২০০১ সালে ভারত বাংলাদেশ যুদ্ধে আসলে কি হয়েছিল?

বাংলাদেশ এবং ভারতের মাঝে লোমহর্ষক যে যুদ্ধ হয়েছিল তার নাম বরাইবাড়ি যুদ্ধ। ২০০১ সালের ১৮ই এপ্রিল কুড়িগ্রামের বরাইবাড়ি সীমান্ত দিয়ে রাতের আধারে ঢুকে পড়ল ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর একটা দল। কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল সীমান্তে৷ কত পিচ্চি একটা দেশ বাংলাদেশ। এই পিচ্চি দেশ সাহস পায় কিভাবে ভারতের দিক চোখ উঠিয়ে তাকানোর৷ উচিত শিক্ষা দিতে হবে তাদের। কিন্তু বিসিএফ জানত না কি ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য! যে ঘটনাটি আজ আলোচনা করব, সেটি সংঘটিত হয়েছিল আজ থেকে ২০ বছর আগে। এই প্রজন্মের অনেকেই জানেন না সেই যুদ্ধের কথা, যা সংঘটিত হয়েছিল বিডিআর এবং বিসিএফ এর মাঝে। সেদিন বিনা উস্কানিতে বাংলাদেশে আক্রমণ করেছিল ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ। আর এই আক্রমণ তুমুলভাবে প্রতিহত করেছিল বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর এর দামাল ছেলেরা। সেদিন ৩০০ বিএসএফ সৈন্যকে রুখে দিয়েছিল বিডিআর এর জনাকয়েক সেনা। এই যুদ্ধে বিডিআর এর সাথে সঙ্গ দিয়েছিল এলাকাবাসী বীর বাঙালিরাও৷ অফিসার সহ ১৬ জন সৈন্যের লাশ পিছনে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল সেদিন বিএসএফ। সেদিন বরাইবাড়ি সীমান্তে বিডিআর এর এক অপরিসীম বীরত্বের কাহিনি রচিত হয়েছিল। আজ সেই যুদ্ধের গল্পই বলব আপনাদের। 

 

বরাইবাড়ি যুদ্ধের পটভূমি রচিত হয়েছিল মূলত সিলেটের পাদুয়া সীমান্তে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল বিএসএফ। বাংলাদেশ বারবার এমন অভিযোগ করলেও তারা কর্ণপাত করছিল না৷ বারবার পতাকা বৈঠকের আবেদন ফিরিয় দেয় তারা। পাদুয়া সংলগ্ন বাংলাদেশের অনেকটুকু জায়গা বিএসএফ নিজেদের বলে দাবী করে৷ সেখানে বিডিআর এর নিষেধ সত্ত্বেও রাস্তা তৈরি করে। রাস্তা তৈরির মাধ্যমে পাদুয়াকে ভারতের সাথে সংযুক্ত করে বিএসএফ৷ এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাদুয়া সীমানার নো’ম্যানস ল্যান্ডে ( ২টি দেশের মাঝে এমন ভূমি যেখানে কারও নিয়ন্ত্রণ নেই) একটি অস্থায়ী ক্যাম্প গঠন করে বসে বিএসএফ৷ বিডিআর তীব্র প্রতিবাদ জানালেও কোনো লাভ হয় নি। অবশেষে ২০০১ সালের ১৬ই এপ্রিল অস্থায়ী ক্যাম্পে ৪০০ জন বিডিআর জওয়ান পৌঁছে ক্যাম্প ঘেরাও করে৷ মাত্র ৬ টি গুলি করতেই ক্যাম্প থেকে পালায় বিএসএফ এর সদস্যরা৷ বিডিআর পাদুয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়। এরপর বিএসএফ পতাকা বৈঠকের আবেদন করে। এতদিন বিডিআর এর পতাকা বৈঠকের আবেদন ফিরিয়ে দিলেও বিএসএফ এর ডাকে ঠিকই সাড়া দেয় বিডিআর। ডাহুকীতে শুরু হয় বিডিআর বিসিএফ এর মাঝে পতাকা বৈঠক। কিন্তু পতাকা বৈঠক ছিল বিএসএফ এর একটি কূটকৌশল। বিএসএফ এর উদ্দেশ্য ছিল অন্য। পাদুয়ার নিয়ন্ত্রণ হারালেও তারা চেয়েছিল পাদুয়া থেকে ৮০ কি.মি. দূরে বরাইবাড়ি সীমান্তবর্তী এলাকা দখলে নিতে। এই বরাইবাড়ির মাইনকার চড় এলাকার ২২৬ একর জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল বিডিআর এবং বিএসএফ এর মাঝে। জমিটি বাংলাদেশের হলেও বিএসএফ এটি নিজেদের দখলে নিতে চাচ্ছিল অবৈধ ভাবে। তাই পতাকা বৈঠক চলাকালেই এদিকে বরাইবাড়ি সীমান্তে ভারী অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে বসে বিএসএফ। অনেক আটঘাট বেঁধেই আক্রমণ করেছিল তারা। বিএসএফ এর সৈন্যদের সাথে ভারতের স্পেশাল ইউনিটের সৈন্যরাও অনুপ্রবেশ করেছিল সেদিন। উদ্দেশ্য- যেভাবেই হোক, বরাইবাড়ি সীমান্ত দখলে নিতে হবে। বাংলাদেশকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে। আক্রমণের সময় এপারে বরাইবাড়ি সীমান্তে ডিউটিতে ছিল মাত্র ১১ জন বিডিআর সৈনিক। তারা হলেন সুবেদার আব্দুল্লাহ, হাবিলদার নজরুল ইসলাম, লেন্স নায়ক ফজলুল হক, লেন্স নায়ক ওয়াহিদুজ্জামান, সিপাহী মোয়াজ্জেম হোসেন, ইদরীস আলী, আব্দুল হামিদ, লিটন মিয়া, বদরুজ্জামান, নায়ক জালাল উদ্দীন মিয়া, ইসহাক। রাতে সিপাহিরা ৪জন পালা করে পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। ভোর ৪ টার দিকে গ্রামের এক তরুণ খবর আনেন যে কাঁটাতার অতিক্রম করে বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ করছে বিএসএফ সৈন্যরা। খবর পেয়ে হাবিলদার নজরুল ইসলাম ভয় না পেয়ে সবাইকে অস্ত্র গোলা বারুদ নিয়ে প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেন। ভোর ৫ টা না বাজতেই পূর্ব দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক দিয়ে বরাইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্প ঘিরে ফেলে প্রায় ৩০০ জন বিসিএফ সৈন্য। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে হাবিলদার নজরুল ক্যাম্পের বাঙ্কার থেকে মেশিনগান থেকে অ্যাম্বুস করার নির্দেশ দেন সৈন্যদের। বিডিআর সৈন্যরা সংখ্যায় কম আর শত্রুপক্ষে অনেক বেশি সৈন্য, এটি বুঝতে পেরেও ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায় নি। উল্টো বীরের মত বাঙ্কারে অবস্থান নেয়। ক্যাম্পে মোট ৪টি বাঙ্কার ছিল৷ ভোর ৫টা ১০ এর দিকেই চারদিক থেকে ক্যাম্পের দিকে তুমুল গোলাবর্ষণ শুরু করে ভারতীয় বিএসএফ সৈন্যরা। সাথে সাথেই বাঙ্কারে মেশিনগান থেকে উল্টো তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলে বিডিআর। ভারতীয় সৈন্যদের দিকে গোলাবর্ষণ শুরু করে তারা। এমন প্রতিরোধের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না বিএসএফ এর সদস্যরা। তাই তারা থমকে গিয়ে আবারও গুলি বর্ষণ শুরু করে। বিএসএফ এর গুলিতে ল্যান্স নায়ক ওয়াহিদুজ্জামান বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতে দেশের জন্য শহিদ হোন। সহযোদ্ধার মৃত্যুতে বিডিআর সৈন্যদের মধ্যে তীব্র স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। তারা আরও তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তুলল। ‘প্রাণ গেলে যাক, তবুও এই মাতৃভূমির মাটির একটি কণার অধিকারও ছাড়ব না।’ – এমন মনোবল নিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে মাত্র ১০ জন বাংলার দামাল ছেলে ভারতের ৩০০ সৈন্যের সাথে। অকুতোভয়  বিডিআর এর গুলির তীব্রতায় পিছু হটে বিএসএফের সদস্যরা। বিডিআর এর ব্রাশফায়ারে তখন একের পর এক লাশ পড়ছিল দখলদার হামলাকারীদের। গ্রামবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে ইতিমধ্যে পাশের হিজলমারী ক্যাম্প থেকে ৬ জন বিডিআর বরাইবাড়ি ক্যাম্পে এসে প্রতিরোধে অংশ নেয়। এতে বিডিআর এর শক্তি আরও বেড়ে যায়। একের পর এক বিএসএফ সৈন্যদের মৃত্যুতে অবশেষে পিছু হটতে থাকে অনুপ্রবেশকারী সৈন্যরা। পালাতে থাকে অবশেষে বিএসএফ এর সৈন্যরা। কাপুরুষের মতো পিছু হটার সময় গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়িতে মর্টার নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেয়। এসব বাড়ি থেকে আগেই সরে গিয়েছিল মানুষজন। বরাইবাড়ি গ্রামের ৬৯ টি বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল বিএসএফ এর তান্ডবে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ২০০ কোটি টাকার সম্পদ। বিডিআর এর ওয়্যারলেস মেসেজ পেয়ে ইতিমধ্যে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রংপুর থেকে অতিরিক্ত বিডিআর সেনা বরাইবাড়িতে পৌঁছে যায় এবং বিএসএফ এর আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন। কিন্তু মূল কাজটি মূলত করে দিয়েছিল বরাইবাড়ি ক্যাম্পের ১১ জন অকুতোভয় সৈনিক। এতবছর পেরিয়ে গেলেও কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে প্রায় ৫০ কি.মি. দূরে বরাইবাড়ি গ্রামের মানুষ সেদিনের ঘটনা মনে করে শিউরে ওঠে। আবার সেই সঙ্গেও গর্বিতও হয় বাংলাদেশের বীর সৈনিকদের বীরত্বের সাক্ষী হতে পেরে। সেদিনের যুদ্ধে বিএসএফ এর ছিল ভারী অস্ত্র এবং অনেক জনবল,, কিন্তু বিডিআর এর সেই ১১ জন সৈনিকের ছিল অসীম দেশপ্রেম ও সাহসিকতা। যার ফলে দেশের সূর্য সন্তানরা সেদিন প্রতিহত করেছিল দখলদার বিএসএফ বাহিনীকে।