হযরত আবু বকর (রা) প্রাথমিক জীবন ও সমস্যাসমূহ (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)

জন্ম ও বংশ পরিচয়: 

হযরত আবু বকর (রা) মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশের বনি তাইম গোত্রে ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ওসমান এবং মাতার নাম উম্মুল খায়ের।

 

তাঁর আরেক নাম আবদুল্লাহ। মিরাজের কথা সর্বপ্রথম বিশ্বাস করেন বলে তাঁকে মহানবি (স) ‘সিদ্দিক’ বিশ্বাসী উপাধি প্রদান করেন।

অধিক দানশীলতার জন্য তিনি ‘আতিক’ উপাধি পান। মহানবি (স)-এর ইন্তেকালের পর ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা নিযুক্ত হন এবং ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে দেহত্যাগ করেন। হযরত মুহম্মদ (স) আবু বকরের কন্যা বিবি আয়েশাকে বিবাহ করেছিলেন।

প্রাথমিক জীবন :

হযরত আবু বকর (রা) বাল্যকাল হতেই তাঁর ভালো ব্যবহার, পরোপকার, মানবতাবোধ ও বিচক্ষণতার জন্য সমসাময়িকদের মধ্যে সম্মানিত ছিলেন।

তিনি লেখাপড়া জানতেন এবং কবিতা লিখতে পারতেন। বংশপঞ্জি সম্পর্কে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি কাপড়ের ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি জ্ঞান, বুদ্ধি, সহনশীলতা, মননশীলতাসহ অসংখ্য গুণের অধিকারী ছিলেন। এম. আহসানুল্লাহ বলেন, “তিনি (আবু বকর) প্রকৃতপক্ষেই ধার্মিক ছিলেন এবং সকল গুণের অধিকারী ছিলেন। “

ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামের খেদমত :

হযরত আবু বকর (রা) পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে ৬১০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে তিনিই প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী। ইসলামের খেদমতে তিনি সমগ্র জীবন দান করেন।

তার প্রচেষ্টায় তার মা, বাবা, হযরত ওসমান, তালহা, যুবাইর, আবদুর রহমান, সাদ প্রমুখ ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত বেলাল (রা) সহ মোট ৭ জন দাস-দাসীকে তিনি ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। তিনি ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহাসংকটের সময় মহানবির (স) সাথে হিজরত করেন।

মদিনায় মসজিদ, গৃহ ও মহানবির বাসগৃহ নির্মাণ, তাবুক অভিযান ছাড়াও বদর, ওহ্রদ, খন্দক যুদ্ধে তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। ঐতিহাসিক সৈয়দ আমীর আলী বলেন, “আবু বকর বিনীত অথচ দৃঢ় ছিলেন এবং নতুন রাষ্ট্রের শাসনকার্যে ও জনগণের উপকারার্থে তিনি সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিলেন।

হযরত ওমর বলেন, “আবু বকরকে ইসলামের খেদমতের ব্যাপারে কেউ অতিক্রম করতে পারেনি।” ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) দিরহাম সম্পদ ছিল এবং ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের সময় তার ৫০০০ (পাঁচ হাজার) দিরহাম সম্পদ হয়, এতেই বোঝা যায় তিনি ইসলামের জন্য কীভাবে অর্থ দান করতেন।

READ MORE:  মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির ইতিহাস পর্ব - ১

ইসলামের এমন খেদমত ও মহানবির (স) সব কাজের এমন সাথী ছিলেন যে, মহানবি (স) বলেন, “যদি আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে বন্ধু বলতাম, তবে আবু বকরতেই (রা) বন্ধু বলতাম।” হযরত মুহাম্মদ (স) আবু বকরের প্রতি এত সন্তুষ্ট ছিলেন যে, তার ইমামতিতে তিনি বহুবার নামাজ আদায় করেন।

খিলাফত লাভ : 

ঐতিহাসিক খোদা বকস্ বলেন, “মহানবির ইন্তেকালে ইসলাম জগতে এক ভয়াবহ ও সংশয়পূর্ণ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। মহানবি (স) কাউকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যাননি। ফলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে।

ঐতিহাসিক পি কে হিট্টি বলেন, “খিলাফত প্রশ্নই ছিল ইসলামের প্রথম সমস্যা। এটি অদ্যাবধি একটি জীবন্ত সমস্যা। ** মহানবির ইন্তেকালের পর খলিফা নির্বাচনের উদ্দেশ্যে মুসলমানগণ ‘ছাকিফা বানি সায়িদা’ নামক স্থানে মিলিত হন।

খলিফা নির্বাচনের প্রশ্নে চারটি রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়, যথা: আনসার, মুহাজির, কুরাইশ ও আলীর সমর্থক।

তারা নিজেদের পক্ষের লোকদের সমর্থনের কথা বলেন। আবু বকর ইসলামের জন্য আনসার ও মুহাজিরদের ত্যাগের কথা বললেন। আনসারগণ উভয় দল থেকে একজন করে খলিফার কথা বললেও পরে অনেক বাগ্‌বিতণ্ডার পরে ওমর (রা) হযরত আবু বকরের (রা) সমর্থনে জোরালো বক্তব্য রাখেন।

বিভিন্ন যোগ্যতার ভিত্তিতে হযরত ওমর (রা) আরবের প্রথা অনুযায়ী হযরত আবু বকরের (রা) হাত চুম্বন করে খলিফা বলে ঘোষণা করেন। সকলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবু বকরকে খলিফা হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের জয় ঘোষিত হয়।

খলিফা আবু বকরের উদ্বোধনী ভাষণ :

খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর হযরত আবু বকর (রা) জনতার উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক উদ্বোধনী ভাষণ দেন। এতে তিনি বলেন, “হে মুসলমানগণ। আপনারা এখন আমাকে শাসনের গুরুভারপ্রাপ্ত অবস্থায় দেখছেন।

কিন্তু আপনাদের অপেক্ষা আমি অধিকগুণ ও যোগ্যতাসম্পন্ন নই। আপনাদের পরামর্শ ও সাহায্য আমার সর্বদা প্রয়োজন। আমি যদি ভালো কাজ করি, তবে আপনারা আমাকে সমর্থন দেবেন। আর যদি ভুল করি উপদেশ দেবেন।

READ MORE:  মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির ইতিহাস পর্ব – ৬

শাসকের নিকট সত্য কথা বলাই প্রকৃত আনুগত্য এবং সত্য স্থাপন করা বিদ্রোহেরই নামান্তর। কাজেই আপনাদের নিকট থেকে সত্যের অনুসরণ ও মিথ্যা বর্জন কামনা করছি।

দুর্বল ও সবল সকলেই আমার নিকট সমান এবং সকলের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ আমার কর্তব্য। আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ পালন করব, ততক্ষণ আপনারা আমাকে মান্য করবেন।

আর যদি ব্যত্যয় ঘটে তবে আপনাদের আনুগত্যপ্রাপ্তির বিন্দুমাত্র অধিকার আমার থাকবে না।” নিঃসন্দেহে খলিফার এ ভাষণ ছিল চমকপ্রদ। এ সম্পর্কে মাওলানা মুহাম্মদ আলীর মন্তব্য, “অত্যুৎকৃষ্ট এ বক্তৃতাটির প্রতিটি শব্দই জ্ঞানসমৃদ্ধ এবং এটি মুসলিম জাহানের কাছে আলোর সংকেতস্বরূপ।”

প্রাথমিক বাধা-বিপত্তিসমূহ :

খলিফা নির্বাচিত হবার পর আবু বকর নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, “আরব সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহের অগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া উঠিয়াছিল।

ধর্মদ্রোহিতা এবং অসন্তোষ দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছিল। বিধর্মী এবং ইহুদিগণ সুযোগ সন্ধানে ছিল এবং মুসলমানগণ রাখালবিহীন মেষপালের ন্যায় ইতস্তত বিচরণ করিতেছিল। তাহারা সংখ্যায় নগণ্য ছিল কিন্তু তাহাদের দুশমন দল ছিল সংখ্যাতীত।”

খিলাফতে অধিষ্ঠিত হবার পর আবু বকরের প্রধান লক্ষ্য ছিল হযরত মুহাম্মদ (স)-এর আরদ্ধ এবং অভিপ্রেত প্রতিটি কার্য সম্পাদন করা। হযরতের জীবনকালে তাঁর দত্তকপুত্র জায়েদ বিন হারিস মুতার যুদ্ধে নিহত হন। হারিসের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তিনি সিরিয়ায় একটি যুদ্ধাভিযান প্রেরণ করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু হযরতের ইন্তেকালের ফলে এ অভিযান স্থগিত করা হয়। হযরত আবু বকর খিলাফতে অধিষ্ঠিত হয়ে পরের দিনই মহানবির ইচ্ছানুযায়ী হারিসের যুৰকপুত্র উসামাকে সেনাপতি নিযুক্ত করে সিরিয়া অভিযানে প্রেরণ করেন। উসামা সিরিয়ার বিদ্রোহী গোত্রগুলোকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন এবং কর প্রদানে রাজি করান।