প্রেম – ছোটগল্প

নৌকাটাকে ঘাটে বেঁধে সজল পাড়ের বটগাছ তলায় এসে বসলো।সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে ওর নদীর সাথে যোগাযোগ। ওর বয়স তখন কত আর হবে! সাত কী আট। তখন থেকেই ওর বাবার সাথে নৌকো করে মাছ ধরতে যাওয়ার শুরু। সারাদিন নদীতে ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যেতে ওরা বাড়ি ফিরতো। এমন করেই দিন কাটছিল ওদের। বছর চার পর যখন ওর বাবাটা অকালে চলে গেলো তখন ওরা অথৈ জলে পড়ে গেলো।

কিডনির অসুখ করেছিল যে বেচারীর। প্রথমটায় তো ওরা কেউ বুঝতেই পারেনি। গ্রামের ডাক্তারকেই দেখায়, কিন্তু রোগ সারে না একটুও। পরে বাড়াবাড়ি হলে সজল ওদের গ্রামের কানাই ঘোষকে বলে। কানাই ঘোষ হল ওদের গ্রামের মোড়ল। সজল ভাবে কানাই ঘোষ যদি ওর বাবার কলকাতায় ডাক্তার দেখানোর একটা কিছু ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তা কানাই ঘোষ লোক ভালো। ব্যবস্থাও করে দেয় সজলকে কলকাতায় ডাক্তার দেখানোর। কিন্তু সজলের বাবা রাজি হয় না। তার এক কথা,”মরতে হলে এখানেই মরবো,কলকাতা যাবো না”। সজল,ওর মা কেউই ওর বাবাকে রাজী করাতে পারে না কলকাতায় যাওয়ার জন্য। শেষটায় ওরাও হাল ছেড়ে দেয়। এরপর হঠাৎ একদিন সজলের বাবা চোখ বোজে। সব কিছু যেন এক লহমায় শেষ হয়ে যায়।

 

তারপর থেকে সজল একাই নদীতে যায়। নৌকার দাঁড় টানার সাথে সাথে সংসারের দাঁড়টাও টেনে চলেছে ও। প্রথমটায় নদীতে ঝড়-ঝাপটা উঠলে ও ভয় পেত,ভাবতো এই বুঝি নৌকা নিয়ে ডুবে গেল,আজ আর সে ভয় ও পায় না। এখন ও জানে কখন নদীতে জোয়ার আসবে,আবার কখন ভাঁটার ফিরতি টানে সব জেগে উঠবে। ভোরের সূর্য ওঠা থেকে বিকেলে অস্ত যাওয়া সবই ও নিবিষ্ট মনে দ্যাখে। ওর এই বাইশ বছরের জীবনে তো অনেক কিছুই দেখলো ও। ওর বয়সী ছেলেরা যেখানে কলেজে যাচ্ছে আজ সেখানে ওকে নদীতে মাছ ধরতে যেতে হচ্ছে। তবে এ সব নিয়ে ও দুঃখ পায় না;ও বলে,”যার যা জীবন,তাকে তো তা নিয়েই চলতে হবে”।

 

ওর এই জীবনে সবথেকে প্রিয় মানুষ হল দুজন। একজন হল ওর মা,আরেক জন আনিফা। আনিফা ভারী মিষ্টি মেয়ে। ওরই সমবয়সী প্রায়। হয়তো দু-এক বছরের ছোটোও হতে পারে। সজলদের দুটোপাড়ার পরই আনিফাদের বাড়ি। আনিফার কপালটাও ওরই মতো। ছোটোবেলাতেই মাকে হারিয়েছে। পরে আনিফার বাবা আর একটা বিয়ে করে। আর ওর এই মা ওর দেখ-ভাল করলেও,সেটা ঠিক মন থেকে করে না,এটা ও বুঝতে পারে। তবে আনিফার বাবা ওকে ভালোবাসে।

 

সজলের সেইদিনটার কথা মনে পড়ে যায়। ও সেদিন বিকেলবেলা ফিরছিল,হঠাৎই ও লক্ষ্য করে একটা মেয়ে নদীতে ডুবে যাচ্ছে,মেয়েটা ওঠার চেষ্টা করছে বটে,কিন্তু ভরা বর্ষার নদীর স্রোতের টানের সাথে পেরে উঠছে না। এক মুহূর্ত দেরী না করে সজল লাফ দেয় নদীতে,কোনোক্রমে মেয়েটাকে টেনে তুলে বাঁচায়।

 

এরপর ধীরে ধীরে ওরা একে অপরের বন্ধু হয়ে ওঠে। তারপর কেটে গেছে পাঁচটা বছর। আজ ওরা একটা সম্পর্কে। কিন্তু ওদের সম্পর্কটা ভারী সুন্দর। দুজনারই দুজনের থেকে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। ওদের দেখা হয়তো হয় না তেমন। সেটা কিছুটা সামাজিক কারণেই। পাড়াগাঁয় থাকে ওরা,ওদের দুজনকে রোজ একসাথে দেখলে বিভিন্ন লোক বিভিন্ন কথা বলবে।

 

ওদের দেখা হয় মাসের একটা দিন। ওরা দুজনেই শুধু সেইদিনটার অপেক্ষায় থাকে।ওইদিন সজল নৌকো করে আনিফাকে নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। এইদিনটাই যেন ওদের কাছে মুক্তির দিন। ওরা চলে যায় পাশের গ্রামে। সেখানে ওদের কেউ চেনে না। নদীর পাড়ে বসে ওরা দেখে পানকৌড়ির টুপ করে ভেসে ওঠা,রাজহংস আর রাজহংসীর জলকেলি। সজল ওকে শোনায় ভাটিয়ালি গান,ভারী মিষ্টি সুরে গায় ও। যখন ও গেয়ে ওঠে,”আমায় ভাসাইলিরে,আমায় ডুবাইলিরে/অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে”। তখন ভিতরটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে আনিফার। ওর গলায় “সোনা বন্ধু রে” শুনে যে আনিফা কতবার কেঁদেছে তার ঠিক নেই।

 

সজল তখন ওকে বুকের মাঝে জাপটে জড়িয়ে ধরে বলে,”দূর পাগলি,কাঁদছিস কেন বোকার মতো? আমি কী তোকে ছেড়ে কোনোদিন যাব নাকি তাই ! তোকে ছেড়ে তো আমিও থাকতে পারবো না রে”। আনিফা বলে ওঠে,”তুমি এই গানটা এত কেন গাও বলো তো?অন্য কত গান আছে”। সজল হেসে বলে,”শোনো মেয়ের কথা,ওরে এই গানটা কত সুন্দর বল তো! আর তোকে তো আমি অন্য গানও শোনাই”।

 

হঠাৎ আনিফা বলে,”তুমি তো বলেছো আমায় বিয়ে করবে,কিন্তু আমাদের বিয়েটা কী তোমার আমার পরিবার মেনে নেবে”? কেন মেনে নেবে নারে? আমরা ভিন্ন ধর্মের বলে,কিন্তু আমরা তো দুজন দুজনকে ভালোবাসি। ওরা মানবে দেখিস। আর যদি মেনে না নেয় তালে তোকে নিয়ে অন্য কোথাও ঘর বাঁধবো। তুই যাবি তো আমার সঙ্গে”? বলে সজল।

 

“তোমার সাথে না গেলে কার সাথে যাবো? তুমি আর আমি কী আলাদা কেউ? দুজনাই তো এক সত্তা”।”তোর কথা শুনে খুব শান্তি পেলাম রে আনিফা। এইবার আমি মরে গেলেও আর দুঃখ নেই রে” সজল বলে। “তুমি এমন করে বলতে পারলে!তোমার কী কিছু আটকায় না মুখে” ঠোঁট ফুলিয়ে জবাব দেয় আনিফা। “রাগ করিস না রে।জানিস তো আমি একটু আনাড়ি।অত বুঝে শুনে কথা বলতে পারিনা”। সজল নীচু স্বরে বলে।

 

এই হলো ওদের সম্পর্ক।মান-অভিমানের পালা চলতেই থাকে।ওদের জীবন তো একটা সুতোয় বাঁধা।হয়তো ওদের জীবনে আড়ম্বর বলতে কিছু নেই,যা আছে সেটা শুধু ওদের ভালোবাসা।এভাবেই কাটছিল ওদের জীবন। বটতলায় বসে থাকতে থাকতে সজলের একটু ঝিমুনি এসে গিয়েছিল।হঠাৎই ওর মনে হয় ওকে কেউ সজলদা বলে ডাকছে। চোখ মেলে সজল দ্যাখে,আনিফা ওকে ডাকছে। আনিফাকে কেমন একটা লাগছে যেন আজ।চুলগুলো উসকোখুসকো,চোখে মুখে চিন্তার ছাপ।ওকে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসে সজল।

 

“কী হয়েছে আনিফা?” প্রশ্ন করে সজল।”সজলদা,আব্বা আমার বিয়ে ঠিক করেছে,তুমি একটা কিছু করো”।বলে আনিফা। সজল প্রথমটায় বিশ্বাস করতে পারেনি।হতভম্ব হয়ে বলে,”কী বলছিস তুই?তুই বলিসনি তোর আব্বাকে আমাদের সম্পর্কের কথা”?

 

আনিফা আস্তে আস্তে বলে,”বলেছি সজলদা,কিন্তু বাবা বলেছে তোমার সাথে বিয়ে দেবে না।তোমার সাথে দেখা করতেও দেবে না। আমার এরপর বাড়ি থেকে বেরনোও হয়তো বন্ধ। আর দিনপনেরো পরেই আমার বিয়ে,তুমি কিছু করো। আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারবোনা”।

সজল ধীরভাবে বলে,”আমি দেখছি রে। তুই চিন্তা করিস না। তোকে আর আমাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না রে”। আনিফা সজলের বুকে মুখ গুঁজে দেয়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। হঠাৎই গ্রামের দুজন লোক ওদের দেখতে পায়। খবর দেয় আনিফার বাবাকে। টানতে টানতে আনিফাকে নিয়ে যায় ওর বাবা।সজলকে বলে যায় আর কোনোদিন ওনার মেয়ের পাশে সজলকে দেখলে,সজলকে ওখানেই শেষ করে দেবে।

 

নিরুপায় সজল বাড়ি ফিরে এসে সব বলে মাকে।ওর মা বলে,”কী করবি বাবা?তোদের ধর্ম যে ভিন্ন।ওরা তো তোকে মেনে নেবে না”। সজল বলে,”মা,ভালোবাসার কী কোনো ধর্ম হয়”? ছেলের প্রশ্নের কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না সজলের বিধবা মা। মনে পড়ে যায় তার যৌবনকালের কথা।সেও এককালে ভালোবেসে ছিল এমন একজনকে যার ধর্ম ছিল আলাদা। সে ভালোবাসাও পরিণতি পায়নি। আজ আবার ছেলের ভালোবাসার জন্য কিছু করতে না পেরে নিজেকে অসহায় লাগে তার।

 

দেখতে দেখতে কেটে যায় পনেরো দিন। আজ আনিফার বিয়ে। সজল কিছু করতে পারলো না। এভাবে তার ভালোবাসা শেষ হয়ে যাবে সে ভাবতেও পারেনি। সে যে আনিফাকে কথা দিয়েছিল তার সাথে জীবন বাঁধবে যতই বাধা আসুক। আজ কী আনিফা একবার আসবে তার কাছে সব ছেড়ে? সে এলে তাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবে সজল। এসবই ভাবতে থাকে একমনে।

 

সন্ধ্যে হতেই পাড়ার ছেলে রাকু এসে বলে,”সজলদা,আনিফা দির বিয়ে হয়ে গেল”। এ কথা শুনে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সজল,দৌড়ে চলে যায় নদীর পাড়ে। পিছন পিছন দৌড়ে আসে রাকু। আচমকা ভরা নদীতে ঝাঁপ দেয় সজল। রাকুর চোখের সামনে দেহটা তলিয়ে যায় অতলে।

 

এদিন রাতেই খবরটা পায় আনিফা।ঠিক করে আর নয়। তার সজল যখন এ পৃথিবীতে নেই,তখন তারও থাকা চলে না। ভোরের আলো ফোটার আগেই সবার অলক্ষ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আনিফা। নদীর পাড়ে এসে বলে,”সজলদা,এবার তোমাকে আর আমাকে কেউ আলাদা করতে পারবেনা,আমি তোমার কাছেই আসছি”। নদীর বুকে তার সজলের কাছে নিজেকে সঁপে দেয় সে। ভোরের আলো ফুটতে তখনও কিছুটা বাকী। যে ভালোবাসার জন্মতে ছিল এই নদী,আজ সেই ভালোবাসার মৃত্যুতেও সেই নদীই। দূর থেকে ভেসে আসছে ভাটিয়ালি গান,”সোনা বন্ধু রে,আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি”।

 

লেখক,

সৈকত সাহা

কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়

পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ