জাদুকরী এক উদ্ভিদ অশ্বগন্ধা

 অশ্বগন্ধা 

 

অশ্বগন্ধা এমন এক প্রকার ভেষজ উদ্ভিদ যা আমাদের সুস্বাস্থ্য ও যৌবন ধরে রাখতে এক মহা উপকারী পাথেয়। এই উদ্ভিদ এক জাদুকরী উদ্ভিদ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রাচীনকাল থেকেই এই উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমান আধুনিক যুগেও আমাদের শরীরের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এই অশ্বগন্ধা উদ্ভিদের কোনো বিকল্প নেই। 

 

অশ্বগন্ধার উপকারিতা কি:

 

ইহা একটি জাদুকরী উদ্ভিদ। এটির উপকারী দিক অনেক।

 

অনিদ্রা ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে 

 

অশ্বগন্ধা মানুষের ক্লান্তি দূর করে খুব সহজেই। এর ফলে ঘুম আসে তাড়াতাড়ি, যা অনিদ্রা দূর করতে সাহায্য করে। অশ্বগন্ধার অ্যানজাইলটিক উপাদান মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের উপর কাজ করে মানসিক চাপ কমাতে সক্ষম। মানুষের স্মৃতিশক্তি বাড়াতে অশ্বগন্ধা বেশ কার্যকর। ক্যান্সার প্রতিরােধে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, অশ্বগন্ধা ক্যান্সার প্রতিরােধে সাহায্য করে। যাদের কেমােথেরাপি দিতে হয় তাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতিতে অশ্বগন্ধা কার্যকর।

 

ডায়বেটিস সমস্যায় 

 

অশ্বগন্ধার মূল ও পাতার রসে থাকে অ্যান্টি-ডায়বেটিক উপাদান যা ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এর মূল | ও পাতার কোষে ফ্ল্যাভােনয়েডস নামক উপাদান থাকে

যা ডায়বেটিস রােগীর দেহে ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে।

 

চুল ও ত্বকের যত্নে

 

 চুলের ক্ষেত্রে অশ্বগন্ধা বেশ উপকারী বলে মনে করা হয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, চুল পড়া কমাতে ও চুলকে মজবুত করতে অশ্বগন্ধা একটি কার্যকর ঔষধ। অশ্বগন্ধা ত্বকের যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে। এতে হয়তাে আপনি চিরযৌবনা হবেন না। কিন্তু আপনার ত্বকের ভাজ পড়া কিংবা দ্রুত বার্ধক্য আসা থেকে মুক্তি মিলবে। 

 

সাপের কামড়ে

 

 সাপে কামড় দিলে অশ্বগন্ধার ব্যবহারের প্রচলন বেশ পুরনাে এবং সাপের কামড়ের চিকিৎসায় এটি বেশ কার্যকরও। তবে অতি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনােমতেই ব্যবহার করা উচিৎ নয়।

 

যৌনক্ষমতা বাড়াতে 

 

মানুষের দেহে টেস্টোস্টেরন ও প্রােজেস্টেরনের পরিমাণ বাড়াতে অশ্বগন্ধা গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এই হরমােন বৃদ্ধির ফলে মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা ও যৌনক্ষমতা দুটিই বৃদ্ধি পায়। 

 

থাইরয়েডের সমস্যায়

 

 থাইরয়েডের সমস্যায় অশ্বগন্ধা একটি কার্যকর প্রতিষেধক হতে পারে। যাদের শরীরে থাইরয়েড হরমােনের পরিমাণ কম তাদের ক্ষেত্রে অশ্বগন্ধা হতে পারে খুবই উপকারী। 

 

রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা বাড়াতে 

 

মানুষের দেহে রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা বাড়াতে অশ্বগন্ধার জুড়ি নেই। অশ্বগন্ধায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এ কাজে সাহায্য করে। অশ্বগন্ধায় আছে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান যা মানুষের দেহে বিভিন্ন ইনফেকশন।

 

 রক্ত চলাচল নিয়ন্ত্রণে

 

 মানুষের দেহের রক্ত চলাচল নিয়ন্ত্রণে অশ্বগন্ধা বেশ কার্যকর। অশ্বগন্ধা দেহের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রেখে হৃৎপিণ্ডকে রােগ থেকে রক্ষা করে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, অশ্বগন্ধা মানুষের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং পেশির শক্তি বৃদ্ধি করে। আথ্রাইটি, থায় অশ্বগন্ধার গুঁড়া খুবই উপকারী।

 

অশ্বগন্ধার ক্ষতিকর দিক বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

 

অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো নয়৷ অশ্বগন্ধা ক্ষতির কারন হবে বেশি সেবন করলে 

 

  • একটানা দীর্ঘদিন অশ্বগন্ধা সেবনে ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রিক ও বমির মতাে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যা থেকে পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার দেখা দিতে পারে। 

 

  • গর্ভবতী মহিলার ক্ষেত্রে অশ্বগন্ধা সেবনে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

 

  • অশ্বগন্ধা রক্ত পাতলা করায় সাহায্য করে। তাই এক্ষেত্রে কোনাে অস্ত্রোপচার বা এ সম্পর্কিত কোনাে ঔষধ গ্রহণ করলে সমস্যা হতে পারে। কারণ পাতলা রক্ত হলে অধিক রক্তপাত হতে পারে যার ফল মারাত্মক হতে পারে। তাই এক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন জরুরী। 

 

  • অশ্বগন্ধা খেলে ঘুম ভালাে হয়। তাই অশ্বগন্ধা খেলে পাশাপাশি অন্য কোনাে ঘুমের ওষুধ না খাওয়া। খেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তবেই খাওয়া উচিৎ। 

 

  • অশ্বগন্ধার পাশাপাশি শর্করা কমানাের জন্য অন্য কোনাে ওষুধ সেবন দেহে শর্করার পরিমাণ অতিরিক্ত কমিয়ে দিতে পারে যা হতে পারে মারাত্মক ক্ষতির কারণ। কারণ, প্রাকৃতিক ভাবেই অশ্বগন্ধা শর্করা কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। 

 

  • যেসব মায়েরা বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়ান, তাদের ক্ষেত্রে অশ্বগন্ধার ঔষধ না খাওয়া ভালাে।

 

অশ্বগন্ধা কিভাবে খাবেন 

 

  • এছাড়া অশ্বগন্ধার মূলও পানিতে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে খাওয়া যেতে পারে। তাছাড়াও বাজারে অশ্বগন্ধার সিরাপও পাওয়া যায়, সেটিও সেবন করা যেতে পারে।
  • তাছাড়া বর্তমানে অশ্বগন্ধা উদ্ভিদের সঙ্গে অ্যালকোহল মেশানাে এক প্রকার ওষুধ পাওয়া যায় যাকে অশ্বগন্ধার টিংচার বলা হয়।

 

অশ্বগন্ধার ক্যাপসুল 

 

  • বাজারে ক্যাপসুল বাজারে পাওয়া যায়। অনেক সময় অশ্বগন্ধার মূলও বাজারে বিক্রি হয়। অশ্বগন্ধার ক্যাপসুল প্রতিদিন রাতে খাওয়া উচিৎ। একটা করে ট্যাবলেট প্রতিদিন রাতে খাওয়ায় বেশ উপকার পাওয়া যায়।

 

অশ্বগন্ধার পাউডার 

 

  • অশ্বগন্ধার গুড়া হালকা কুসুম গরম দুধের সাথে মিশিয়ে খেতে হবে। দুধের সাথে ৪/৫ গ্রাম পাউডার মিশিয়ে খাওয়া উচিৎ। এর সাথে মধু মিশিয়েও খাওয়া যায়।

 

অশ্বগন্ধার দাম 

 

বাজারে বিভিন্ন কোম্পানি অশ্বগন্ধা বিক্রি করে থাকে৷ সাধারণত ২৫০ গ্রাম অশ্বগন্ধা পাউডার এর দাম ৩৪০ টাকা বা এর কম বেশি হয়ে থাকে কোম্পানি ভেদে। 

 

অশ্বগন্ধার চাষ পদ্ধতি

 

কখন চাষ করবেন

 

প্রথমে জমি চাষ দিতে হবে যেন জমি আগাছা মুক্ত থাকে । তারপর জমি বানিয়ে নিতে মাটিতে জৈব সার মিশিয়ে নিতে হবে। বীজ পোঁতার আগেই জমিতে জল সেচ দিতে হবে।

কোন কারণে পােকা যাতে জমি ও ক্ষেতের ক্ষতি করতে না পারে তাই জমিতে কীটনাশক প্রয়ােগ করতে হবে। অশ্বগন্ধার বীজ জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। তবে সারি করে অশ্বগন্ধার বীজ পোঁতা হলে ভালাে ফলন হয়।

 

কিভাবে পরিচর্যা করবেন

 

শুরু থেকেই আগাছা নিয়ন্ত্রণ প্রথম থেকেই করতে হবে। ভালাে ভাবে নিড়ানি দিয়ে। | আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে। মাটিতে মাঝেমধ্যেই সেচ দিতে হবে যেন জমির রস ধরে রাখা যায়।

 

পােকার নিয়ন্ত্রণ কিভাবে করবেন

 

রােগপােকার আক্রমণ অশ্বগন্ধার চাষে তেমন দেখা যায় না। শীতকালে মাঝে মাঝে অশ্বগন্ধা গাছের পাতায় বিভিন্ন রােগের আক্রমণ লক্ষ্য যায়। এক্ষেত্রে তরল কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

 

কখন ফসল তােলা হবে

 

ফসল তােলার জন্য এপ্রিল মাস উত্তম। এই মাসে গাছের ফল পেকে যায়। এই মাসে মাটির নিচের শিকড়গুলি পুষ্ট হয়। তবে তােলার আগে একটা জলসেচ দিয়ে মাটি নরম করে নিতে হয়।

এর পর গাছ উপড়ে নিয়ে ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হয়। সাধারণ ভাবে প্রতি বিঘায়। অন্তত ৩০ কেজি বীজ ফলন পাওয়া যায়। এ গাছ থেকে শিকড় পাওয়া যাবে অন্তত ১৫ কুইন্টাল।।

 

অশ্বগন্ধা গাছ কোথায় পাওয়া যায়

 

অশ্বগন্ধা গাছ খুব সহজে সংগ্রহ করতে আপনার সরকারী নার্সারীতে যোগাযোগ করতে হবে আথবা বা ব্যক্তিগতভাবে উন্নত অশ্বগন্ধা খামার থেকে বীজ সংগ্রহ করা যেতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি নার্সারীতে যোগাযোগ করতে পারেন।