হারানো গুপ্তধন

জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ। এ বছর শীত টা যেন একটু  বেশিই জেকেঁই বসেছে আর এর মধ্যে আমার ফুপাতো বোনের বিয়ে। বাড়ী শুদ্ধ দাওয়াত তাও আবার চার পাচঁ দিনের জন্য। যাক ভাল হয়েছে, অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়না। আর আমাদের অঢেল সময় থাকলেও বাবার সময় হয়ে উঠেনা। মাঝে-মধ্যে  বেড়াতে যাবার কথা বললেই কোন না কোন অজুহাতে সেই প্রোগাম বাতিল হয়ে যাবে। কি আর বলবো বাবা ব্যাংকের ছোট একটা পোস্টের চাকুরী করে। বেতন যা পাই তাতে সংসারের সমস্যা না হলেও বাড়তি টাকা-পয়সা থাকেনা।  যেহেতু আমার বয়স কিছুটা হয়েছে তাতে বুঝতে বাকি থাকেনা। কিন্তু আমার ছোট বোনটাকে বোঝানোই যায়না তার অনেক জেদ। 

এবার কেন জানি আগবাড়িয়ে বাবাই আমাদের যাবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। মা যদিও খুব একটা রাজি ছিলেননা কেননা গ্রামে শীত অনেক বেশি। তারপরও বিয়ের বাড়ি অনেক লোকের ভিড় হবে বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সমস্যা হতে পারে। এক বাসাই সবার জায়গা তো হবে না তাই অন্য কারো বাসাই জাইগা করে দিবে । মা’র আবার অন্য কারো ঘরে ঘুমাতে পারেনা। কি আর করা  না যেয়ে কোন উপায় নেই যেহেতু বাবার বোনের মেয়ের বিয়ে । তাই বাবার অসম্ভব  পিড়াপিড়িতে মার না করার কোন উপায় ছিলনা।

আমার এস,এস,সি’র টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে  তবে ছোট বোনটা মাত্র নতুন ক্লাসে উঠেছে কিন্তু ক্লাস এখুনো সেভাবে শুরু হয়নি। মা’র তো না বলার কোন উপায় নেই সব দিক থেকে উপযুক্ত সময় কয়েকটা দিন আনন্দ উপভোগ করার জন্য। আমার জন্য তো বেশিই আনন্দের যে কোন জাইগাই বেড়াতে যাওয়া। আর যেখানে অনেক চেস্টা করেও বাবাকে রাজি করানো যায়না আর সেখানে বাবার আগ্রহই বেশি তাই এই সুজোগ মিস করা যায়না। এ যেন মেঘ না চাইতেই ব্রস্টির মতো অবস্থা। 

মা ও বোনটাকে নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য গ্রামের বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আব্বা আমাদের সংগে নেই তিনি বৃহস্পতিবার অফিস ছুটির পর আসবে।আজকের যাত্রার আমিও প্রধান সেনাপতি। যেহেতু বাবা সাথে নেই পুদ্দারি দেখালেও বকা দেয়ার কেউ নেই। মা আমাকে অনেক অদর করে শত অপরাধ করলেও সে কিছুই বলবেনা তাই আজকে আমি রাজা।  আমরা বাস থেকে নেমে  রিক্সাই উঠেছি, সরু পাকা রাস্তা তার দু’ পাশে সব্জি ক্ষেত। মনোমুগ্ধকর দোলান বাতাসের ঝাপ্টাই শরীরটা যেন কেপেঁ উঠছে। হটাত দেখি হলুদে ভরা মাঠ যেন গায়ে হলুদের কাপড়ে মোড়ানো চার দিক কি যে সুন্দর দ্রষ্য না দেখলে বলা যাবেনা। রিস্কা কাছে যেতেই দেখতে পেলাম আহারে অপরুপ শরষে ক্ষেতে হলুদ ফুলের সমারোহ।বাতাসে ফুলের সুঘ্রাণ যেন চার দিকে মেখে আছে। বোনটা বায়না ধরেছে শরষে ফুল নেবে, আমিও সুজোগ পেয়ে মা’র নিষেধ না শুনে রিস্কা দাঁড়িয়ে ছুটে গেলাম ফুল ছিঁড়তে। এক থোকা শরষে ফুল এনে বোন কে দিতেই ও যে কি খুশি হয়েছে! কিছু ফুল ওর চুলে গেঁথে দিলাম আর হাতে রাখা ফুল গুলো আমার দু গালে ঝাপটা দিচ্ছিল আমিও ওর গালে দিলাম তাতে ফুলের হলুদ রেণু গুলি সারা মুখে ভরে গেল, অনেক সুন্দর লাগছিল। আবার কিছু দুর যেতেই দেখি সোনা বিছিয়ে পড়ে আছে এমন মনে হল। পরে দেখলাম ধান কেটে জমিতেই শুকোতে দিয়েছে এতে রোদের আলো পড়ে চিক চিক করছে। দুরে একটা গ্রাম দেখা যায় মা বললেন, সেখানেই আমরা যাব। বাড়ির কাছে যেতে না যেতেই আমাদের আগ বাড়িয়ে নিতে চাচাতো ভাই-বোনেরা এসেছে। দুপুরের আগেই আমরা পৌছে গেলাম আমার ফুপুর বাসাই। 

আজ বুধবার আর শুক্রবার বিয়ে। অথচ এখুন থেকেই জমজমাট আয়োজন। গ্রাম্য মেয়েদের নাচ,গান আর লম্বা বাঁশের মাথাই লাগানো দু’ টো মাইকে বিরতি হীন ভাবে বেজেই চলছে ছায়াছবির গান বাজনা যেন বিয়ের আয়োজন পুরো এলাকা মগ্ন হয়ে পড়েছে। চার পাচঁ হাত দুর থেকে কেউ কথা বললে শোনা যায়না। এই গ্রামের আশ পাশের বাড়ির সব লোকজনদের বিয়ের তিন দিন আগে থেকেই দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। তাদের এ বাড়িতেই কাজ কামে সময় দেওয়া এবং খাওয়া দাওয়ার মহা আয়োজন চলছে। কাউকে কিছু বলতে হচ্ছেনা প্রয়োজন মতো যার যেটা করার দরকার তারা তারা তাই করছে, যেন মনে হচ্ছে এটা ওদের নিজের বাড়ি। সবার সাথে এতো ভাল সম্পর্ক কোথাই পাওয়া যাবে বলতে পারবোনা এটা শুধু গ্রামেই সম্ভব। শুধু রাত হলে যে যার বাসাই গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে আবার ভোর হওয়ার সাথে সাথেই সবাই চলে আসে। ছোট ছেলে-মেয়েরাও হই  হুল্লোড়, খেলা-ধুলা আর রং মাখা মাখি নিয়ে ব্যস্ত এদিকে বড়রাও পিছিয়ে নেই হুলি খেলাই। কে কাকে কোন ফাঁকে রং দিয়ে পালিয়ে যায় বোঝা মুশকিল। ফুঁপা অবশ্য আমাদের রং দিতে নিশেধ করে দিয়েছেন সবাইকে।

এতো হৈ চৈ এর মধ্যে দিয়ে এক দিন পার করে দিলাম। এখানে বেড়াতে এসে অনেক নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। গায়ের মানুষেরা এতো মিল মহব্বত নিয়ে চলা ফেরা করে তা আগে জানতাম না। বিয়ে বাড়ির তো অনেক ঝুট ঝামেলা থাকে যা নিয়ে আমার ফুপা ফুপুকে কোন চিন্তা ভাবনা করতে হচ্ছে না। তাদের মেয়ের যে বিয়ে, দেখে মনেই হচ্ছেনা যত কিছু সব প্রতিবেশীদের চিন্তা।

আজ বৃহস্পতিবার গায়ে হলুদের দিন। আস্তে আস্তে লোকজনের সমাগম পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এখানে আসার পর থেকে যতটা আতিথেয়তা ছিল এখুন অনেক কম মনে হচ্ছে। কারন এতো লোকজনের মাঝে কে খেল আর কে খেলোনা এমন খোজ নেওয়ার সময় কারো যেন নেই। তাই খাওয়া দাওয়ার ইচ্ছে হলে খাবার দেবার সময় লাইনে বসে পড়তে হবে। আমিও অন্যান্যদের সাথে নিজের গরজে রাত আটটার মধ্যে খাবার শেষ করেছি। এখুন রাত প্রায় বারটা বাজতে চলল তবু সারাটা বাড়ী মেতে আছে নাচ, গান নিয়ে। আজকে কোথাই ঘুমাবো বুঝতে পারছিনা। গত রাতে ঘর অনেক গুলো ফাকাই ছিল আজকে তো আরও অনেক অতিথির সমাগম বেড়েছে। সমস্যার কথা মাকে জানিয়ে তেমন কাজ হলো না তিনিও বিয়ে নিয়ে মেতে আছেন। শীতের সময় না হলে সমস্যা হতো না যেখানে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়তাম। এখুন তো শুলেই হবেনা সাথে একটা গরম লেপেরও দরকার আছে। কিন্তু কি করবো কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছিনা।
অনেক খোজা খুঁজির পর একটা ব্যবস্থা হয়েছে বলে মনে হলো। দাদীর ঘরে গিয়ে দেখি খাটের উপর জাইগা নেই তবে মেঝের ডান দিকে সারি করে ধানের বস্তা সাজানো তার পাশে কেউ একজন লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। তার পাশে আরও দু’ একজন শোবার মতো জাইগা হবে তাই সেই সুজোগ টা কাজে লাগাতে হবে। আর দেরি না করে শোবার জন্য প্রস্তুতি নিতে হলো। শীতের তীব্রতা বেশি তাই গায়ের শুয়েটার পরেই একটু লেপ টেনে নিয়ে কোন মতে শুয়ে পড়লাম। আমার ঠান্ডা হাত পা যেন পাশের জনকে স্পর্শ না করে তেমন সাবধানে নিজের কোলের মধ্যে গুঁজে নিলাম। কেননা, তার ঘুম ভেংগে গেলে সে আমাকে যদি এখানে শুতে না দেই এই ভয়ে চুপটি করে কাত হয়ে পড়ে থাকলাম মরা মানুসের মত । অজানা কোন  যে ভয়ে ভয়ে আছি বলতে পারিনা,  তখনো চোখে ঘুম আসেনি একটুও। এমন সময় পাশের জন  আমার পেছন দিকে ফিরে আমাকে অজাগর সাপের মত করে জড়িয়ে ধরলো । আচমকা ভয়ে আম আঁতকে উঠে শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস নিতেও পারছিনা তাই অবস দেহে কাপটি মেরে থাকলাম কাঠেরপুতুল হয়ে। ও এমন ভাবে জাপটে ধরে আছে যে,আমার নড়া চড়া করার কোন উপায় ছিলোনা। ক্রমশ সে আমাকে উষ্ণতার  চাদরে ঢেকে ফেললো। আস্তে আস্তে নিজের ঠান্ডা শরীরটা অনেক গরম হয়ে উঠলো। আর ঘাড়ের মধ্যে মুখ গুজে দিয়ে কানের পাশে ওর ঘন ঘন 
নিঃস্বাসের শব্দে শরীরটা যেন গরম করে ফেললো কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বর্গ শুখের বাসিন্দা হয়ে সুবোধ বালকের  মতো ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভোর হতে না হতেই আবার গুঞ্জন আর মাইকের গান বাজনাই মুখরিত হয়ে উঠলো। মেয়েদের রানা বান্নার হাড়ির হট মট শব্দ, বাড়ির বাইরে থেকে গরু, খাসির মাংস কাটা আর ছেলে মেয়েদের চেঁচা মেচিতে গোটা বিয়ে বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি অবশ্য ঘুমের ঘোরে এসব শুনছি, কিছুতেই আলসেমি কাটিয়ে শীতের সকালে উঠতে পারছিনা যেহেতু অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছি । তবে ইচ্ছে থাকলেও আর ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হয়ে উঠলো না। এদিকে আবার  পিঠের নিচে কি যেন পিন ফূটানোর পড়েছে খুব ব্যথা করছে। চোখ কসলাতে কসলাতে  দেখি পাশের জন নেই আমি একাই শুয়ে আছি  এবং খাটের উপরের সবাই উঠে চলে গেছে। তাহলে পিঠের নিচে কিসে গুঁতা মারার মতো মনে হচ্ছে বুঝতে পারলাম না। বাধ্য হয়ে লেপ ঠেলে উঠে বসলাম। কি আশ্চর্য! আমি যেখানে শুয়ে ছিলাম সেখানে মেয়েদের মাথার ক্লিপ,পাশেই ক্ষোপা,চুলের ফিতা পড়ে আছে। আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগালাম এগুলো এখানে কেমন করে এলো। একটু থো মেরে বোবার মতো বসে থাকলাম।

হঠাত একটা ১৪/১৫ বছরের হালকা গড়নের সুন্দরী মেয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকতে গিয়ে আমাকে দেখা মাত্রই ফিক করে ভুবনজয়ী মুচকি হেসে পালিয়ে গেল।  এতোক্ষনে বুঝলাম আমি কোন মেয়ের সংগে একই লেপের নিচে একে অপরকে জড়িয়ে ছিলাম। এও কি সম্ভব! আমাকে কেমন যেন ভাবিয়ে তুললো। বর্তমানে আমার বয়স ১৫/১৬ বছর হবে। এ সময় আমি অচেনা অজানা কোন এক মেয়ের সংগে রাত কাটালাম অথচ একটুও বুঝতে পারিনি। আমি সত্যিই আগে যদি জানতে পারতাম পাশের জন মেয়ে ছিল তাহলে…!

কেন জানতে পারলাম না, নিজেকে শুধু বকা দিতে ইচ্ছে করলো। গুপ্তধনের মতো দামী মানিক হাতের কাছে পেয়েও হারিয়ে ফেললাম।

কোন ভাবেই মনকে বোঝাতে পারছিলাম না। এমন একটা জিনিষ এ বয়সে অমুল্য রত্নের চেয়েও বেশী কিছু। অথচ দুর্ভাগ্য আমি কোন টেরই পেলেম না। অসম্ভব রাগে নিজের চুল নিজে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হলো। এতো সব ভাবতে ভাবতে আমার মাথে গুলিয়ে যাবার উপক্রম।

সকালে নাস্তা ঠিকমত না করে মনে মনে সারা বাড়ি ও আশে পাশে মেয়েটিকে পাগলের মত খুজে ফিরছি কিন্তু কোথাও পাইনা। আজকে আপুর বিয়ে। সকাল দশটার মত বাজে এখুন বউকে গোসল করানো হবে। আমরা ছোট বড় সবাই যেখানে গোসল করানো হবে সেখানে ভিড় জমিয়েছি। গোসলের সময় আদাগুঁড় খাওয়া নিয়ে অনেক আনন্দ হয়। বউয়ের মাথাই আদাগুঁড় মেশানো আতব চাউল রাখা হয় আর সবাই যে যেভাবে পারে ছিনিয়ে নিয়ে খেয়ে ফেলে। আর কয়েকজন তারা বিবিন্ন ভাবে বাধা দেই যেন না নিতে পারে। মার খেয়েও আদাগুড় খাওয়ার মজাই আলাদা। হটাৎ ঐ মেয়েটিকে দেখি যেই আদাগুড় নিয়ে পালাবে ওমনি একজন আম গাছের পাতাওয়ালা ডাল দিয়ে মেরেছে আর ও মার খেয়েই ছুটে পালিয়েছে। আমিও ওর পেছন  পেছনে দৌড়ে আসলাম। কিন্তু তাকে আর কোথাও খুঁজে পেলামনা কোথাই যেন হারিয়ে গেল। কি করি বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু আমিও ছেড়ে দেবার বালক না ওকে যেভাবেই হোক খুজে বের করবো বলে একটা পণ করলাম। 

অনেক চেস্টা করে ব্যর্থ হতেই হলো আমাকে যা কখুনো কল্পনা করিনি। আর ও কোথাই যেতে পারে ভেবেও পেলামনা, সেতো জ্বিন পরি না যে হঠাত করে আসবে আর  হাওয়াই মিলিয়ে যাবে। এক ঝলক দেখেছি মাত্র তাতেই মেয়েটিকে আমার অনেক ভাল লেগেছে। দেখতে সত্যিই অনেক সুন্দরি বলতে হবে , হালকা পাতলা গঠন, লম্বা  কাল চুল, হাসলেই গাল দুটোই টোল পড়ে এক কাথাই মনে ধরার মতো। এর আগে ওকে কোথাও দেখেছি বলে মনে হয়না। কে হতে পারে মেয়েটি সেটাও জল্পনা কল্পনা করেও বের করতে পারছিনা। যদিও চেস্টার ক্রুটি করিনি তবু মেয়েটির কোন সন্ধান পাইনি। কিন্তু তাকে আর একটিবার দেখার আদম্য কৌতুহল যেন আমাকে পেয়ে বসলো। নাওয়া খাওয়া ছেড়ে সারা বাড়ি তন্য তন্য করে খুঁজেছি। বিয়ের আনন্দটাই আমার ম্লান হয়ে গেছে। হারানো গুপ্তধন খোজার প্রবল
ইচ্ছে নিয়ে বাসাই ফিরে আসলাম। অনেক দিন পার হয়ে গেছে, এখুনো ঐ মেয়েটিকে মনে মনে খুজে ফিরি.!
              

 লেখক,

আখতারুল ইসলাম খোন্দকার