অধরা ভালোবাসা

ফ্যান্টাসি প্রদেশের বারস্কাম কারাগার। সকাল১০ঃ০০ ঘটিকা।
শীতের সকাল। রাস্তায় বরফে ঢেকে গেছে পুরাটাই। প্রতি মাসের ১ তারিখ এর ন্যায় আজো জিনিয়া টমটম  থেকে নেমে হাটা শুরু করলো জেলখানার গেটের উদ্দ্যেশ্যে। সাথে চিরচেনা টিফিন ভর্তি খাবার। আজ অবশ্য সে চিকেন টোস্ট এনেছে তার প্রিয় মানুষটার নিমিত্তে । 
“কি ম্যাম আজকেও এসেছেন কুয়াশার মাঝে !!’ এক কন্সটেবল বলে উঠলো। মুখ তুলে না তাকালেও কন্ঠটা তার অতি চেনা।  কনস্টেবল মার্গারেট। ১০টা বছর টানা জেলখানার দরজা হাটতে হাটতে কন্ঠও মুখস্ত হয়ে গেছে মেয়েটার। ভেতর এ ঢুকে নিজের সিরিয়াল আসাতে ১০ মিনিটের জন্য সময় পেল সে দেওয়ালের ওপাশের মানুষ্টার সান্নিধ্যে যেতে। তবে আজ দাড়োগাবাবুর কাছে আবদার করে আর ৫ টা মিনিট বেশি চাইল সে। খেতে মানুষ্টা বড্ড ভালোবাসে।তাই যেনো একটু পেট ভরে খেতে পারে এই আশায়।
দারোগাবাবুও না করল না।এ দুই মানব মানবীর জন্য আসোলে সবাই আফসোস করে। কিন্তু নিয়মের বাইরে কিছুই করতে পারে না।
এই ঠান্ডায় বরফ কেটে এখানে না আসলে হত না!!দারাজ কন্ঠ ভেসে উঠলো ওপাশ থেকে। (যদিও সে কন্ঠে ছিল নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে ১ মাস পর দেখার এক অনাবিল শান্তি)
উহুম একদম না,কেমন আছো তুমি?আজ জানো তোমার জন্য চিকেন টোস্ট  রান্না করে এনেছি।আর স্যার এর থেকে ৫মিনিট সময় বেশি নিছি।তুমি কিন্তু আজ তাড়াহুরা করতে পারবা না, হু।
আচ্ছা বাবা।দাও দেখি।জ্যাকশন সোনা কেমন আছে?পড়তেছে ঠিকঠাক? আমায় দেখতে চায় না!!
“চায় না আবার?ও তো প্রায় জিজ্ঞেস করে তোমার কথা।আচ্ছা শোন না -শুনলাম এবার রাজকন্যার ১০ তম জন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রদেশের সকল ৪০ ঊর্ধ্ব আসামীকে নাকি মুক্তি দিবে।আর এতে তোমার নামও আছে।কত ভালো হবে তাই না বল!!”আনন্দের উল্লাস জেনিয়ার চোখে।
আমার বয়স ৪০ হয়েছে এত তাড়াতাড়ি!!বড্ড বয়স্ক হয়েছি তাহলে – বলেই খাবারে মনযোগ দিল হেরি।।মুক্তি শব্দটা তার কাছে এখন বড্ড অদ্ভুত লাগে।আজ থেকে ১০বছর আগেও যে হেরি নিজের প্রাণের ফ্যান্টাসি প্রদেশকে ২০ বছরের পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য আপ্রাণ লড়ে গেছে বৈদেশিক শক্তির সাথে আজ তার কাছে এ মুক্তি যেন এক ছলনা মাত্র।
 ততক্ষণে আকাশের বুক চিড়ে একফালি রোদ উকি দিচ্ছে জেলখানার করিডোরে।
ও পরিচয় করিয়ে দিই আমাদের গল্পের নায়কের সাথে। নাম তার হেরিসন।সবাই আদর করে ডাকতো হেরি বলে ।পেশায় একজন ৩ য় শ্রেনীর কর্মচারী। তার সৎ সাহস আর পরোপকারী গুণেই মুগ্ধ হয়ে জিনিয় তাকে বিয়ে করে।আজ থেকে ১০ বছর আগে স্ত্রীকে   বাসায় রেখেই বারাস্কাম অংগরাজ্য এর সকল যুবককে নিয়ে দেশের টানে যুদ্ধে যোগ দেয়।সে সময় জিনিয়া অন্তস্বত্তা।এভাবে রেখে যেতে মন চায় নি একদমে হেরির।কিন্তু তার গ্রামের মানুষ গুলো তাকে ছাড়া একদম নিরুৎসাহিত যুদ্ধের জন্য।
অগত্যা তাকে যেতেই হয়।যুদ্ধক্ষেত্র বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয় বলে প্রায় লুকিয়ে সে তার বউকে দেখতে আসতো যাতে কেউ তাকে  গ্রামের বাকি যুবকদের ফেলে স্ত্রীর জন্য ছুটে আসা কাপুরষ না ভেবে বসে।যেহেতু গ্রামের সকলে ওকে অনেক পছন্দ করতো তারপরও কথায় আছে না পছন্দের মানুষ টা কখন যে সকলের ঘৃণার পাত্র হয় বলা মুশকিল।
বারাস্কাম অংগরাজ্যের এ পিটার নামের এক যুবক তার লুকিয়ে স্ত্রীর সাথে দেখা করার বিষয়টি জানতো।সে খুব ইর্ষাণ্বিত ছিল হেরির জনপ্রিয়তায়।তার ভয় ছিল যুদ্ধে যদি জিতে যায় তারা তো জনপ্রিয়তার দিক থেকে হেরিকেই সবাই বারাস্কামের প্রধান বানাবে।কিন্তু পিটারের ক্ষমতার প্রতি দূর্বলতা ছিল।আর এ জন্য যুদ্ধ যখন শেষের দিক আর তাদের জয় নিশ্চিত দেখে  সে গুজব ছড়িয়ে দিল যে হেরি বৈদেশিক শত্রুদের সাথে গোপনে দেখা করে ও দেশকে তাদের কাছে সপে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজ্যের সকল মানুষ তাত এতদিনের সততা ও নিষ্ঠার তোয়াক্কা না করে কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তাকে বন্দী করে রাখে।
দেশ স্বাধীন এর পর তাকে ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।আর পরবর্তীতে পিটার হয় বারাস্কাম অংগরাজ্যের প্রধান। 
আজ ১৭ই অক্টোবর। ফ্যান্টাসি রাজ্যের স্বাধীনতা দিবস।স্বাধীন রাজার একমাত্র রাজকন্যার ১০ম জন্মদিন ও স্বাধীনতার ১০ বছর পূর্তি  উপলক্ষে রাজ্যের সকল ৪০ ঊর্ধ্ব আসামীকে সাধারণ ঘোষণা দেন রাজা।তবে শর্ত একটাই তারা রাজ্য ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারবে না।
আজ সকাল থেকেই বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে জিনিয়া,তার প্রিয়তম কে এতদিন পর নয়ন ভরে দেখবে বলে।যদিও ইচ্ছা ছিল জেলেখানা থেকেই হেরিকে নিয়ে আসবে।তবে জ্যাকসনের দাদি অসুস্থ বলে যেতে পারছে না।জ্যাকসন ব্যাপারটা জানতো না(মূলত জিনিয়া তাকে ইচ্ছা করেই জানায় নি,সারপ্রাইজ দিবে বলে)।তাই সকালে উঠে বন্ধুদের সাথে স্কুলে স্বাধীনতা দিবস পালন করতে যায় সে।
স্বাভাবিক অর্থেই মুক্তি পায় আমাদের হ্যারিসন।কুয়াশা ভরা বারাস্কাম শহরটা আজ বিধাতার কৃপায় সত্যি অনেক সুন্দর ভাবে সেজেছে।রোদে ঝিকমিক করছে রাস্তাঘাট।বাচ্চারা স্কুল থেকে বাসায় ফিরছে।রাস্তার ধুলো বালু আর রাজ্যের সৌন্দর্য এর সাধ নিতে নিতে রাস্তার সাইড দিয়ে হেটে আসছিলো হেরিসন।হঠাৎ উলটো সাইড থেকে এক মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোড়ে এসে ধাক্কা দেয় হেরিসনকে।জেলখানার খাবার খেয়ে দূর্বল হেরির শরীর আরো দুমড়ে মুচড়ে গেলো ট্রাকের ধাক্কায়।পানির জন্য ছটফট করতে থাকলো সে।সেসময় এক স্কুলফেরত ছেলেদের দলে জ্যাকশন ও ছিল।তাদের সামনে এমন ঘটনায় নিতান্ত হতবাক তারা।জ্যাকশন তার বাবার গুণে গুণাণ্বিত।ছুটে এসে স্কুলব্যাগের বোতল থেকে হেরির মুখে পানি ঢেলে দেয় সে।।
জ্যাকশন কিছু বোঝার আগেই হেরির নিষ্প্রাণ দেহখানা ঝড়ে পরে তার কোলে।অধরাই রয়ে যায় এক স্ত্রীর ১০ বছরের ভালোবাসা আর অসহায় এক ছেলের বাবার আদর
হায় নিয়তি! হেরি কি জানতো বিধাতা তারে মুক্তি দিবে এইভাবে  দুনিয়ার জেলখানা থেকে??তাও সে মুক্তির কি সাধ!!নিজের চোখে স্বাধীন দেশের মুক্ত আকাশ দেখে তাও কিনা অজান্তেই নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তানের কোলে??
হাতের মুঠোয় ভালোবাসা ধরা দিয়েও দিল না   হ্যারিকে…
লেখক,
মোঃ রিয়াজুর রহমান রিয়াজ।
পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ,
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়