ফাইভ জি প্রযুক্তি কি? কিভাবে কাজ করে? আমাদের জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ?

আমরা বহু সময় ধরে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন ব্যবহার করে ডাটা ট্রান্সমিশন করে আসছি। প্রাচীন কালে যখন কোনো প্রযুক্তি ছিল না, তখনও বড় বড় কেল্লার ওপর থেকে মশাল জ্বালানোর মাধ্যমে এক দূর্গ থেকে অন্য দূর্গে সংকেত পাঠানো হতো৷ প্রকৃতপক্ষে এই মশালও ছিল ইলেকট্রো- ম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের ব্যবহার৷ কারণ আমরা যে আলো দেখি সেটিও ইলেকট্রো- ম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের মধ্যেই পড়ে। বর্তমানেও আমরা আলোর মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদান করি। আর এটি সম্ভব হয় ফাইবার অপটিক্স কেবলের ভেতর আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের সাহায্যে। বিপুল পরিমাণ  তথ্য লাইট স্পিডে আদান প্রদান করা যায় ফাইবার অপটিক্স ক্যাবলের মাধ্যমে। এটিই বর্তমানে ইন্টারনেটের মেরুদণ্ড। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা আমাদের প্রত্যেকটি ডিভাইস কে এই অপটিক্স ক্যাবল এর তারের সাথে সংযোগ দিতে পারি না। কারণ বেশির ভাগ ডিভাইস আমরা আমাদের সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। যেমন- মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ। তাই তারবিহীন নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি এর আবির্ভাব হয়। এই ওয়্যারলেস ডাটা পরিবহনের জন্য আমাদের  দরকার হয় সেলুলার নেটওয়ার্ক এর। জাপানে ১৯৭৯ সালে সর্বপ্রথম ওয়ান জেনারেশনের সেলুলার নেটওয়ার্ক তৈরি হয় যাকে আমরা ওয়ান জি হিসেবে জানি। এই ওয়ান জি তে এ.এম.পি.এস প্রযুক্তি ব্যবহার করত অর্থাৎ অ্যাডভান্সড মোবাইল ফোন সিস্টেম। এই ওয়ান জি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শুধু ভয়েস কল করা যেত। ওয়ান জি সিগন্যালকে এনালগ হিসেবে পাঠাতো ৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড স্পিডে। ওয়ান জি এর সবথেকে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এর ফ্রিকোয়েন্সী ব্যান্ডের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন ব্যান্ড নির্ধারণ করা থাকত। অর্থাৎ একটি টাওয়ারে নির্দিষ্ট সংখ্যক ফ্রিকোয়েন্সী দেয়া থাকত এবং একটি ফ্রিকোয়েন্সী কেবল একজন ব্যক্তি ব্যবহার করতে পারত। ফ্রিকোয়েন্সী এর এই নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাকে বলা হয় ব্যান্ডউইডথ্। তাই পরবর্তীতে যখন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর সেলুলার নেটওয়ার্ক কোম্পানিগুলোও ইচ্ছেমত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করতে পারবে না কারণ এসব ফ্রিকোয়েন্সি সরকারের কাছ থেকে কিনতে হয়, নতুবা একই ফ্রিকোয়েন্সি মিলিটারি, এয়ারক্রাফট ইত্যাদি সংস্থা ব্যবহার করত। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সেলুলার নেটওয়ার্ক কোম্পানিগুলো একই এলাকায় একটি বড় টাওয়ারের পাশাপাশি আরও অনেক ছোট ছোট টাওয়ার স্থাপন করা শুরু করে যেন একাধিক ব্যক্তি একইসাথে একই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করতে পারে। এতে করে ডাটা ট্রান্সমিশন স্পিড বৃদ্ধি না পেলেও অধিক সংখ্যক ইউজারের চাহিদা অল্প সংখ্যক ফ্রিকোয়েন্সী দিয়েই পূরণ করা যেত। তবে স্পিড কমে যেত। এই সমস্যা সমাধান হয় টু জি এবং জিপিআরএস টেকনোলজি এর মাধ্যমে। যখন মোবাইল ফোন সবার হাতে হাতে আসা শুরু করে, তখনই আবির্ভাব হয় টু জি টেকনোলজির। টু জি ছিল সম্পূর্ণ ডিজিটাল সিগন্যাল। এসময় কমিউনিকেশন এর জন্য নতুন একটি সার্ভিস চলে আসে যার নাম এসএমএস ( সর্ট ম্যাসেজ সার্ভিস)। টু জি এর স্পিড শুরুতে ছিল ৯.৬ কেবিপিএস। পরবর্তীতে টু জি এর স্পিড ২০০ কেবিপিএস পর্যন্ত উন্নীত করা হয় জিপিআরএস( জেনারেল প্যাকেট রেডিও সার্ভিস) টেকনোলজির মাধ্যমে। এটাকে টু পয়েন্ট ফাইভ জিও বলা হয়। জিপিআরএস টেকনোলজিকে সবথেকে ভালোভাবে ব্যবহার করে থ্রি জি প্রযুক্তি। জিপিআরএস টেকনোলজির মাধ্যমে একটা বড় ডেটাকে ছোটো ছোটো ডেটাতে ভাগ করে নেওয়া হত। প্রত্যেকটা ডেটা প্যাকেটের মধ্যে একটা হেডার  থাকত যার মধ্যে এনকোড করা থাকত এর ডেস্টিনেশন এড্রেসটা। আর এটাও বলা থাকত যে কিভাবে এই ছোট্ট ডেটাগুলোকে সাজিয়ে পুনরায় বড় ডেটাতে পরিণত করা যাবে। বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ছোটো ছোটো ডেটাগুলোকে ডেসটিনেশন এড্রেসে পাঠিয়ে দেয়া হত। ডেটাকে ছোটো ছোট প্যাকেজে কেন পাঠানো হত? একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন। ধরুন একটি বড় ট্রাকে অনেক বেশি মালামাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে করে ট্রাকের স্পিড নিশ্চয়ই কমবে। কিন্তু যদি একটি ট্রাকের বদলে অনেকগুলো বাইকে মালামাল ভাগ করে নিয়ে যাওয়া যায়, তখন বাইকগুলো অনেক সরু অলিগলি দিয়ে খুব সহজেই কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারবে। স্পিড বৃদ্ধি পাবে। থ্রি জি প্রযুক্তি ও জিপিআরএস এর মেলবন্ধনে এভাবেই ডাটা ট্রান্সমিশন হার অনেক গুণ উন্নত হয়। এরপর আসে এইচএসপিএ ( হাই স্পিড প্যাকেজ এক্সেস)। একে থ্রি পয়েন্ট ফাইভ জিও বলা হয়। আপনি আপনার ফোনের নেটওয়ার্ক এর পাশে এইচ প্লাস লেখা দেখতে পারবেন মাঝে মাঝে। এটিই হলো এইচএসপিএ। এটির মাধ্যমে স্পীড ৪২ এমবিপিএস পর্যন্ত বেড়ে যায়। এরপর আবির্ভাব হয় ফোর জি বা এলটিই ( লং টার্ম ইভোলিউশন) প্রযুক্তির যার সাহায্যে আপলোড স্পীড হয় ৫০ এমবিএস এবং ডাউনলোড স্পীড হয় ১০০ এমবিএস পর্যন্ত। ফোর জি তে এমআইএমও ( মাল্টিপল ইন মাল্টিপল আউট) টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়। এই এমআইএমও প্রযুক্তিতে আপনার মডেম বা ফোন দুটো পৃথক এন্টেনাকে ব্যবহার করে হাইস্পিড ইন্টারনেট গ্রহণ করার জন্য। সেলুলার নেটওয়ার্ক এর ফ্রিকোয়েন্সির একটা ইন্টারফেয়ারেন্স আছে যাকে কনস্ট্রাকটিভ এন্ড ডেস্ট্রাকটিভ ইন্টারফেয়ারেন্স বলা হয়। যেখানে ২ টি ওয়েভ যখন এক জায়গায় মিলিত হয় তখন সেটি একে অপরের সাথে মিশে হয় এমপ্লিটিউডকে বাড়িয়ে দেয় নয়ত ক্যান্সেল করে দেয়। এটাকে বন্ধ করার জন্য  ফোর জি একটা নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করে। এর নাম অর্থোগোনাল ফ্রিকুয়েন্সি ডিভিশন মাল্টিপ্লেক্সিং (ওএফডিএম)। এর আগে পর্যন্ত ফ্রিকোয়েন্সীকে পৃথক করে পাঠাতে হতো। কিন্তু ওএফডিএম আসার পর ফ্রিকোয়েন্সিগুলো ওভারলেপও করতে পারে। যার ফলে একইসাথে অনেকগুলো ফ্রিকোয়েন্সিকে সেন্ড এবং রিসিভ করা সম্ভব। যখন সিগন্যালটা রিসিভ হয় তখন সেটাকে পৃথক করে বাইনারীতে রূপান্তরিত করা হয়।

 

 এতকিছুর পরও আমাদের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং আরও অল্প সময়ে অধিকতর ডেটা আদান প্রদানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তাই এবার সব অসুবিধা দূর করতে আসে ফাইভ জি প্রযুক্তি। ফোর জি প্রযুক্তির সবথেকে বড় সমস্যা হলো এখানে যে হাই ফ্রিকুয়েন্সী ওয়েভগুলো পাঠানো হয় সেগুলো বেশিদূর ট্রাভেল করতে পারে না। কোনো বস্তুর তথা দেয়াল, ইত্যাদির বাধা অতিক্রম করতে পারত না। যেকোনো অবজেক্ট দিয়েই ব্লক করে দেয়া সম্ভব। এছাড়া যাত্রাপথে ভ্রমণরত অবস্থায় স্পিড কম পাওয়া যায়। এমনকি বৃষ্টির মাধ্যমেও ডিস্টার্ব হয় এই হাই ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভগুলো। এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য প্রত্যেকটা জায়গায় বিপুল পরিমাণ টাওয়ার বসাতে হবে। এক দুই বাড়ি পরপরই টাওয়ার স্থাপন করতে হবে। কিন্তু এটি যেমন ব্যয়বহুল তেমনি একপ্রকার অসম্ভব। তাই এই সমস্যার সমাধানে ফাইভ জি এর আবির্ভাব হয়। ফাইভ জি মাল্টিপল- ইনপুট মাল্টিপল- আউটপুট এই টেকনোলজি ব্যবহার করে বিম ফরমিং এর মাধ্যমে সরাসরি ইউজারের দিকে ফ্রিকোয়েন্সী পাঠাতে পারে। ধরুন আপমার পাড়াতে একটা টাওয়ার লাগানো আছে। আপনি যখন ফোনে কথা বলেন তখন আপনি যে ফ্রিকোয়েন্সীটা রিসিভ করছেন সেটি টাওয়ারটি পুরো এলাকার উপরেই পাঠায়। সেখান থেকে আপনি রিসিভ করেন। কিন্তু ফাইভ জি এর ক্ষেত্রে আপনি যে জায়গায় আছেন টাওয়ারটি সরাসরি সে জায়গাতেই  ফ্রিকোয়েন্সী পাঠাবে, পুরো এলাকার ওপর ফ্রিকোয়েন্সী পাঠানোর বদলে। আর এটাই হচ্ছে বিম ফরমিং। অর্থাৎ ব্যবহারকারী যে জায়গায় আছে সেখানেই শুধু ফ্রিকোয়েন্সী পাঠাবে। এইকারণে আগে যেমন কাউকে ফোনে কল করলে বিপ বিপ কিছুক্ষণ আওয়াজ হয়ে ফোন কানেক্টেড হতো, এখন আর তা হবে না। সরাসরি ফোনে কল যাবে। এভাবে সময় বাঁচবে৷ তাই ফাইভ জি এর স্পিড হবে প্রায় ১.৮ জিবিপিএস। এই ফাইভ জি এর মাধ্যমে ইন্টারনেটের দুনিয়ায় বিপ্লব সাধন হবে। বর্তমান আধুনিক দুনিয়ায় ধীর ধীরে আমাদের বাসা বাড়ি, গাড়ি সবকিছুই ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে৷ আর এত কিছু নিয়ন্ত্রণ করা ফোর জি এর পক্ষে সম্ভব হতো না। তাই ফাইভ জি প্রযুক্তি এই সবকিছুর সমাধান। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ফাইভ জি প্রযুক্তি কি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? এটি কি ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে? 

 

না ফাইভ জি মোটেও কোনো ক্ষতিকর টেকনোলজি নয়। ফাইভ জি মূলত ২টি ফ্রিকোয়েন্সী রেঞ্জের মধ্যে কাজ করে। একটি হলো ফ্রিকোয়েন্সী রেঞ্জ ১ বা এফআর- ১ যেটি ৪৫০ মেগাহার্টজ থেকে ৬ গিগাহার্জ রেঞ্জের মধ্যে কাজ করে। আর দ্বিতীয়টি হলো এফআর- ২ যেটি ১৪.২৫ গিগাহার্জ থেকে ৫২.৬৭ গিগাহার্জ পর্যন্ত রেঞ্জের মধ্যে কাজ করে। কিন্তু ভিজিবল লাইট যেটি সূর্য থেকে আমাদের পৃথিবীতে আসে তার ফ্রিকোয়েন্সী ৪০০-৭৯০ টেরাহার্জ পর্যন্ত হয়ে থাকে। তাহলে সূর্যের আলোতে আমাদের ক্ষতি না হলে ফাইভ জি তে ক্ষতি কিভাবে হবে। তবে হ্যা সূর্যের আলো যদি একটা জায়গায় কনসেন্ট্রেড করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয় তবে সেখানে আগুন লেগে যাবে। কিন্তু ফাইভ জি এর ক্ষেত্রে তো আর এত পাওয়ার একসাথে করে ব্যবহার করা হবে না যাতে আপনার শরীর পুড়ে যায় বা ক্যান্সার হয়ে যায়। অনেক দেশের মিলিটারিও এই হাই ফ্রিকোয়েন্সিকে কন্সেন্ট্রেড করে ভিড় এর ওপর ব্যবহার করে ভিড় ছিন্ন ভিন্ন করার জন্য। এর জন্য উচ্চ শক্তি প্রয়োগের দরকার হয়। কিন্তু ফাইভ জি এর ক্ষেত্রে এরকম করার কোনো প্রয়োজন নেই এবং সম্ভবও নয়। তাই এক্ষেত্রে মানুষের ক্ষতি হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। তাই বলে ফাইভ জি যে একদম ত্রুটি মুক্ত তাও কিন্তু নয়। সেই ওয়ান জি থেকে শুরু করে ফোর জি পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে সমস্যাগুলোর সমাধান করেছে প্রযুক্তিবিদরা এবং সেলুলার নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি দিন দিন আরও আপগ্রেড হচ্ছে। ফাইভ জি এর ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই হবে।