আয়াতুল কুরসি কখন পড়বেন?

আয়াতুল কুরসি পুরো কোরআনের সবচেয়ে বড় আয়াত। এটি কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে বড় সূরা আল বাকারার ২৫৫তম আয়াত। এ আয়াতের রয়েছে অনেক ফজিলত।   আয়াতুল কুরসির ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে অনেক বর্ণনা রয়েছে।

 

উবাই ইবনু কাব (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আবুল মুনযির (উবাইয়ের ডাকনাম)! তুমি কি বলতে পারো, তোমার জানামতে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলই ভালো জানেন। ’ (এরপর) তিনি (আবারো) বললেন, ‘হে আবুল মুনযির! তুমি বলতে পারো কি, তোমার জানামতে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সর্বশ্রষ্ঠ?’ এবার আমি বললাম, ‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়ূম (আয়াতুল কুরসি- ২৫৫ নম্বর আয়াত)। ’ উবাই বলেন, এরপর তিনি আমার বুকে (মৃদু) আঘাত করে বললেন, ‘হে আবুল মুনযির! ইলম তোমাকে উপকৃত করুক। ’ (মুসলিম, আস-সহিহ: ৮১০)।

 

অন্য বর্ণনায় হাদিসটির বাকি অংশে আরো বলা হয়েছে, ‘সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! এর (আয়াতুল কুরসির) জিহ্বা হবে, ঠোঁট হবে এবং এটি আরশের পাদদেশে মালিকের পবিত্রতা বর্ণনা করবে। ’ (আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৫/১৪; আবু দাউদ ত্বয়ালিসি, আল-মুসনাদ: ১/২৪; আলবানি, সিলসিলা সহিহাহ: ৩৪১০; হাদিসটি সহিহ)।

 

 

যে কারণে আয়াতুল কুরসির এই শ্রেষ্ঠত্ব: ইমাম নববি (রাহ.) বলেন, আলেমরা বলেন, ‘আয়াতুল কুরসি শ্রেষ্ঠত্বের বৈশিষ্টে বৈশিষ্টমণ্ডিত হওয়ার কারণ হলো, এর মাঝে ইলাহিয়্যাত, একত্ববাদ, জীবন, জ্ঞান, রাজত্ব, কুদরত ও ইচ্ছা- আল্লাহর এই সাতটি গুণবাচক নাম ও গুণাগুণের নীতিমালার সমাবেশ ঘটেছে। ’ (নববি, শারহু মুসলিম)।

 

তাছাড়া আয়াতুল কুরসির প্রথম বাক্যটিতে আছে আল্লাহর ইসমে আযম।

 

আয়াতুল কুরসি পাঠের বিশেষ সময়গুলো- 

 

প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক (ফরজ) নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, মৃত্যু ব্যতীত কোনো কিছু তার জান্নাতে প্রবেশে বাধা দিতে পারবে না। ’ (নাসাঈ, সুনানুল কুবরা: ৬/৩০; আলবানি, সহিহুত তারগিব: ১৫৯৫; হাদিসটি সহিহ)।

 

প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায়: উবাই ইবনু কা’ব (রা.) এর সাদাকার মাল চুরি করতে এসে এক জিন ধরা পড়ে যায়। তখন উবাই (রা.) তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমাদের থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?’ সে বলে, ‘এই আয়াতটি—আয়াতুল কুরসি। যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এটি পড়বে, সে সকাল পর্যন্ত আমাদের থেকে পরিত্রাণ পাবে। আর যে ব্যক্তি সকালে এটি পড়বে, সে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের থেকে নিরাপদে থাকবে। ’ সকাল হলে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসেন এবং ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ঘটনা শুনে) বলেন, ‘খবিসটি সত্য বলেছে। ’ (ইবনু হিব্বান, আস-সহিহ: ৭৯১; আলবানি, সহিহুত তারগিব: ১৪৭০; হাদিসটি সহিহ)।

 

ঘুমানোর পূর্বে: একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের জাকাতের মাল-সম্পদ দেখাশুনার দায়িত্ব দেন আবু হুরায়রা (রা.)-কে। কিন্তু রাতের বেলা জাকাতের মাল থেকে এক ব্যক্তি চুরি করতে এসে পরপর তিনদিন ধরা খেয়ে যায়। তবে, বিভিন্ন কৌশলে ও মিথ্যা বলে সে বেঁচে যায়। সর্বশেষ দিন আবু হুরায়রা (রা.) তাকে রাসূলের (সা.) কাছে নেয়ার কথা বললে সে বলে, ‘তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এমন কতগুলো শব্দ শিখিয়ে দেবো, যার দ্বারা আল্লাহ তোমার উপকার করবেন। ’ আমি বললাম, ‘সেগুলো কী?’ সে বললো, ‘যখন তুমি (ঘুমানোর জন্য) বিছানায় যাবে, তখন আয়াতুল কুরসি পাঠ করে ঘুমাবে। তাহলে তোমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত হবেন। সকাল পর্যন্ত তোমার কাছে শয়তান আসতে পারবে না। ’ তখন আবু হুরায়রা (রা.) তাকে ছেড়ে দেন এবং এই ঘটনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে জানান। তিনি এটি শুনে বললেন, ‘শোনো! সে নিজে ভীষণ মিথ্যাবাদী; কিন্তু তোমাকে সত্য কথা বলেছে। হে আবু হুরাইরা! তুমি কি জানো, তিন রাত ধরে তুমি কার সঙ্গে কথা বলেছিলে?’ আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, ‘জি না। ’ তিনি বললেন, ‘সে ছিলো শয়তান!’ (বুখারি, আস-সহিহ: ২৩১১)।

 

আয়াতুল কুরসির আরবি ও বাংলা উচ্চারণসহ অর্থ:

 

اللّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ    وَمَا فِي الأَرْضِ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيم ‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্কাইয়্যুম। লা তা’খুজুহু সিনাত্যু ওয়ালা নাউম। লাহু মা ফিসসামা ওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্। মান যাল্লাযী ইয়াস ফায়ু ইনদাহু ইল্লা বি ইজনিহি, ইয়া লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউ হিতুনা বিশাই ইম্ মিন ইল্ মিহি ইল্লা বিমা শা’আ, ওয়াসিয়া কুরসি ইউহুস সামা ওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়া উদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুয়াল আলিয়্যূল আজিম।

 

অর্থ: আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তার। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তার অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তার জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তার কুরসি (সিংহাসন) সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তার পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।