বিদ্রোহী কবিতার Historical, Political প্রেক্ষাপট

 

Bidrohi poem। Kazi Nazrul Islam। Background । Historical । Political। Historical and political background of Bidrohi Poem। British। 1914। 1919। First world war। Communist Party। Bijli।

 

‘বিদ্রোহী’ কবিতা মূলত আত্মজাগরণের কবিতা। মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। এমন একটি সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাসের জয়গান ‘বিদ্রোহী’ কবিতার চরণে চরণে সুস্পষ্টরূপে দেদীপ্যমান। আত্মমুক্তির মাধ্যমে জগৎ ও জীবনকে স্বাধীনতার স্বাদ উপলব্ধি করানো যায়। কবিতাটিতে ১২১ বার ‘আমি’ শব্দ ব্যবহার করে কবি একটি কথারই প্রতিধ্বনি করতে চেয়েছেন যে, মানুষ অসম শক্তির অধিকারী। সাধনা ও সংগ্রামে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বপ্নের স্বাধীন দেশ বিনির্মাণ সম্ভব। সাম্য, সত্য, সততা, অসাম্প্রদায়িকতা ও ন্যায়নির্ভর সমাজ প্রতিষ্ঠায় এ কবিতার অবদান বিশ্ববিশ্রুত।

 

কবিতার রচনাকাল ও প্রাসঙ্গিকতা

‘বিদ্রোহী’ কবিতা ১৯২১ সালে লিখিত হয়েছিল, এ বিষয়ে দ্বিমত না থাকলেও রচনার সময়কাল নিয়ে কিছুটা দ্বিমত রয়েছে। বেশি সংখ্যক সাহিত্য সমালোচক ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার সময়কাল ১৯২১ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বলে মতামত দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তার রচিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও সৃজন’ গ্রন্থে লিখেছেন-

শান্তিনিকেতন থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে নজরুল ও মুজফ্‌ফর আহমেদের ৩/৪ সি, তালতলা লেনের বাড়িতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ঘটনা ঘটে। একটি হলো ভারতের ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ গঠন। অপরটি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা। তালতলা লেনের এ বাড়িতে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে মুজফ্‌ফর আহমদ ও তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন এবং নজরুলের ‘ভাঙ্গার গান’ ও ‘বিদ্রোহী’ রচনা একই বাড়িতে একই সময়ের ঘটনা।

কবিতাটির স্বরূপ বিশ্নেষণ করলে এটি প্রতীয়মান হয় যে, কবিতাটি মূলত সাম্যবাদের ওপর রচিত। সুতরাং কমিউনিস্ট পার্টি গঠন ও এই কবিতা রচনার সময়কাল একই হওয়াই যুক্তিসিদ্ধ ও প্রাসঙ্গিক।

READ MORE:  মুহূর্ত

মুহম্মদ নুরুল হুদা তার রচিত ‘নজরুলের শিল্প সিদ্ধি ও বিদ্রোহী’ গ্রন্থে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশ-পরবর্তী ইতিহাসকে নিল্ফেম্নাক্তভাবে তুলে ধরেছেন।

১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি কবিতাটি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। প্রকাশের পরপরই এই কবিতাটির পাঠকপ্রিয়তার কারণে পত্রিকাটি পুনর্মুদ্রণ করতে হয়। দুবারে পত্রিকাটি মোট ২৯০০০ কপি ছাপা হয়, যা তৎকালে একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা কবিতাটি পাঠ করেন, অনেকে কণ্ঠস্থ করেন। ঠিক এই সময়ে প্রায় দুই লক্ষ লোক কবিতাটি পাঠ করেন বলে অনুমিত হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো কবির অন্য কোনো কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর এমন ঘটনা ঘটেছে কিনা, আমাদের জানা নেই।

সে সময় ঘরে ঘরে, হাটে-ঘাটে, মাঠে-তটে, শহরে-বন্দরে, গঞ্জে-গ্রামে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পঠিত হয়। কবিতায় বিমুগ্ধ ভারতজাতি সংগ্রামমুখর হয়ে ওঠে এবং স্বাধীনতার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পর ভারতবাসী আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথ কাঁপানো কবিতা পেয়েছিল। যেটি আবৃত্তি করে অর্ধচেতন জাতিকে সর্বচেতন করা যায়।

 

‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার পটভূমি ও আঙ্গিক বিশ্নেষণ

১৯১৪ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দাবানলে দাউদাউ করে জ্বলছে গোটা পৃথিবী। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন ব্রিটিশ শাসনে ও শোষণে ক্ষতবিক্ষত। কাজী নজরুল ইসলামের বয়স তখন ১৯ বছর সাত মাস। তিনি সেনাবাহিনীর এক তেজোদীপ্ত সৈনিক তখন। কুচকাওয়াজের সঙ্গে শত্রুকে ধ্বংস করার শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণে ব্যস্ত। প্রতিটি মানুষই যে বীরযোদ্ধা, অসম-সাহস ও শৌর্য-বীর্যের অধিকারী এ-বোধ তখনই সৃষ্টি হয়েছিল তার। আত্মসচেতন কবির মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল অদম্য সাহস। চিরস্পৃহা সৃষ্টি হয়েছিল, নিপীড়িত-নির্যাতিত, শোষিত-উপেক্ষিত বঞ্চিত মানুষের ব্যথা-বেদনামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার। যে-কারণে তিনি মানব সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে ওঠেন নিজে নিজেই। অন্তরাত্মার এই অব্যক্ত অভিপ্রায়ই তাকে অসাধারণভাবে আন্দোলিত করেছিল। আর তখনই ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো এমন কালজয়ী কবিতা সৃষ্টি হয়।

নজরুল কিশোর বয়সেই দেখেন বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) ও বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) আন্দোলন। অর্থাৎ একটি সংগ্রামী সময়ে তার জন্ম (১৮৯৯) ও শৈশব-কৈশোর এবং যৌবন অতিক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ‘বিদ্রোহী’ কবিতার রচনাকাল ছিল সারা পৃথিবীর জন্য অস্থির সময়। তা ছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার জন্য তখন ঘরে ঘরে দুর্দমনীয় আন্দোলন চলছে। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য ধর্মমত নির্বিশেষে সর্বস্ব ত্যাগে প্রস্তুত। এমনি একমুহূর্তে পরাধীন দেশের সময়ের প্রয়োজনে কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করলেন তার অমর কবিতাখানি; যে কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি জাতি পেল বিদ্রোহের নতুন ভাষা। যুদ্ধ জয়ের নেশায় উন্মত্ত হলো আবালবৃদ্ধবনিতা। আত্মবিশ্বাসের অভাবে যে জাতির চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস ছিল না, যে জাতি ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বিনা প্রতিরোধে স্বাধীনতা হারিয়েছিল, সেই জাতি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পড়ে অসীম আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। কবি কণ্ঠের দৃপ্ত উচ্চারণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ভারতবাসী গেয়ে উঠল- ‘আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমারে খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ।’

READ MORE:  একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তার সহধর্মিণী

 

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন

 

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব, ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন, তুরস্কে কামাল পাশার আবির্ভাব, বাংলা সাহিত্যের এসব পটভূমি নজরুলকে বিদ্রোহীর মতো কবিতা লেখার জন্য প্রভাবিত করেছে।   

অভ্যর্থনা

বিজলী পত্রিকায় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি, ২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ শুক্রবারে প্রথম কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। কবিতাটি প্রকাশের পর হতেই নজরুল সকলের কাছে পরিচিত হতে থাকেন এবং নানানভাবে সমাদৃত হন। নলিনীকান্ত সরকার সেসময় বিজলী পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশনার দিন বিজলী পত্রিকা পরপর দুই বার ছাপতে হয়েছিল, যার সংখ্যা ছিলো ২৯ হাজার।[৮] মুজাফফর আহমদের কাছ থেকে জানা যায়, সেদিন কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ বিদ্রোহী পড়েছিল।[৯]

 

ব্রিটিশদের প্রতিক্রিয়া

এই কবিতা সেই সময় নিষিদ্ধ করা হবে কিনা, সেটা নিয়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের মধ্যে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল।

 

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলছেন,

 

    আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করলেও যেখানেই এসব পত্রিকা পেতো, সেগুলো জব্দ করতো। আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে একপ্রকার নিষিদ্ধ ছিল