হুমায়ূন আহমেদ আস্তিক না নাস্তিক?

“হুমায়ূন আহমেদের বই পড়বো না। উনি তো নাস্তিক”

 

ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রেখেই তথাকথিত অনেক পাঠক এ  মন্তব্য করে বসেন। অথচ একজন উপন্যাসিক তাঁর উপন্যাসে রচিত চরিত্রের মাঝে নিজেকে ধারণই করেন না।শত শত চরিত্রের মাঝে নিজেকে ধারণ করা সম্ভবও নয়। উপন্যাসের কোন চরিত্র যদি নাস্তিকতা প্রকাশ করে থাকে তাহলে ঐ চরিত্র নাস্তিক, লেখক নন।

 বরং ব্যক্তি লেখককে আমরা খুঁজে পাই তার রচিত আত্নকাহিনীতে বা তার কোন সাক্ষাতকারে।

 

এবার দেখা যাক হুমায়ূন আহমেদ নিজে কি ভাবছেন আস্তিকতা ও নাস্তিকতা বিষয়ে তার রচিত আত্নকাহিনীতে বা সাক্ষাৎকারে..

১. আমি যখন পিএইচডির শেষ পর্যায়ে তখন আমার কাছে খ্রিস্টান পাদ্রিরা আসতে শুরু করল। তারা মনে করল, একজন বিধর্মীকে ওদের ধর্মে নিয়ে গেলে ওদের জন্য সুবিধা।আমি দেখলাম, ওরা প্রচুর পড়াশোনা করে, জানে।…আমি আমাদের প্রফেটকে হাইলাইট  করার জন্য এক পাদ্রিকে বললাম যে,শোনো,আমাদের প্রফেট ছিলেন এমনই একজন মানুষ, তিনি যখন কারও সঙ্গে কথা বলতেন, তখন সরাসরি  তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। তিনি যার সঙ্গে কথা বলতেন,তার দিকে ঘার ফিরিয়ে তাকিয়ে বলতেন না,তিনি পুরো বডিকে তার দিকে টার্ন করতেন,যাতে সে মনে করে তাকে ফুল অ্যাটেনশন দেওয়া হচ্ছে।শুনে পাদ্রি বললেন, দেখুন, স্পন্ডিলাইটিস বলে একটা ডিজিজ আছে যে ডিজিজে ঘাড়ের চামড়া শক্ত হয়ে যায়,আপনাদের প্রফেটের ছিল স্পন্ডিলাইটিস ডিজিজ।উনি ঘাড় ফেরাতে পারতেন না বলে পুরো শরীর অন্যের দিকে ফেরাতেন।…তখন গড আমাকে হেল্প করল।তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে একটা লজিক দিয়ে দিলেন এবং লজিকটা আমার তাৎক্ষণিকভাবে আসা।… আমি বললাম, আপনার কথাটা ভুল।আমাদের নামাজ পড়ার একটা সিস্টেম আছে, সিস্টেমে মাথা ফেরাতে হয়।আমাদের প্রফেটের যদি স্পন্ডালাইটিস ডিজিজ থাকত,তাহলে তিনি পুরো শরীর ফেরাতেন,উনি তো তা করেন না।তার এই ডিজিজ ছিল না,তিনি যেটা করতেন তা শ্রদ্ধার জায়গা থেকে করতেন।…তিনি আমার কাছে ক্ষমা পার্থনা করলেন এবং বললেন, তোমার লজিক খুব পরিষ্কার,আসলেই তো তোমরা নামাজের সময় দুই দিকে মাথা ফেরাও। 

-শিলালিপি(দৈনিক কালের কন্ঠ),২৭ জুলাই ২০১২

 

এখানে একটি বাক্য হাইলাইট করাই যায়, ‘তখন গড আমাকে হেল্প করল’।নাস্তিক হুমায়ূন আহমেদ কেন বিশ্বাস করবেন যে গড তাকে হেল্প করল?তাহলে?হুমায়ূন আহমেদ কেমন ধরনের নাস্তিক?  প্রকাশিকা

২. সম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম কঠিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং বলেছেন,ঈশ্বর এবং আত্না বলে কিছু নেই। স্বর্গ-নরক নেই।সবই মানুষের কল্পনা।…

স্টিফেন হকিংয়ের এক উক্তিতে ঈশ্বর ধ্বংস হয়ে গেছে মনে করার কারণ নেই। …

হকিং সাহেবের ধারণা,অমরত্ব বলে কিছু নেই। তিনি সম্ভবত ভুলে গেছেন,DNA অণু অমর।…

এই রহস্যময় DNA কি বলে দিচ্ছে না?—’হে মানব জাতি,তোমরা ঈশ্বরের অনুসন্ধান করো।’

 

রঙপেন্সিল,পৃষ্ঠা ৭৭-৭৯

 

এখানে দেখা যাচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ পবিত্র কোরানের একটি আয়াত ব্যবহার করেছেন —’হে মানব জাতি, তোমরা ঈশ্বরের অনুসন্ধান করো ‘।-এ আয়াত চয়নই কি তার আস্তিকতা স্পষ্ট করে না?ঈশ্বরের অনুসন্ধান করার কথা যে আয়াতে এসেছে একজন নাস্তিক কেন তা ব্যবহার করে একজন নাস্তিক বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের সমালোচনা করবেন?

 

হুমায়ূন আহমেদ

 

 

৩. অপারেশন হবে ভোর ন’টায়। আগের রাতে আমার কাছে  হাসপাতালের একজন কাউন্সিলর এলেন। তিনি বললেন,তুমি কি মুসলিম?

হ্যাঁ।

কাল ভোরে তোমার অপারেশন। তুমি কি চাও তোমার জন্যে তোমার ধর্মমতে প্রার্থনা করা হোক?…

আমি প্রার্থনা করাব না।অর্থের বিনিময়ে প্রার্থনায় আমার বিশ্বাস নেই।

তোমার অপারেশনটি জটিল। তুমি যদি চাও আমি ডিসকাউন্টে প্রার্থনার জন্যে সুপারিশ করতে পারি।একজন মুসলমান আলেম প্রার্থনা করবেন।

ডিসকাউন্টের প্রার্থনাতেও আমার বিশ্বাস নেই।

তুমি কি নাস্তিক?

আমি নাস্তিক না বলেই ডিসকাউন্টের প্রার্থনায় বিশ্বাসী না। 

ফাউন্টেনপেন,পৃষ্ঠা ৪৬

 

শেষ লাইনের দিকে আরেকবার দৃষ্টিপাত করা যাক —”আমি নাস্তিক না বলেই ডিসকাউন্টের প্রার্থনায় বিশ্বাসী না।”- এরপরও হুমায়ূন আহমেদের ইশ্বরের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকে?

 

এর পরও কোন পাঠক যদি উচ্চস্বরে বলে উঠেন-‘না,না। উনার ঐ উপন্যাসের  ঐ চরিত্র তো এমন বলেছে তেমন বলেছে।যা নাস্তিকতাকে সমর্থন করে। 

তাদের উদ্দেশ্যে বলাই যায়, উপরে যে সব উদাহরণ দেয়া হয়েছে তার কোনটাই উপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের কোন উপন্যাসের চরিত্র নয়। ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদ এর আত্মকাহিনী থেকে নেওয়া কতিপয় ঘটনা। 

আর ব্যক্তি লেখককে অবশ্যই তার ব্যক্তিগত ঘটনা বা ব্যক্তিগত উক্তি দ্বারা চেনা যাবে।তার রচিত কোন চরিত্রের মাধ্যমে নয়।