একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তার সহধর্মিণী

রামনগর গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট কুড়ে ঘরের মধ্যে গভীর রাতেও টিম টিম করে কুপিটি জ্বলছে। ফাতেমা ৫ মাসের পোয়াতি।হঠাৎ করেই গত দুইদিন ধরে তার শরীর ভাল যাচ্ছে না, এখনো সে তার পেটের ব্যাথায় কাতর। এইদিকে ফাতেমার স্বামী সুরুজ মিয়া কেন যেন ছটফট করছে আর বাইরের দিকে দেখছে।

 

হঠাৎ করেই ফাতেমা কে বলে উঠলো – “ফাতেমা আমার যদি কহনো কিছু ওয় তুমি আমার লাইগা আমার সন্তানের অযত্ন হইতে দিও না! “

 

ফাতেমার মনে তখনই প্রশ্নের পাহাড় জমে কিন্তু সে খানিক টা আচ করতে পেরেছিল।তখনও সুরুজের কাছে সময় খুব কম,কিছুক্ষনের ভিতর জয়নাল আসবে তাকে নিতে কারণ তারা যে দেশ কে স্বাধীন করার পণ নিয়েছে।

 

ফাতেমার চোখটা একটু লেগে যাওয়ার পরেই সুরুজ তার প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র গুছিয়ে নেয়।শুধু তার কষ্ট এতোটুকুই এই তিনকুলে ফাতেমার তাকে ছাড়া আর কেও নেই।সে যদি ফিরে আসতে না পারে তাহলে ফাতেমার……..!

এসব ভাবতেই সুরুজের চোখ ভিজে যায়..!

 

হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে এক কন্ঠস্বর ভেসে এলো-“সুরুজ অহনই বাইরে আয় যাওয়ার সময় অইছে।”

 

জয়নালের ডাকে সুরুজ যখনই বের হতে গেল পিছন থেকে ফাতেমা ডাক দিয়ে বলল-“এই যে কিছু শুকনা খাওয়ন লগে লইয়া যান! পথে খাইয়া লইয়েন! “

 

সুরুজ অবাক হয়ে ফাতেমার দিকে তাকিয়ে রইল।সে ভেবেছিল ফাতেমা জানলে তাকে যেতে দিবে না,তখন ফাতেমা সুরুজ কে বলল-“আমার লাইগা চিন্তা কইরেন না।দ্যাশটা এহন পাকিস্তানিগো দহলে,এই দেশ থেইকা সকল জানোয়ারগো তাড়ায়া দেন।মরনের ডর করবেন না, আপনেরা মনে রাখবেন আপনেরা মুক্তিযোদ্ধা! “

 

কথাগুলো বলে ফাতেমার চোখে একটুও পানি এলো না বরং অন্য রকম এক জয়ের আনন্দ দেখা যাচ্ছিল।

 

তারপর বেরিয়ে গেল দুই বন্ধু।সাতরে সাতরে তুলসিখালী নদী পার হয়ে পৌছে গেল নবপুর আম বাগানে।

 

সেইখানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল অবস্থান করছিলো।তারপরেই তারা তাদের অবস্থানে থেকে পাকিস্তানিদের এক ঘাটি ধ্বংস করতে লাগলো।

 

এভাবে চলতে থাকলো দিনের পর দিন,ঔদিকে ফাতেমা নানান ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের,কখনো আশ্রয় দিয়ে বা কখনো খাবার দিয়ে।এদিকে দিন পেরিয়ে তার বাচ্চা ভূপৃষ্ঠ হওয়ার সময় এগিয়ে আসছিল আর অন্যদিকে সুরুজ ও আসেনি তার সাথে দেখা করতে।

 

২৩ শে জুন ১৯৭১ সালে সকাল দশটার দিকে সুরুজের দল পাকিস্তানি ক্যাম্প আক্রমণ করলো।এক পর্যায়ে সুরুজের ডান হাতে গুলি লাগলো তাও সে দমলো না!বাম হাতে একে ৪৭ রাইফেলের ট্রিগার টেনে ধরলো মূহুর্তেই পাকিস্তানি সব সৈন্য মারা পড়লো,২ জন সৈন্য আধমরা হয়ে পালিয়ে গেল।এর মাঝে মাসুদ,আলমগীর,শাহজাহান শহিদ হল।

 

সেইদিন রাতেই সুরুজ লুকিয়ে তার বাড়ি গেল ফাতেমা কে দেখতে।পাকিস্তানি সেনারা সেই খবর পেয়ে রাতের বেলাই ঘেরাও করে সুরুজেরর বাড়ি আর মুহুর্তেই গুলির আঘাতে শহিদ হয় সুরুজ।সে শুধু প্রাণ যেতে যেতে দেখেছিল তার সহধর্মিণীকে পশুর দল টেনে-হিচরে নিয়ে যাচ্ছিল।ফাতেমা তার স্বামীর দেহটার সামনে তার শেষ আর্তনাদটুকুও জানাতে পারেনি।

 

ফাতেমা কে নিয়ে গেল জানোয়ারদের ক্যাম্পে তারপর শুরু হল তার উপর অত্যাচার।দিনের পর দিন নরপিচাশেরা ছিরে খেয়েছে গর্ভবতী ফাতেমাকে।কোনদিন ৩/৪ জন ও মেতে উঠেছিল তার চিৎকারে!

 

একদিন তাকে প্রাণে না মেরে ঝোপের পাশে ফেলে দিয়ে যায় তার আধমরা প্রাণটি।আশ্রয়হীন ফাতেমা প্রথমে আত্মহত্যা করতে চাইলেও পরে বেঁচেছিল তার সন্তান আর পরাধীন মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্যে। একেক সময় একেক ভাবে সে সাহায্য করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের।তারপর একদিন প্রসব যন্ত্রনায় কাতর ফাতেমা জন্ম দেয় এক মৃত সন্তানের!সর্বশান্ত ফাতেমার নিজের বলতে আর দুনিয়াতে কিছু রইল না।

 

এভাবেই ৯ মাস যুদ্ধের পরে একদিন সূর্যদয়ে শুনতে পায় জয়ের ধ্বনি। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পরাধীন থেকে স্বাধীন হয় এই বাংলা। সেদিন সে শক্ত গলায় বলে উঠেছিল জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু।

 

আজ ৭ বছর সাহারাতুন ফাতেমা ইন্তেকাল করেছেন কিন্তু মরার আগে অবদি তিনি একা মানুষ লড়াই করে গেছেন বেঁচে থাকার,আর সাহায্য করে গেছেন সমাজ উন্নয়নে।

 

লেখক,

সিনথিয়া আক্তার মুন্নী