ভালবাসার গল্প ( Love story) – ভালবাসা সব সময় পবিত্র হয় না

ভালবাসার গল্প ( Love story) আজকের আয়োজন ভালবাসা সব সময় পবিত্র হয় না। চলুন পড়ে ফেলি আজকের ভালবাসার গল্প ( Love story)

 

লেখালিখি আমার পেশা নয় একরকম নেশা,বা শখ বলতে পারেন। কিন্তু বেশকিছুদিন কিছুই লেখা হয়না। কাজের চাপে সময় হয়ে ওঠেনা, এবং সেইসাথে বলা যায় ব্যস্ততা ধীরেধীরে আমার আগ্রহটাও যেন ছিনিয়ে নিচ্ছে। যাইহোক অনেক কষ্টে আজ সময় ও আগ্রহটা একসাথে নিয়ে আবার একটা গল্প লিখতে বসলাম। অবশ্য এইটাতে আমার পূর্বেকার গল্পগুলোর মত বাস্তব আর কল্পনার মিশ্রণ নেই। এইটা সম্পূর্ণই একটা বাস্তব জীবন কাহিনী থেকে নেওয়া, এবং সরাসরি কিছুটা উপলব্ধিও করেছি। তাহলে এখন মূল ঘটনাতে যাওয়া যাক।

এইতো সেদিন ঈদেরছুটিতে ঢাকা থেকে যশরে যাচ্ছিলাম গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমার পুরো ফ্যামিলি আগেই চলে গিয়েছিল, অফিস দেরিতে ছুটি হওয়ায় আমাকে একাই যেতে হয়েছে। তোহ, ট্রেন জার্নি আমার আগাগোড়াই পছন্দের। নিরিবিলি শান্তির জার্নি এটা। তাই ট্রেনেই যাচ্ছিলাম। আমার সামনাসামনি ছিটে বসেছিল একটি পনেরোষোলো বছরের ফুটফুটে কিশোরী ও তার সাথে আমার বয়সী অর্থাৎ চল্লিশোর্ধ এক লোক।

কিছুক্ষণ যাওয়ার পরে আমি লক্ষ্য করলাম লোকটি সেই শুরু থেকে অবাকদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার আবার ছোট থেকেই একটি প্রব্লেম আছে তা হলো,”কেউ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি অস্বস্তিবোধ করি। তাই বিষয়টা বুঝতে পারার পর থেকে কিছুক্ষণ সহ্য করার পরেও তার দৃষ্টি না সরাতে বাধ্যহয়েই তার সাথে কথাবলা শুরু করতে গেলাম। কিন্তু কথা বলতে গিয়েই অবাক হলাম, আমি কথাবলা মাত্রই সে মুখ ফিরিয়ে নিল। বিষয়টাতে অনেকটা অপমান বোধ করলাম।

কিন্তু পরেক্ষণেই তার মেয়েটি বলল,” আংকেল, দয়কারে কিছু মনে করবেন না, বাবার সামান্য মানসিক সমস্যা আছে। যার কারণে সে কারো সাথেই তেমন কথা বলতে চায় না। তখন আমার অপমানবোধটা চলে গেল। মেয়েটির সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। বেশ মিশুকে মেয়েটি। মনেমনে ভাবলাম, ” আজ আমার একটা সন্তান থাকলে হয়ত তার বয়সীই হতো। মেয়েটির সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পরে সেই-ই আমাকে তার বাবার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে শুরু থেকেই জানালো। যা ‘সে তার দাদা-দাদীর কাছে শুনেছে ,”

লোকটি,অর্থাৎ তার বাবা, ছোট থেকে খুবিই মেধাবী ছিল। তার নাম ‘ইব্রাহীম হোসেন রাজ’। কিন্তু বাকী সাধারণ বাচ্চাদের মত চঞ্চল ছিলনা। শান্ত নিরীহ প্রকৃতির ছিল, অন্তত স্কুল জীবনের ক্লাস সেভেন পর্যন্ত। যার ফলে ক্লাসের সবাই তাকে নিয়ে মজা করতো। কিন্তু ক্লাস সেভেনে একদিন সে জীবনের প্রথম কারো সাথে ঝগড়া অর্থাৎ মারামারি করে। এর আগে কেউ তাকে কিছু বললে প্রতিবাদ না করে সে “বাড়িতে এসে মায়ের কাছে কান্নাকাটি করতো।” কিন্তু সেদিন থেকে সে নিজেকে একটুএকটু করে পাল্টাতে শুরু করে। স্মার্ট সাবলীল হতে শুরু করে সে।

এবং তখনি তার জীবনে আসে তার প্রথম ভালবাসা। তারই ক্লাসমেট ‘অরিন’ নামে একটি মেয়ে। অবশ্য ওই বয়সে ভালবাসা কি জিনিষ তা খুব একটা বোঝার কথা না। তাই সেইটাকে ভাললাগাই বলা যায়। যার প্রতিফলনটা তার দিকে তাকিয়ে থাকা, তাকে দেখে মিষ্টি হাসি দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবং সেইসাথে একসময় মেয়েটিও তাকে তার ভালোলাগা বানিয়ে ফেলেছিল। এভাবে তারা ক্লাস এইটে পা রাখে। তাদের মধ্যে আস্তে-আস্তে ভাল বন্ধুত্বও হয়ে যায়। কিন্তু সেই বন্ধুত্বটা ভালবাসাই রূপান্তরিত হওয়ার ঠিক আগেই তাঁদের দুজনের সামনে চলে এসেছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা।

ছেলেটি অর্থাৎ রাজের বেষ্ট ফ্রেন্ড তাকে জানায় সে’ অরিনের প্রেমে মগ্ন। এবং এদিকে অরিনের এক কাজিন যে’ তাদের ক্লাসেই পড়তো,’সে রাজকে তার পছন্দের কথা অরিনকে জানিয়ে তাঁদের মাঝে রিলেশন করিয়ে দেওয়ার জন্য হেল্প চায়। এই ঘটনাটা রাজ ও অরিন দুজনের মনেই জ্বলনের সৃষ্টি করেছিল। এর ফলেই তার বুঝতে পারে তাদের দুজনের মাঝের বন্ধুত্বটা শুধুমাত্র ভালোলাগাতেই সীমাবদ্ধ নেই, সেইটা ভালবাসায় পরিণত হয়ে উঠেছে।

কিন্তু তারা বিষয়টা কেউ কাউকে জানাতে পরছিলনা। লজ্জায়/ভয়ে অথবা তাদের বেষ্টফ্রেন্ডস দের কথা ভেবে। এভাবে তারা ক্লাস এইট পাশ করে। এবং তারপরই রাজের পরিবার তার বাবার চাকরীর পোস্টিং এর সুবাদে শহর পালটিয়ে অন্য শহরে চলে যায় এবং অরিনও স্কুল চেঞ্জড করে ফেলে। এখানেই তাদের এই সুন্দর কিশোর বয়সী অপ্রকাশিত ভালবাসার সম্পর্কটার স্থগিত ঘটে।
তারা দুজন দুজনকে একটাসময় ভুলে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে থাকে।

এভাবে নতুন স্কুলের ক্লাস নাইনের ফাইনাল এক্সাম দেওয়ার সময় রাজকে তার স্কুলের ক্লাস এইটের একটি মেয়ে (‘ঈশিতা’) এসে তাকে প্রপোজ করেছিল, কিন্তু রাজ আবার তারই ক্লাসের অন্য একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে যায় নাম ‘অহনা’। যার চেহারা ও এটেটিউড অনেকাংশ অরিনের সাথে মিলে যায়। এজন্যই রাজ তাকে পছন্দ করে। কিন্তু রাজ অহনাকে প্রপোজ করলে অহনা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এবং সেইসময়ই এই ক্লাস এইটের ঈশিতা নামক মেয়েটি তাকে প্রপোজ করেছিল, তাই অহনাকে দেখানোর জন্য সে ঈশিতার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে প্রেম করে। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর ঈশিতার পরিবার তাদের রিলেশনের কথা জানতে পেরে ঈশিতাকে অন্য স্কুলে শিফট করিয়ে, তাদের ভেতরের সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল।

READ MORE:  বদ জ্বীনের গল্প -পর্ব -১

রাজ এই পরিস্থিতিকে খুব সহজেই মেনে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল, কারণ’ সে ঈশিতাকে মন দিয়ে ভালবাসতোনা। এভাবেই তার স্কুল লাইফ ও কলেজ লাইফ পার হয়ে যায়।

ওইদিকে সেই অরিন যে ছিল রাজের প্রথম ভালবাসা। সেও তখন কলেজ লাইফ শেষ করে ভার্সিটিতে উঠেছে। অনিন্দ্য সুন্দরী হওয়ার সুবাদে তার পিছে ছেলেরা যেন লাইন দিয়ে থাকে। তবুও সে সবাইকে প্রত্যাখ্যান করেই চলে।কারণ’ তার মনটা এখনো তার প্রথম ভালবাসা রাজের কাছেই পড়ে আছে। সে রাজকে এখনো ভুলতে পারেনি। আজও সে রাজের অপেক্ষায় আছে। কথায় আছে “ভালবাসা হারিয়ে গেলেও একসময় ফিরে আসবে যদি কিনা সেই ভালবাসা সত্যিকারের হয়।” অরিনের ক্ষেত্রে কথাটা তার সম্পূর্ণ প্রতিফল দেখালো, তার অপেক্ষার প্রহর শেষে তার ভালবাসা তার কাছে ফিরে এসেছিল।

স্কুল কলেজ লাইফ শেষ করে ভাগ্যক্রমে রাজ আর অরিন কাকতালীয়ভাবে একই ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল। তারা এতদিন বহুদূরে থাকলেও অরিনের ভালবাসা যেন রাজকে তার শহরে তার ভার্সিটিতে টেনে এনেছে। নতুন ভার্সিটি লাইফে একমাস ক্লাস করার পর তাদের ক্যাম্পাসেই তাদের মুখোমুখি দেখা হয়ে যায়। এতবছর পরেও তারা দুজন দুজনকে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল করেনা। তাদের মাঝে আবার বন্ধুত্ব থেকে ভালবাসা তৈরি হয়। এবার আর তাদের ভালবাসা অপ্রকাশিত হয়ে থাকেনি। গভীরভভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের জীবনটা নতুন করে সুখে নিমজ্জিত হয়েছিল। এভাবে দুবছর প্রেম করার পর তারা তাদের ভার্সিটিরর বেস্ট কাঁপল হয়ে উঠেছিল।

তাদের ভালবাসা দেখে যে কারো হিংসে হতো।কিন্তু একজন যেন খুব বেশিই হিংসে করতো। সে অরিনের ভার্সিটির ক্লাসমেট রিফাত। সেও অরিনকে ভালবাসতো। অনেকবার প্রপোজালও দিয়েছিল কিন্তু অরিন তাকে বারবার প্রত্যাখ্যানই করে গেছিল। তাই তার অরিন ও রাজের ওপর একটা বিশেষ ক্ষোভ ছিল। কিন্তু সে কখনো তাদের ঝামেলা করার সুযোগ পায়নি কারণ’ রাজের সাথে ভার্সিটির বড়বড় নেতাকর্মীদের খাতির ভাল হয়ে গিয়েছিল ততদিনে।

যাইহোক অরিনের অত্যন্ত প্রিয় একটি জায়গা ছিল একটি ব্রিজ। যেখানে সে রাজকে নিয়ে যেত প্রায়ই। বিশেষকরে স্পেশাল দিনগুলোতে। ব্রিজটা তাদের অনেক অনেক রোমান্টিক স্মৃতির সাক্ষী হয়ে থাকতো। একদিন তেমনি একটি রোমান্টিক দিন এসে পৌছালো,” দিনটি ছিল রাজের বার্থডে।” তারা দুজন সারাদিন অনেক ঘুরাঘুরির প্লান করে ব্রিজটাতে প্রথমে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেদিন রাজ খুবিই এক্সাইটেড ছিল কারণ’ সেদিন সে’ অরিনকে তাদের বিয়ের প্রপোজাল জানিয়ে একটি আংটি পরিয়ে দিতে চেয়েছিল। অতঃপর যথাসময়ে উক্ত স্থানের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল, কিন্তু রাস্তায় জ্যামের কারণে একটু দেরি করেই সে পৌঁছিয়েছিল।

ব্রিজের কাছাকাছি গিয়েই সে অরিনকে ফোনকল দিতে লাগলো, কিন্তু ফোন বার বার ট্রাই করেও বন্ধ বলছিল। তার আসতে একটু লেট হয়ে গেছে, তাই সে ভেবেছিল,” অরিন হয়ত রাগ করে ফোন বন্ধ করে রেখেছে।” তাই সে ব্রিজের কাঙ্ক্ষিত স্থানে যেতে লাগলো

কিন্তু, কাঙ্ক্ষিত স্থানের যতোই কাছাকাছি যচ্ছিলো তার বুকের ভেতরে যেন ততোই চাপা ব্যাথা অনুভব হচ্ছিলো। একপ্রকার শূন্যতাই ভরে যাচ্ছিলো ভেতরটা। এমন অনুভব হওয়ার কারণটা সে কিছুতে বুঝতে পারছিল না।। সে ভাবছিল,” আজতো আমার আনন্দের দিন তাহলে এমন কেন হচ্ছে আমার।” এমনটা ভাবতে ভাবতে সে ওই স্থানে একটু দূরথেকে অনেক মানুষের ভিড় দেখলো। ভিড়টা দেখামাত্রই তার ভেতরকার ভয় তাকে আরো চেপে বসলো। সে হুশহারার মত হয়েই দৌড়িয়ে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। আর যা দেখলো সেইটা দেখে সে নিজের চোঁখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।

সে সাথে সাথেই সম্পুর্ণ নিষ্প্রাণ হয়েই জ্ঞান হারিয়েছিল সেখানে।

হ্যাঁ! আপনারা যা ভাবছেন ঠিক তাই, রাজ সেদিন ওইখানে অরিনেরই থেঁৎলানো লাশ দেখতে পেয়েছিলো। তার সকল ভালবাসা, সকল সপ্নের, মৃত্যু সে, “সেদিন নিজের চোখের সামনেই দেখেছিলো।

READ MORE:  মানবতা পর্ব-১ ছোটগল্প

পরদিন যেই ঘটনাটা খবরের কাগজের হেডলাইনে এসেছিলো,”একটি রহস্যজনক লাশ,খুনির কোন হদিশ নেই”
ওইদিন খবরেরকাগজে শুধুমাত্র একটি লাশের কথাই উল্লেখ ছিলো, কিন্তু সেই লাশের পাশে যে’ আরো একটি জীবন্ত লাশ পড়ে ছিলো সেই কথা খবরেরকাগজে উল্লেখ ছিলোনা।।

সেইদিনের পর থেকে, রাজ নামের সেই ছেলেটির স্বপ্নজড়ানো দুইটি চোখ, স্বপ্ন দেখা ভুলে যায়।। দিশেহারা হয়েই ঘুরে বেড়াত চারিদিক, তার জীবনে আর কোন আশা ভরসা, চাওয়া পাওয়া কিছুই ছিলনা। প্যাকেট প্যাকেট সিগারেট, আর বোতল বোতল, মাদকই হয়েছিল তার,বেঁচে থাকার সঙ্গি। এভাবেই ধীরেধীরে তার জীবনটা অন্ধকারের জগতে ধাবিত হতে থাকে।।

ঠিক সেই সময়, তার জীবনে অহনার আগমন ঘটে।। এই সেই অহনা,’যে রাজের দেওয়া প্রেমের প্রস্তাব ইতিপূর্বে প্রত্যাক্ষাণ করেছিলো, এবং রাজের ফ্রেন্ড হিসাবে পাশে থাকতে চেয়েছিলো।। কিন্তু এবার সে’ রাজের ফ্রেন্ড হিসাবে নয়, রাজের জীবন সঙ্গিনী হিসাবে পাশে থাকতে এসেছিল। সে,’ রাজকে ভালবেসে তার জীবনকে আবার নতুন করে রাঙিয়ে দিতে এসেছিল।

সে তার সকল চেষ্টার দ্বারা, রাজকে অন্ধকার থেকে আলোর জগতে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ছিল।

এবং সে একসময় সফল হয়। রাজকে পুরোপুরি আলোর পথে নিয়ে যায়। অহনার অকুল ভালবাসার কাছে, অরিনের স্মৃতি হার মানে। ‘রাজ’,,, অরিনকে সম্পুর্ণভাবে ভুলে অহনাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতে শুরু করে।।
কিছুদিন পরে রাজ ও অহনার সম্পর্ককে পারিবারিক ভাবে মেনে নিয়ে তাদের শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়। তাদের জীবনটা আনন্দে পরিপুর্ণ হয়ে ভরে ওঠেছিল।।

এভাবেই আরো দুইটি বছর কেটে যায়। রাজ এসময় অনেক বেশি খুশি,কারণ’ কিছুদিনের মধ্যেই সে বাবা হতে যাচ্ছে। তার আদরের বউটা আজ পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। রাজের ছোট্ট সংসার খুব শীঘ্রই পরিপূর্ণ হবে।

কিন্তু এত্তোখুশির মাঝেও রাজের আদরের বউটা অর্থাৎ অহনাকে কেন জানি বেশ কিছুদিন ধরে খুবিই বিষণ্ণতায় ভরা দেখচ্ছিল। সারাক্ষণ মনমরা ভাব। রাজের চোঁখে এই বিষয়টা বার বারই ধরা পড়ছে। রাজ ভাবছিল তবেকি,” ‘অহনা’ তাদের বাচ্চার আগমনে খুশি হতে পারছেনা, নাকি অন্যকোনো কারণ আছে এর মধ্যে?”

রাজ এই নিয়ে অহনাকে অনেক বার প্রশ্ন করেছিল, কিন্তু সে বারাবরই কথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই নিয়ে এক পর্যায়ে তাদের মাঝে ঝগড়াও হয়েছে তবুও অহনা,” রাজকে কিছুই বলতে চাইনি। তাই রাজও বিষয়টা নিয়ে আর জোর করেনাই।

এরই মাঝে দেখতে দেখতে আরো চারাটি মাস পার হয়ে গেলো। অহনার প্রসব বেদনা উঠলো, তাকে অনেক বড় হাসপাতালে নিয়ে এডমিট করা হয়েছিলো।

অবশেষে রাজের জীবনের সবথেকে বেশি চিন্তাময় সেই মুহুর্ত এসে গেলো, অহনাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। আর সেই সাথে সাথে রাজের মনে, নানান রকম ভয়, হাহাকার তাড়া দিতে লাগলো।

কিছুক্ষণ পর অপারেশন শেষ হলো। নার্স এসে একটি ফুটফুটে বাচ্চাকে এনে রাজের কোলে দিলো, বাচ্চকে পাওয়া মাত্রই রাজের পৃথিবী ঝলমল করে জলে উঠেছিল, সেই বাচ্চা যোন হুবহু এক ছোট্ট অহনা। রাজের পৃথিবীতে খুশির বাঁধ ভেঙে গেছিলো।

ঠিক তখনি তার আলোকিত পৃথিবী ডাক্তারের একটি কথাই,অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
হ্যাঁ ডাক্তার এসেই,, তার চোখের সামনে ২য় বারের মত, তার ভালবাসার মৃত্যু দেখার সংবাদ দিয়েছিল।

অহনা আর পৃথিবীতে নেই, রাজের বুক আরও একবার খালি করে দিয়ে অহনা চলে গেছে। কিন্তু যাওয়ার আগে রাজের বেঁচে থাকার একটি উৎস সে দিয়ে গেছে। অহনা হুবহু তার মতই একটা মেয়ে পুতুল উপহার দিয়ে গেছে রাজকে, যাকে নিয়ে রাজের বাকিটা জীবন পার হয়ে যাবে। যে সারাজীবন তাকে আলোর পথেই রেখে দেবে,অন্ধকারে আর যেতে দেবেনা।

এভাবে তিনটি বছর পার হয়ে গেলো অহনা নেই। তখনও অহনার সাজানো ঘরটি তেমনটিই আছে। রাজ ঘরের একটা ফার্ণিচার পর্যন্তও সরাই নাই ঘর থেকে। কারণ’ তাদের ঘরটির প্রতিটি জিনিষে, বস্তুতে, অহনার ছোঁয়া লেগে আছে,যা রাজ কখনো মুছতে চায়না।

সেসময় একদিন রাজ অফিসে গেছিল এবং “তার বাড়িতে তার বাবা,মা সহ পুরো পরিবারইই ছিল। আর ‘তাহেরা'(রাজ ও অহনার একমাত্র মেয়ে) তার দাদীর সাথে খেলছিল।

হঠাৎ,, “তাহেরা তাদের আলমারির ভেতর থেকে খেলার ছলে তার মায়ের একটি পুরানো ডাইরি বের করে খেলতে থাকে, এবং সেই সময় রাজ অফিস থেকে এসেই তাহেরাকে কোলেনিয়ে আদর করতে শুরু করে, আর তখনি তাহেরার হাতে অহনার ডায়রিটা দেখতে পায়।

রাজ ডায়রিটা তার মেয়ের কাছ থেকে নিয়ে, ডাইরিটা খুলতেই একটি চিঠির খাম পায়,এবং খামের ভিতরে অহনার লেখা একটি চিঠি পায়।
আর চিঠিটা পড়তেই রাজের চোখ দিয়ে অঝর ধারায় বৃষ্টি ঝরতে থাকে।

READ MORE:  গোরখাদক

 

 

চিঠিটা এমন ছিলো

প্রিয়তম……
জানিনা তুমি কেমন আছো। যদি ভাল নাও থাকো, তাহলে ভালো থাকার চেষ্টায় থেকো। তোমার হাতে যখন এই চিঠিটি পৌছাবে, তখন হয়তো আমি, এই পৃথিবী থেকে আর তোমার থেকে, অনেক দূরে। যাইহোক এবার মূলকথা বলি,” তুমি হয়তো আমার মন খারাপ রাখা দেখে ভাবতে, আমাদের বাচ্চাটার আগমনে আমি খুশিনা। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমাদের বাচ্চাটার আগমনের কথাটা প্রথম জানতে পেরে আমার কাছে মনে হয়েছিলো, “আমিই পৃথিবীর সর্বসুখী নারী।” কিন্তু আমিতো একটা পাপীয়সী স্বার্থলোভী, আমার কপালে কি আর সুখ সহ্য হয়। ডাক্তার যখন আমকে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার তিন মাস পরে চেকাপ করলো, তখন সরাসরি আমাকে জানিয়ে দিল। আমার শরীর অনেক বেশি দূর্বল, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম,এবং শরীরে আরো কিছু রোগ আছে। যার জন্য এই মূহুর্তে আমাদের বাচ্চাটি পৃথিবীতে আনতে গেলে আমার নিশ্চিত মৃত্যু। তাই ডাক্তার বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে বলেছিলো। কিন্তু আমিতো আর নিষ্ঠুর হয়ে থাকতে পারছিনা, “তোমার ভালবাসাকে সারাজীবন পাওয়ার জন্য, আর কয়টা জীবন আমি শেষ করবো বলো?” হ্যাঁ! আমিতো তোমারি ভালবাসায় পাগল হয়ে আমাদের বিয়ের আগেই তোমার অরিনকে মেরে ফেলেছি। তোমাদের ক্লাসমেট রিফাতকে টাকা দিয়ে ওকে মারতে বলেছিলাম আর রিফাতেরও তোমাদের প্রতি রাগ ছিল তাই সেইই আমার সামনে নিজ হাতে ওই উচু ব্রিজ থেকে, নিচের পাথরে ধাক্কাদিয়ে ফেলে দিয়েছিল অরিনকে। তুমি যখন আমাকে স্কুলে প্রপোজ করেছিলে, তখন আমি কিছুনা ভেবেই, না বলে দিয়েছিলাম। আর ভেবেছিলাম তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু তুমি তা করোনি। ঈশিতা নামের মেয়েটার সাথে প্রেম শুরু করে দিয়েছিলে। তখন আমার জ্বলন শুরু হলো, আর বুঝলাম আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালবাসি, তাই তোমাকে পাওয়ার জন্য ঈশিতার বাসায় গিয়ে তোমাদের রিলেশনের কথা বলে দিয়েছিলাম। ঈশিতাকে রাস্তা থেকে এইভাবে সরানোর পরে ভাবলাম, তুমি হয়তো আমার কাছে আসবে। কিন্তু তুমি আসলেনা, তুমি তোমার পুরানো প্রেমিকা অরিনকে পেয়ে গিয়েছিলে। আমি হাজার চেষ্টা করেও, তাকে তোমার কাছ থেকে সরাতে পারছিলাম না। এবং আমি তোমার সব মূহুর্তের খোজ খবর রাখতাম। আমি যেইদিন জানতে পারি, “তুমি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছো” সেইদিন আমি তোমাকে চিরতরে হারাবার ভয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আর সেই রাগের বসে, অরিনকে রিফাতের সাহায্যে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে তোমার জীবনে আমার জায়গা করে নিয়েছিলাম। এভাবে কিছুদিন চলারপর একটা সময় আমার এইসকল পাপের জন্য অনুশোচনা শুরু হতে লাগলো, রাতে ঠিক মতো ঘুমাতে পারতাম না। অবশেষে যখন আমাদের বাচ্চার জীবনে ঝুঁকি আসলো, “আমাদের দুইজনের ভিতর যে কোন একজন বাঁচবে যখন জানলাম।” তখন বুঝলাম আমি কতবড় পাপী, তাইতো আমার পাপের উপযুক্ত শাস্তি আমি পেতে যাচ্ছি। তাই নিজের জীবন দিয়ে তোমাকে, আমার বাচ্চাটাকে উপহার দিলাম। এতে যদি আমার পাপমোচন হয়,তাহলে তাই হোক।

তুমি হয়তো এতকিছু জানার পরে, আমাকে ঘৃণা করবে,কিন্তু একটুকু অনুরোধ তুমি আমাকে প্লিজ ঘৃণা করোনা। যদি পারো তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, ধরে নিও এটাই আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা। ভালোথেকো আর আমাদের মেয়েটাকে খুব ভালবেসো।
:
:
ইতি
তোমার পাগলি।
এই ঘটনাটা রাজের জীবন পুরোপুরিভাবে শেষ করে দেয়। এরপপর থেকে রাজ আর কারো সাথেই একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেনি। মানসিকভাবে অতিরিক্ত আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তার মস্তিষ্কের মেমরি সেল ধীরেধীরে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। অনেক সাইকিয়াট্রিস্টই তাকে চিকিৎসা করেছে। কিন্তু যার নিজেরই সুস্থ হওয়ার ইচ্ছেটা শেষ হয়েছে, তাকে আর কোন ডাক্তার কিভাবে সুস্থ করবে? সুস্থতাতে ইচ্ছেটাই তো প্রধান। রাজও তাই হয়ত আর সুস্থ হবেনা।

আর হ্যাঁ! সেদিন আমাকে ঘটনাটা বলা সেই কিশোরী মেয়েটা এই রাজেরই একমাত্র মেয়ে তাহেরা। তার কাছে তার বাবার এই জীবনকাহিনী শুনে ভেবেছিলাম তাদের আর কিছু সাহায্য করতে পারি বা নাই পারি। ঘটনাটার একটা স্মৃতিসাক্ষী হিসাবে হলেও এই নিয়ে একটা গল্প আমি লিখবো। হয়ত গল্পটা কেউই পড়বেনা। তবে গল্পটা আমার বই এবং ডায়রির পাতায় একটা অপ্রাপ্ত পরিত্যক্ত ভালবাসার কাহিনী হয়ে লিখিত থেকে আজীবন এ ঘটনাটার স্মৃতি বহন করবে।

আমার মত ফালতু লেখক এর চেয়ে বেশি আর কিই বা করতে পারে!!!