ভারতের মধ্যে বিদ্যমান। এটি মূলত বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা এবং বাঘেরহাট অংশ জুড়ে রয়েছে।

সুন্দরবনের আক্ষরিক অর্থ সুন্দর জঙ্গল বা সুন্দর বনভূমি। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে যা এখানে প্রচুর জন্মায়। এছাড়াও এখানে জন্মে ম্যানগ্রোভ, গরান, গেওয়া, কেওড়া, গোলপাতাসহ আরো ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ। 

 

সুন্দরবনে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক ঘুরতে আসেন ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০ টা জাহাজ তাদের পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে খুলনা জেলার রুপসা ফেরিঘাট অথবা জেলখানা ঘাট থেকে সুন্দরবনের দলবদ্ধভাবে ঘুরতে নিয়ে যায়। সাধারণত ২-৩ ঘন্টা রাতের এই ভ্রমণে আপনি সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে জাহাজে উঠবেন কারণ আপনি যাচ্ছেন মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে। 

 

বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে ড্রোন দিয়ে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া ড্রোন দিয়ে ছবি তুলতে গেলে আপনাকে গুনতে হতে পারে মোটা অঙ্কের জরিমানা। বন বিভাগ থেকে সুন্দরবনের কয়েকটি স্থানে বন্দুকধারী গার্ডসহ যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়। আকর্ষণীয় স্থান গুলো হল হাড়বাড়িয়,  কচিখালি, হিরনপয়েন্ট, কটকা,ও দুবলার চর। এছাড়াও রয়েছে নতুন জেগে ওঠা কিছুদ্বীপ। ভ্রমণ প্যাকেজ অনুযায়ী পর্যটন সংস্থা আপনাকে দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখাবেন। মংলা জেলা সংরক্ষিত অঞ্চলে যেতে কোন বনবিভাগের অনুমতি লাগে না। 

 

স্থল্পপথে সাতক্ষীরা জেলার মুন্সীগঞ্জে, ওখান থেকে ট্রলার করে সুন্দরবনের স্পট যেমন নিলডুমুরে যাওয়া যায়। তবে এই পথে সুন্দরবন যাওয়া তেমন জনপ্রিয় নয়।

 

সুন্দরবনকে জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে বহু নদী-খাল-বিল আর সামগ্রিক জলধারা যেমন,পশুর, বলেশ্বর, রায়মঙ্গল ও শিবসা । এখানে শাখা নদীর খালগুলি অনেক অগভীর হাওয়াই জাহাজ থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নেমে দর্শনীয় স্থানগুলিতে যেতে হয়। কোলাহলমুক্ত নির্জন বনভূমির খালের খানের ভিতর দিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সত্যিই অবর্ণনীয়। 

 

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছ,  সুন্দরবনের বাস করে ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী,  ৩৫ সরীসৃপ এবং ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী। 

 

তাই আপনি যদি সজাগ থাকেন, সুন্দরবন যাত্রাপথের দেখতে পারেন বিভিন্ন ধরনের পাখি, কুমির,বানর আর হরিণ। তবে বাঘের দেখা পাওয়া অনেকটাই ভাগ্যের ব্যাপার। ২০২০ সালে বনবিভাগের গণনা অনুযায়ী, সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশ অঞ্চলে রয়েছে ১১৪ টি আর ভারত অঞ্চলে রয়েছে ৯৬। এসব বাঘ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০০ জন মানুষের মৃত্যুর কারণ হয় যা কিনা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। 

 

সুন্দরবনে কিছু পর্যটন স্পটে বনের ভিতর দিয়ে কাঠের উঁচু ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। এর উপর দিয়ে ভ্রমণকারীরা নিরাপদে হেঁটে হেঁটে বনের সৌন্দর্য উপভোগ করেন এবং আবার যাত্রা পথে ফিরে আসেন। যাত্রা পথে বিভিন্ন মৌয়াল-বাওয়ালদের সংগে দেখা হয়ে যেতে পারে।

 

সুন্দরবনের মুক্ত বনে আপনি অবশ্যই শতশত হরিণের দল দেখতে পাবেন তবে এই জন্য আপনাকে দলবদ্ধভাবে নিঃশব্দে সুন্দরবনের কিছু স্পটএ হাঁটতে হবে। মানুষের কোলাহল পেলে সুন্দরবনের হরিণের দলগুলি গভীর বনে পালিয়ে যায়।

 

হরিণের প্রিয় খাবার হচ্ছে কেওড়া গাছের পাতা। প্রাপ্তবয়স্ক কেওড়া গাছ গুলি অনেক বড় হয়ে যায় ফলে হরিণ সহজে কেউড়া পাতা খেতে পারেনা। এখানে ঘুড়তে আসা পর্যটকদের হরিণ দেখানোর জন্য ট্যুর গাইড কেওড়া গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে রেখে দেয়। বেশ কিছুক্ষন সময় নীরব থাকলে দূর থেকে আপনারা দেখতে পাবেন হরিণের পাল পাতা খেতে আসছে। বনবিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়, সুন্দরবনে রয়েছে 30 হাজার হরিণ।

 

তবে এখানের বানর গুলি হতে সাবধান এরা কিন্তু মানুষকে ভয় পায়না ছবি তোলার সময় অসাবধানতাবশত অনেকেই হারিয়েছেন তাদের মূল্যবান মোবাইল সেটটি। সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে আছে মিঠাপানির পদ্মপুকুর। হরিণ, বাঘ এখান থেকে পানি খেয়ে থাকে। 

 

কটকা বা জামতিলি সমুদ্রসৈকতে যেতে হলে আপনাকে একটি বিশাল সমতল তৃণভূমির মধ্য দিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হাঁটতে হবে। দুই পাশের গভীর বন আর মাঠের মধ্যে নয়নাভিরাম বৃক্ষরাজি। এই মনোহর দৃশ্য দেখতে দেখতে আপনি পৌঁছে যাবেন বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসৈকতে। এ যেন, বন আর সাগরের এক অপরূপ মিশ্রণ। 

 

তবে এই সাগরে গোসল না করাই ভাল কারণ এখানে রয়েছে বেশকিছু চোরাবালি। ফলে গোসল আপনার জীবন নাশের কারণ হয়ে যেতে পারে। 

 

সংরক্ষিত করমজল অঞ্চলে আপনি দেখতে পাবেন দেওয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা অনেক হরিণ। এদেরকে আপনি নিজ হাতে কেওড়া পাতা খাওয়াতে পারবেন এবং এদেরকে স্পর্শও করতে পারবেন। দেখতে পাবেন কুমিরের প্রজনন ক্ষেত্র। বিভিন্ন আকারের কুমির বিভিন্ন খাঁচাতে প্রজনন করা হয় এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে ছেড়ে দেওয়া হয়৷

সুন্দরবন সফরে আপনি আরেকটি বাড়তি সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন যদি আপনার ভ্রমণ তারিখটা পড়ে যায় পূর্ণিমার রাত। চাঁদনী রাতে নির্জন অন্ধকার বনের ভিতর দিয়ে নদী ভ্রমণ সত্যিই নৈসর্গিক। 

এই সুন্দরবন বাংলাদেশকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। 2009 সালে শক্তিশালী ঝড় আয়লা থেকে নির্ভীক প্রহরীর মতো বাংলাদেশকে ঝড়ের তান্ডব লীলা থেকে রক্ষা করেছিল এই সুন্দরবন। এতে মারা যায় অগণিত বৃক্ষরাজি এবং পশুপাখি। ধীরে ধীরে সুন্দরবন তার আগের অপরূপ সুন্দর চেহারায় আবার ফিরে এসেছে।

ভবিষ্যতেও সুন্দরবন উপকূলীয় ঝড় এবং বন্যা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করবে এটা আমাদের সবারই প্রত্যাশা। এবং সেই সাথে আমাদের মনকে প্রশান্ত করার জন্য তার অপরূপ সৌন্দর্য আমাদের মাঝে বিলিয়ে দিতে থাকবে যুগ যুগান্তর ধরে।