তুমি না হয়.. একগুচ্ছ কদম হাতে এসো….

 

লেখক

সাবরিনা মমতাজ মম

পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ,

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

রিমঝিম। মধ্যবিত্ত পরিবারের আদুরে ছোট মেয়ে। খুব একটা আবদার করার অভ্যেস নেই তার। বাবা হারা মেয়ে তো। খুব ছোট বেলায় সে তার বাবাকে হারায়। বাসায় এখন সে তার মা, আর বড় ভাই থাকে। এক বোন ছিল তার বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাই হিসেবে সিয়াম খুব বেশিই কেয়ারিং। বোন, মা মুখ ফুটে না বলতেই যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাদের প্রয়োজন গুলো মেটানোর। কিই বা করবে!! খুব ছোট বেলাতেই যে পরিবারের হাল তাকে ধরতে হয়েছে। সে নিজের জন্য কিছু না করলেও পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করে। 

 

রিমঝিমের মা বাসায় দর্জির কাজ করে। এ থেকে যা আয় হয় সেটা তিনি রিমঝিমের বিয়ের জন্য জমাচ্ছেন। খুব সাদা সিদে মানুষ তিনি। স্বামী চলে যাওয়ার পর সন্তানদের আকড়ে ধরেই বেঁচে আছেন। জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন তিনি।

 

রিমঝিম এখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ছোট বেলা থেকেই সে খুব চুপচাপ আর পড়ালিখায় ভীষণ ভালো। খুব একটা দাপুটে না সে, বলতে গেলে সহজ সরল একদম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ায় তার বড় ভাই শখ করে তাকে একটি স্মার্ট ফোন কিনে দেয়। রিমঝিম মুখেনা বললেও মনে মনে বেশ খুশিই ছিল। ফোনের ব্যাপারে তেমন কিছু জানে না সে। আস্তে চস্তে বন্ধু বান্ধব এর মাধ্যমে সোসাইল মিডিয়া সম্পর্কে জানে। একদিন শখ করে ফেসবুক আইডি খুলে সে। চেনা জানা সব ফ্রেন্ড দের এড দেয়। এভাবে টুকটাক ফেসবুক চালিয়ে বেশির ভাগ সময় পড়ালিখাই করত সে। হঠাৎ একদিন রিকুয়েষ্ট লিস্টে অনেক রিকুয়েষ্ট দেখে বেছে বেছে দুই চারজন কে একসেপ্ট করলো। 

এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। 

 

রাত প্রায় ২ টা। পড়াশেষ করে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ম্যাসেন্জারে একটি ম্যাসেজ আসে। সে উৎসুক হয়ে চেক করে এতো রাতে কে তাকে নক দিলো। আইডির নাম বাদল আহমেদ। 

READ MORE:  আব্দুল হাই মােহাম্মাদ সাইফুল্লাহ জীবনী | Biography of Abdul Hai Muhammad Saifullah

ম্যাসেজটি ছিল, হাই আমি বাদল। তুমি?

রিমঝিম রিপ্লাই দিলঃ আইডিতে তো নাম আছে দেখতে পান না?

বাদলঃ তা তো পাই। তবে আপনার নামটা বেশ সুন্দর তাই ভাবলাম ফেইক আইডি না তো!! তাই আর কি! কিছু মনে করবেন না।

এভাবে দুই একটা কথার পর রিমঝিম ফোন অফ করে ঘুমিয়ে পড়ে।

দুই একদিন কথা বলতে বলতে পরিচিত হয় তারা। বাদল বাবা মায়ের একমাএ সন্তান। পড়ালিখা করছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফ্যামিলি ভালো।

 

এভাবে কথা বলতে বলতে তাদের দুইজন দুইজনে ভালো লেগে যায়। কিন্তু কেউ কাউকে বলতে পারে না। দেখাও হতো না দূরত্বের জন্য। প্রায় ১ বছরের কাছাকাছি এসে বাদল একদিন রিমঝিম কে মনের কথা বলেই দেয়। রিমঝিম প্রথমে না করলেও পরে রাজি হয়। রিলেশন বেশ চলছিল তাদের। রাগ, অভিমান, খুনসুটি আর ভালবাসাময়। এখনো কিন্তু তাদের দেখা হয় নি। 

 

বাসায় কেউ কিছুই বুঝতে পারে না। নিত্যদিনের মতো চলছে সবকিছু। হঠাৎ একদিন রিমঝিমের মাথা ব্যাথা উঠে অনেক বেশি। ডাক্তার এর কাছে গেলে ডাক্তার মেডিসিন দেয় আর ঠিকমতো ঘুমাতে বলে। টেনশন করে করে এই হাল হয়েছে মেয়েটার, রিমঝিমের মা কান্না কাটি করে আর বলে। সেদিন সারাদিন বাদলের সাথে আর যোগাযোগ হয় না রিমঝিমের। ওদিকে বাদল অপেক্ষায় ছিল ১ টা ম্যাসেজ এর। আর টেনশনে খাওয়া দাওয়া করে নি ছেলেটা। পরের দিন রিমঝিম একটু সুস্থ হয়েই বাদলকে ফোন দেয়.. সে কি কান্না বাদলের কেন তাকে একটা কল দেয় নি। পরে রিমঝিম সব বলে। সব শুনে বাদল আফসোস করে আর বলে আজ দূরে বলে এমন সময় তোমার পাশেও থাকতে পারলাম না। রিমঝিম তাকে বলে কিছু হবে না ঠিক হবে সব। 

 

এভাবে চলতে চলতে ১ বছরের কাছাকাছি তাদের রিলেশনশিপ। বাদল ও রিমঝিম ৩য় বর্ষে উঠেছে। মাঝে মধ্যেই রিমঝিমের মাথা ব্যাথা উঠত কিন্তু মেডিসিন খেলে আবার সেরে যেত। বাদল ও মাঝে মাঝে অসুস্থ হতো। আর দুইজন দুই পাশে কান্না করত কারো অসুস্থতার সময় কেউ পাশে থাকতে পারে না বলে। ভালো মন্দ মিলিয়ে ভালোই চলছিল তাদের। রিলেশনশীপের ১ বছর হওয়ার খুশিতে তারা ঠিক করে যে তারা দেখা করবে। বাদল রিমঝিম কে বার বার প্রশ্ন করতে থাকলো তার কি কি ভালো লাগে, কি কি লাগবে তার। 

READ MORE:  হীমশীতল বাক্স - ছোট গল্প

রিমঝিম বরাবরের মতোই না করল আর বলল শুধু তুমি এসো আমি তাতেই খুশি। বাদল বার বার রিকুয়েষ্ট করায় রিমঝিম বলল এখন তো বর্ষার সময়…

তুমি না হয়

….একগুচ্ছ কদম হাতে এসো।

 

আর বাদল রিমঝিমকে নীলশাড়ি, চুড়ি আর কালো টিপে দেখতে চেয়েছিল।

 

যেদিন তাদের দেখা হওয়ার কথা সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি। কখনো গুড়িগুড়ি কখনো বা খুব জোরে। মনে হচ্ছে আকাশের মন যেনো খুব ভাড়।

তবুও বাদল রেডি হয়ে সকাল সকাল সাদা পাঞ্জাবি পড়ে রেডি হয়ে, হাতে একগুচ্ছ কদম আর গিফট নিয়ে বাসে উঠল। আর কতরকমের কল্পনা করতে লাগল। কি বলবে রিমঝিমকে আরো কত কি। দুপুরের দিকে বাদল ঢাকায় এসে নামল। কিন্তু যেখানে রিমঝিমের দাড়ানোর কথা সেখানে তো কেউ নেই! কোথায় রিমঝিম? তবে কি সে আসে নি? কিছুক্ষণ খোজাখুজির পর বাদল বসে পড়ল। মন খারাপ হলো তার সাথে একটু অভিমান ও। ভাবল ফিরে যাবে সে। কিন্তু কেন রিমঝিম এমন করলো? ও তো এমন মেয়ে নয়। কল রিসিভ করছে না। তবে কি অভিমান করল? নাকি কোনো বিপদ হলো।? 

 

বাদল ভাবল এভাবে খোজ না নিয়ে ফিরে যাবে না সে। রিমঝিমের বাসার ঠিকানা তো আছে তার কাছে। সে তার বাসায় যাবে, আর জানতে চাইবে কেনো সে আসনি!

 

এরপর বাদল রিমঝিমের বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিল, কিছুক্ষণ পর তার বাসার সামনে এসে পোঁছালো। কিন্তু এখানে এতো মানুষ কেনো? কিসের ভীড় সবাই এভাবে কাঁদছে কেনো? ভীড় ঠেলে ভিতরে গেলে সে যা দেখল তার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। একটা লাশের পাশে রিমঝিমের মা, বোন, ভাই অঝোরে কাঁদছে। বাদলের বুঝতে আর বাকি রইল না। কিন্তু হঠাৎ কি এমন হলো! বাদল কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। 

 

READ MORE:  বিশ্বাস

কাল রাতে বাদলের সাথে কথা শেষ করার পর হঠাৎ রিমঝিমের প্রচন্ড মাথা ব্যাথা উঠে। হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার টেস্ট দেয়। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বলে রিমঝিমের ব্রেইন টিউমার হয়েছে এবং এটা লাস্ট স্টেজে তাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। তবুও তারা চেষ্টা করবে। কিন্তু চিকিৎসা শুরুর আগেই রিমঝিম পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছে।

কদম আর দেয়া হয়নি না বাদলের। মাটি দিয়ে আসার সময় কদমগুলো কবরের উপরে রেখে আসে বাদল। 

 

আজ রিমঝিম চলে যাওয়ার ৫ বছর হলো। বাদল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসছে আর জানালার পাশের সিটের জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছে আর আগের স্মৃতি মনে করে দুচোখ নিজের অজান্তেই ভিজে আসছে। প্রতিবছর সে এই দিনে কদম নিয়ে আসে রিমঝিমের কবরে দেবার জন্য। আর কাঁদে আর বলে রিমঝিম তোমার জন্য কতো কদম ফুলের গাছ লাগিয়েছি জানো? কিন্তু তুমি তো দেখলে না। কেনো এমন হলো রিমঝিম? কদম তো তোমায় দেয়া হলো না…….

আমি তো একগুচ্ছ কদম হাতেই এসেছিলাম। তবুও কেনো অভিমান করে না জানিয়ে চলে গেলে? 

বাদল আর কখনো বিয়ে করবে না, বাকিটা জীবন রিমঝিমের স্মৃতি নিয়েই কাটিয়ে দিবে ভেবেছে। ভালবাসা কি তাহলে এমনি হয়!