ভূমিকম্প কেন হয়? ভূমিকম্পের সময় করণীয় কি?

ভূমিকম্প কি

 

ভূমিকম্প একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দূর্যোগ। ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূ-পৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূ-ত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এই রূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলে। কম্পন-তরঙ্গ থেকে যে শক্তির সৃষ্টি হয়, তা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ভূমিকম্প মানবসভ্যতার জন্য অত্যন্ত বিধ্বংসী। 

 

জেনে অবাক হবেন যে, সারা পৃথিবীতে বছরে গড়ে ছয় হাজারের বেশি ভূমিকম্প হয়। এগুলোর বেশিরভাগই মৃদু, যেগুলো আমরা কখনো টের পাই না। সাধারণত তিন ধরনের ভূমিকম্প হয়ে থাকে—প্রচণ্ড, মাঝারি ও মৃদু। এদিকে আবার ভূমিকম্পের  উৎসের গভীরতা অনুসারে ভূমিকম্পকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়— অগভীর, মধ্যবর্তী ও গভীর ভূমিকম্প। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ভূ-পৃষ্ঠের ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে হলে অগভীর, ৭০ থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে হলে মধ্যবর্তী এবং ৩০০ কিলোমিটারের নিচে হলে তাকে গভীর ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত করেন বিজ্ঞানীরা। 

 

ভূমিকম্পের কারণ

 

ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরের পাত সঞ্চালন :

 

ভূপৃষ্ঠের ভেতর অনেক বড় বড় সঞ্চালনশীল মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় পাতসমূহের গতিশীলতার সময় যখন পরস্পরের সাথে প্রবল সংঘর্ষ হয় তখনই ভূমিকম্প হয়। তাই পৃথিবীর  অঞ্চলগুলো পাতসীমা বরাবর অবস্থিত, সেখানে ভূমিকম্প বেশি হয়। 

 

এছাড়াও এসব সঞ্চালনশীল পাত দুটি পরস্পর থেকে যখন  দূরে সরে যায় অথবা  সামনে-পিছনে গতিশীল হয় তখন ভূ-গর্ভে চাপের তারতম্য ঘটে এবং ভূমিকম্প হয়।

 

ভূ-পাত :

 

পাহাড় হতে যখন  বৃহৎ শিলাখন্ড ভূমির ওপর আছড়ে পড়ে, তখন ভূমিকম্প হয়। এটিকে ভূপাত বলে। ভূ-পাত বা ভূমি ফলসের কারণ হলো নতুন পর্বতের ভাজ শিলাগুলো পরস্পর দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থাকে না৷ অথবা মানুষের অধিক পাহাড় কর্তনের ফল। 

 

যেমন- ১৯১১ সালে তুরষ্কে যে ভূমিকম্প হয়েছিল, তা  হওয়ার কারণ ছিল পামীর মালভূমির  বিশাল ভূ-পাত।

 

শিলাচ্যুতি বা শিলাতে ভাঁজের সৃষ্টি :

 

পৃথিবীর অভ্যন্তরে রয়েছে অনেক বিশাল বিশাল শিলা। শিলাচ্যুতি বা শিলাতে ভাঁজের সৃষ্টি হলে ভূ-ত্বকের কোনো অংশ উপরে উত্থিত হয় বা নিচে বসে যায়। এর ফলে  চ্যুতির সমতলে প্রবল ঘর্ষন সৃষ্টি হয় ও ভূমিকম্প হয়। ১৯৫০ সালে আসামে ভূমিকম্প হয়েছিল এ কারণেই।

 

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত :

 

আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের ফলেও ভূমিকম্প হয়। এই সময় জ্বালামুখ দিয়ে প্রবলবেগে বাষ্প, লাভা প্রভৃতি বের হতে থাকে ও প্রবল ভূমিকম্প সংঘটিত হয় ।

 

তাপ বিকিরণ :

 

পৃথিবীর ভেতর প্রচুর তাপ সন্নিবিষ্ট আছে। বিকিরণের ফলে ভূ-ত্বক সংকুচিত হয়। এই সংকোচনের দরুণ ভূ-ত্বকে ফাউল ও ভাঁজ সৃষ্টির সময় ভূমিকম্প হয়ে থাকে। 

 

ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব

 

ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব সাধারণত খুব বেশিক্ষণ হয় না৷ সাধারণত  কয়েক সেকেন্ড হয়ে থাকে। কিন্তু এই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হয়ে যেতে পারে অকল্পনীয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। ভূমিকম্পের বিভিন্ন  মাত্রা অনুযায়ী ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। ভূমিকম্পের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য যে যন্ত্র ব্যবহৃত হয় তার একটি নাম রয়েছে- রিখটার স্কেল। রিখটার স্কেলে এককের সীমা ১ থেকে ১০ পর্যন্ত ১০ ভিত্তিক লগারিদমে দেয়া থাকে। এই স্কেলে মাত্রা ৫’৫  -এর বেশি হওয়া মানেই ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা। ভূমিকম্প যদি মাত্র এক ডিগ্রি বৃদ্ধি পায় এর মাত্রা ১০ থেকে ৩২ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। রিখটার স্কেল অনুযায়ী  ভূমিকম্পের মাত্রা—৫ – ৫.৯৯ মাঝারি, ৬ – ৬.৯৯ তীব্র, ৭ – ৭.৯৯ ভয়াবহ এবং ৮-এর উপর অত্যন্ত ভয়াবহ।

 

ভূমিকম্পের সময় যা করতে হবে

 

ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা আমরা আগে থেকে বিপদসংকেত পাই না৷ হঠাৎ করেই সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায় এই ভূমিকম্প। তাই ভূমিকম্পের সময় প্রাণ বাঁচাতে যা করবেন- 

 

১. যখনি টের পাবেন, ভূমিকম্প হচ্ছে,,  সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা ও উন্মুক্ত স্থানে আশ্রয় নিন।

 

২. উঁচু ভবনে থাকলে এবং বের হতে না পারলে জানালা বা দেয়ালের পাশে অবস্থান না নিয়ে শক্ত কোনো পিলার বা টেবিল, খাটের নিচে মাথায় হাত দিয়ে অবস্থান নিন।

 

৩. হতবিহ্বল হওয়া যাবে না,, ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করুন।

 

৪.  বহুতল ভবনে যদি থাকেন তবে একই জায়গায় অনেক মানুষ একসঙ্গে না থেকে ভাগ হয়ে আশ্রয় নিন।

 

৫. আপনার মোবাইলে ফায়ার সাভির্স এবং দরকারি মোবাইল নম্বরগুলো আগেই সতর্কতা হিসেবে আগেই রেখে দিন। বিপদের সময় আপনার অবশ্যই কাজে লাগবে।

 

৬.  দ্রুত নামতে গিয়ে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়বেন না কিন্তু৷

 

৭. ভূমিকম্প চলাকালীন সময় যদি সম্ভব হয় তাহলে মাথার ওপর শক্তকরে বালিশ অথবা অন্য কোনো শক্ত বস্তু [কাঠবোর্ড, নরম কাপড় চোপড়ের কুণ্ডলি] ধরে রাখুন।

 

৮. গ্যাস এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে যথাসম্ভব দূরে অবস্থান নিন।

 

৯. উচু ভবন থেকে দ্রুত নামার জন্য ভুলেও  লিফট ব্যবহার করবেন না।

 

১০. ভূমিকম্পের সময় যদি গাড়িতে থাকেন, তাহলে গাড়ি খোলা জায়গায় থামিয়ে গাড়িতেই থাকুন।

 

১১. জরুরি বিষয়, একবার ভূমিকম্পের পরপরই আরেকটা ছোট ভূমিকম্প হয় যাকে ‘আফটার শক’ বলে। তাই নিজেকে বিপদমুক্ত ভাবতে অন্তত একঘণ্টা সময় নিন। আফটর শক কখনও ১২ ঘন্টা পরও আসে।

 

১২. ভূমিকম্প শেষ হওয়ার সাথে সাথে আগুন জ্বালাবেন না৷ গ্যাস লিক হয়ে থাকলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *