রহস্যের নাম আমাজন!

মহাবন আমাজন সর্ম্পকে আমরা কতটুকু জানি? সত্যিটা হল মানব জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ৫৫ মিলিয়ন বছর আগের সৃষ্টি এই বনাঞ্চল সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি।

প্রথমে নামকরণ দিয়েই শুরু করি। ফ্রান্সিসকো ওরেল্লানা নামের একজন স্পেনীয় পর্যটক এই বৃহৎ বনাঞ্চলকে আমাজন নামে নামকরণ করেন। পৃথিবীর সবথেকে বড় এই রেইন ফরেস্ট পৃথিবী এবং মানবজাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

* সমগ্র পৃথিবীর প্রায় ২০. ভাগ অক্সিজেনই প্রস্তুত হয় আমাজনে।

* ব্রাজিল, কলম্বিয়া, বলিভিয়া, পেরু, গুইয়ানা, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা, ফ্রান্স গুইয়ানা সহ- মোট নয়টি দেশকে জড়িয়ে আছে এই বনাঞ্চল।

 

* ৬৯৯২ কিঃ মিঃ দৈর্ঘ্যের আমাজন নদী পৃথিবীর সবথেকে দীর্ঘতম নদী।

 

এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতেই থাকবে, কেননা পৃথিবীর উপর আমাজনের গুরুত্ব তালিকা করে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

 

কিন্তু আমরা কি জানি এই মহাবন আমাজন কত আশ্চর্য ও রহস্যের আধার? চলুন, আমাজনের অজানা রহস্যময় জগত থেকে একটু ঘুরে আসি।

 

প্রাচীন উপনিবেশঃ

 

ওয়াশিংটন পোস্ট অনুযায়ী ২০১৮ সালের মার্চে প্রত্নতত্ত্ববিদ গ্রেগরীয় ডি সুজা ও তার দল মহাবন আমাজনে ৮১ টি প্রাচীন কলোনি আবিষ্কার করেন।

তার মতে ইউরোপীয়রা আমাজনে প্রবেশের পূর্বেই প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষ আমাজনে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। তিনি ধারণা করেন আমাজনে এরকম আরো ১০০ এর অধিক প্রাচীন কলোনি রয়েছে।

 

৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ফুটন্ত পানির নদীঃ

 

আগেই বলেছি আমাজনে রয়েছে পৃথিবীর সবথেকে দীর্ঘতম নদী। কিন্তু এছাড়াও সেখানে ছোট-বড় অগণিত নদী রয়েছে, যার মধ্যে একটির নাম ফুটন্ত পানির নদী।

নামটি এমনি এমনি আসেনি। উচ্চ তাপমাত্রার পানির এই নদী রীতিমতো ফুটতে থাকে। কখনো কখনো এর তাপমাত্রা ৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়

সেখান থেকে ক্রমাগত জলীয়বাষ্প উঠতে থাকে যা সেখানে বসবাসরত সকল প্রাণীর জন্য সতর্ক সংকেত। বিজ্ঞানীরা এই নদীর উচ্চ তাপমাত্রা প্রবাহের কারণ এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারেন নি।

READ MORE:  তাশাহুদ পড়ার সময় আঙ্গুল কখন উঠাবো?

 

সবথেকে বড় ও ভয়ংকর মাকড়সাঃ

 

আমাজন অনেক আশ্চর্য প্রাণীর আবাসস্থল। আমাজন কে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এখানে এমন কিছু সৃষ্টি দেখা যাবে যা পৃথিবীর কোথাও নেই।

এদের মধ্যে একটি হচ্ছে পাখিখেকো গলিয়াথ মাকড়সা এটি প্রায় ১৩ সেন্টিমিটার লম্বা। ভাগ্যিস এরা মানুষের জন্য হুমকি নয়।

 

ভিক্টোরিয়া আমাজনিকা পদ্মঃ

 

আমাজনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার সৃষ্টির সবই সাধারণত বিশালাকার। এখানে এক ধরনের পদ্মের দেখা মেলে যার আকৃতি এতটাই বড় যে এর উপর অনায়াসে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে।

এর ব্যাস তিন মিটারের বেশি যা দেখতে খুবই সুন্দর। রানী ভিক্টোরিয়ার নাম অনুসারে এর নাম রাখা হয় ভিক্টোরিয়া আমাজনিকা। তবে পা দেয়ার আগে সাবধান, কাটা রয়েছে।

 

 

পোটো নামের ছদ্দবেশী পাখিঃ

 

আমাজনে পোটো নামের এক ধরনের ছদ্দবেশী পাখির দেখা মেলে। এরা অনায়াসে দুই-তিনদিন নড়াচড়া ছাড়াই একটি ডালে বসে কাটিয়ে দিতে পারে।

সাধারণ দৃষ্টি এদেরকে ধরতে পারে না। তার উপর এরা নিশাচর, তাই  যারা এর দেখা পাবেন তা নিশ্চিত সৌভাগ্যবান।

 

হেঁটে বেড়ানো গাছঃ

 

লর্ড অফ দ্য রিংসের সেই হেঁটে বেড়ানো গাছ গুলোর কথা মনে আছে? তবে হ্যা, আমাজনের রয়েছে এমন হেঁটে বেড়ানো গাছ যা উইজার্ড গ্যান্ডাল্ফের থেকে বাস্তব।

গাছগুলো নিজেদের স্থান পরিবর্তন করতে জানে, যদিও এদের গতি খুবই কম। সূর্য আলো এবং পানির দিকে এরা তাদের শিকড়গুলো বাড়াতে থাকে এবং পেছনের শিকড়গুলো শুকিয়ে যায়।

এভাবে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। পাম গাছের নেয় দেখতে এই গাছের নাম ‘কাশাপোনা  তবে ভুলেও এদের হাঁটাচলা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে যাবেন না যেন!

 

জেসাস লিজার্ডঃ

 

READ MORE:  অতিরিক্ত চা পান করার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ

এই গিরগিটি গুলো পানির উপরে দৌড়াতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। যখন বিপদে পড়ে অথবা শিকারের সময় এরা অনায়াসে পানির উপর দিয়ে দৌড়ে বেড়ায়।

গিরগিটি গুলো দেখতে খুবই মজার। একবার দৌড়াতে দেখলে সেটি হবে আপনার দিনের সবথেকে হাস্যকর অভিজ্ঞতা।

 

ম্যাকাও ক্লেলিকঃ

 

আমাজন পৃথিবীর দুর্লভ ও চিত্তাকর্ষক সব পাখিদের আবাসস্থল। আপনি যদি টিয়াপ্রেমী হয়ে থাকেন তাহলে আমাজন আপনার জন্য সঠিক জায়গা।

আমাজনের কিছু স্থানে সোডিয়াম সমৃদ্ধ মাটি রয়েছে যেখানে ম্যাকাও টিয়াদের রাজ্য গড়ে উঠেছে। এদের রঙিন পালক আপনাকে স্বর্গীয় অনুভূতি দেবে।

 

কাচের ব্যাঙঃ

 

মনে প্রশ্ন হবে, সেটা আবার কি? আমাজনে রয়েছে সবুজ রঙের এক ধরনের ব্যাঙ যাদের শরীর কাঁচের মত স্বচ্ছ। আপনি বাইরে থেকে এদের শরীরের সবকিছু দেখতে পাবেন।

স্বচ্ছতার কারণে এরা আশেপাশের পরিবেশের রং ধারণ করে থাকে ফলে কোন শিকারি তাদের দেখতে পায় না।

 

র্যাফ্লেসিয়া ফুলঃ

 

দৈত্যাকার এক ফুলের নাম এটি। এটি পৃথিবীর সবথেকে বড় ফুল। মজার ব্যাপার হল এই গাছের কোন শেকড়, কান্ড কিংবা পাতা নেই।

শুধু এগুলোই এর বিশেষত্ব নয়, এই ফুলটি এর মাংস পচা গন্ধের জন্য বিখ্যাত এটি পৃথিবীর বুকে অন্যতম বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের উদাহরণ।

 

নিস্তব্ধ অন্ধকার বনভূমিঃ

 

আমাজন পৃথিবীর সবথেকে অন্ধকার বনাঞ্চল। গাছগুলো এত মোটা, এত ঘন, ও এত উঁচু যে সূর্যের আলো প্রায়ই মাটি পর্যন্ত পৌঁছায় না।

 

বৃষ্টিপাত হলে পানি মাটি পর্যন্ত পৌঁছাতে ১০ মিনিট লেগে যায়

 

গোলাপি ডলফিনঃ

 

আমাজনের আরেকটি বিশেষ প্রাণী হল গোলাপি রঙের ডলফিন। এই প্রজাতির ডলফিন এই অঞ্চল ছাড়া পৃথিবীর কোথাও দেখা যায় না। এক একটি ডলফিন একজন প্রমাণ সাইজের মানুষের মতন।  

প্রবাদ আছে ডলফিনগুলো সন্ধ্যায় মানুষের রূপ ধারণ করে এবং সুন্দরী তরুণীদের বিমোহিত করে নদীতে নিয়ে যায়, তারপর তারাও ডলফিন হয়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না এদের গায়ের রং কেন গোলাপি।

READ MORE:  ঘরোয়া পদ্ধতিতে এয়ার কন্ডিশন ছাড়াও ঘর ঠান্ডা রাখুন

 

বিষধর ব্যাঙঃ

 

আমাজনের বিষধর ব্যাঙ পৃথিবীর অন্যতম বিলুপ্তপ্রায় বিষাক্ত প্রাণী। দেখতে অসম্ভব সুন্দর, কিন্তু এদের সামান্য বিষ ১০ জন মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

আমাজনের আদিবাসীরা এই ব্যাঙের বিষ তীরের ফলায় মেখে শিকার করে এরা কালো, হলুদ, সবুজ, নীল, তামাটে সব রঙের হতে পারে।

 

বুলেট পিঁপড়াঃ

 

এক ধরনের পিঁপড়া আছে যাদের সামনে পড়া যে কোন মানুষের জন্য দুঃস্বপ্ন এবং তারা মহাবন আমাজন এ বাস করে। এদের নাম বুলেট পিঁপড়া।

এদের কামড় বুলেটের আঘাতের মতই যন্ত্রণাদায়ক, সেখান থেকেই এই নাম এসেছে। এরা পৃথিবীর সবথেকে বড় পিঁপড়া। একটা কামড় খেলে ২৪ ঘন্টা অসম্ভব যন্ত্রণায় কাটাতে হবে এটা নিশ্চিত।

 

আমাজনীয় উপজাতিঃ

 

যদিও মহাবন আমাজন এর বিশেষ সব সৃষ্টি এবং গাছপালার জন্য বিখ্যাত, কিন্তু এখানে প্রায় ২১ মিলিয়ন মানুষ রয়েছে যারা আমাজনকেই নিজেদের বাড়ি হিসেবে মনে করে।

তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা সব কিছুই আসে এই রেইন ফরেস্ট থেকে। এরা খুব সুন্দর ভাবে প্রকৃতির সাথে নিজেদের অস্তিত্ব কে মানিয়ে নিয়েছে, ফলে এদের উপস্থিতি আমাজনের ইকোসিস্টেম এর কোন ক্ষতি করে না।

আমাজনের প্রাণিজগতের রহস্য এবং এই বনের প্রাচীনতা, গভীরতা লিখে শেষ করার মত নয়। এখনো এমন অনেক স্থান আছে যেখানে মানবজাতির সৃষ্টি থেকে কারো পায়ের ছাপ পর্যন্ত পড়েনি।

কিন্তু আমাজন এখন রয়েছে হুমকির মুখে। বিভিন্ন চোরাকারবারি আর বন উজাড়ের দরুন দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে পৃথিবীর এই বৃহৎ বনাঞ্চল।

বিভিন্ন প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে খাদ্য শৃংখল, ইকোসিস্টেম পৃথিবীর সামগ্রিক আবহাওয়ার উপর।