মোবাইল ফোনের ফলে ভয়াবহ তড়িৎ দূষণ

পরিবেশ দূষণ শব্দটির সাথে আমরা সবাই ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। শব্দ দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ, বায়ু দূষণ ইত্যাদি দূষণ নিয়ে আমরা ছোটবেলা থেকেই জেনে আসছি। কিন্তু কখনও কি তড়িৎ দূষণের নাম শুনেছেন? হ্যা, তড়িৎ দূষণ নামেও আমাদের পরিবেশে একটি দূষণ রয়েছে। এই তড়িৎ দূষণ কোনো অংশেই কম ক্ষতিকর নয়। আমাদের জীবজগত ও মানব সমাজের জন্য তড়িৎ দূষণ অত্যন্ত ভয়াবহ। কিভাবে হয় এই তড়িৎ দূষণ? 

 

তারবিহীন যোগাযোগের জন্য আজকের যুগে আমরা অনেক দামী যোগাযোগ শিল্প ব্যবহার করে থাকি। তারবিহীন মোবাইল ফোন যোগাযোগ প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মহাবিপ্লব ঘটিয়েছে। আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, দূরের মানুষকে কাছে নিয়ে এসেছে। আজ চাইলেই আমরা দূরদূরান্তের খবর নিতে পারি। মাত্র এক সেকেন্ডে আমরা পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপর প্রান্তে যোগাযোগ করতে পারি। মোবাইল ফোন যোগাযোগ প্রযুক্তি যেমন আমাদের জন্য আশীর্বাদ তেমনি এটি আমাদের ক্ষতিও করছে অনেক। মোবাইল ফোন কাজ করে নেটওয়ার্কের সাহায্যে। আমরা রাস্তায় চলার সময় যে বিভিন্ন অপারেটর কোম্পানির টাওয়ার দেখতে পাই সেগুলো থেকে বিশাল তড়িৎ – চৌম্বকীয় বিকিরণ নির্গত হয়। এই তড়িৎ – চৌম্বকীয় বিকিরণ তড়িৎ দূষণের জন্য দায়ী। শুধু মোবাইল ফোন নয়, আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সব রকম ডিভাইস থেকে বিশাল আকারে তড়িৎ – চৌম্বক বিকিরণ নির্গত হয়। তবে মোবাইল শিল্পই তড়িৎ চৌম্বক বিকিরণের সবথেকে বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে।  আজ থেকে ২০ বছর আগের তুলনায় এখনকার মানব সমাজ আরও কয়েকগুণ বেশি তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের দূষণে  আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের চারপাশে বর্তমানে মোবাইল টাওয়ার এর আধিক্য। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বাজার সব জায়গায় আজ আমরা বিভিন্ন অপারেটর কোম্পানির বেইজ স্টেশন বা টাওয়ার এন্টেনা দেখতে পাই। এসব এন্টেনা থেকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ নির্গত হয়। এসব উচ্চ শক্তি সম্পন্ন বিকিরণ যে আমাদের কি পরিমাণ ক্ষতি করে তা আমাদের কল্পনার বাইরে। আসুন জানার চেষ্টা করি এই তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ থেকে আমরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। 

 

 তড়িৎ দূষণের ভয়াবহতা বুঝতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে মোবাইল ফোন কিভাবে কাজ করে। মোবাইল ফোন তার নিকটে অবস্থান করা সবচেয়ে কাছের যে এন্টেনা টাওয়ার টি রয়েছে সেখান থেকে উচ্চ শক্তি সম্পন্ন তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ শোষণ করে। এই তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ শোষণ করে ব্যবহার কারীর তথ্য  অর্থাৎ কথা উচ্চ শক্তি সম্পন্ন বিকিরণের মাধ্যমে প্রেরণ করে। যখন এই প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে তখন উচ্চ তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের ফলে মানুষের যে কোষ এবং টিস্যু রয়েছে তা ব্যাপকভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়। আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে কোষের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। কোষের গঠন বিগড়ে যায়। সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের দেহের কোমল টিস্যু গুলো। যেমন – কান ও ব্রেনের টিস্যু। ব্রেনের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্রেইন টিউমার, অটিজম ইত্যাদি মারাত্মক রোগ হতে পারে। গবেষণা হতে জানা যায়, কেউ যদি প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে মোবাইল ফোনে কথা বলে তাহলে তার ব্রেইন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৩৪% পর্যন্ত বেড়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে তড়িৎ দূষণের ফলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। কারণ শিশুদের দেহ অত্যন্ত কোমল। শিশুরা মাত্র ৫  মিনিট ফোনে কথা বললেই তাদের ব্রেইনের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ফলে অনেক শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয়। ফলে সারাজীবন আর সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না।  

 

পূর্বে যখন মোবাইল ফোন ছিল না, অর্থাৎ ১৯৭০ সালের দিকে খুব কম শিশুই অটিজমে আক্রান্ত হতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী  তখনকার সময়ে প্রতি ১১ হাজার শিশুর মধ্যে কেবল মাত্র গড়ে ১ জন শিশু অটিজমে আক্রান্ত হতো। অথচ যখন মোবাইল ফোনের যুগ শুরু হলো তখন এই সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেল। সমীক্ষায় দেখা যায় ২০০৩ সালে প্রতি ১৬৫ জন শিশুর মধ্যে অন্তত এক জন অটিজমে আক্রান্ত। মোবাইল ফোন টাওয়ারের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের কারণে আজকের শিশুদের ব্রেইন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। যার পরিণামে এখন শিশুরা মারাত্মক ভাবে অটিজমে আক্রান্ত হচ্ছে। শুধু অটিজম নয়, তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের ফলে শিশুদের দেহকোষ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শিশুদের জিনগত ক্ষতি হচ্ছে যা অটিজমের চেয়েও মারাত্মক।  সব বয়সের মানুষরাই আজ এই তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বেইজ স্টেশন থেকে ক্রমাগত নির্গত উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এসব তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ, টাওয়ারের চারদিকে যত মানুষ আছে সবাইকেই আক্রান্ত করে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টায় সব বয়সী মানুষ এসব তড়িৎ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় ধরে তড়িৎ বিকিরণের শিকার হওয়ার কারণে মানুষের শরীরের কোষের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ফলে ক্যান্সার, লিউকেমিয়া, টিউমার, অটিজম ইত্যাদি জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ জন।

 

উন্নত বিশ্বে এসব মোবাইল এন্টেনা জনবসতি থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বর্তমানে। কিন্তু আমাদের দেশে এসব মোবাইল এন্টেনা সব জায়গায় বসতির মাঝে দেখতে পাওয়া যায়। যা আমাদের শরীর স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমাদের সাধারণ মানুষ এবং সরকার তড়িৎ দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে এখনও ওয়াকিবহাল নয়। যেখানে সেখানে পরিকল্পনা ছাড়া এসব মোবাইল টাওয়ার স্থাপনা করা হচ্ছে। 

 

মোবাইল ফোন এর এই তড়িৎ দূষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে করণীয় হলো মোবাইল ফোন যথাসম্ভব কম করে ব্যবহার করা। আমরা এখন প্রচুর সময় ধরে  মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। একটানা মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। মোবাইল যখন ব্যবহার করব না, তখন মোবাইল আমাদের শরীর থেকে দূরে রাখব। রাতে ঘুমানোর সময় ফোন আমাদের মাথায় কাছে রাখব না। ফোনে কথা বলার সময় এয়ার পিস ব্যবহার করলে ক্ষতি কম হয়। শিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক টাওয়ার গুলো লোকালয় থেকে দূরে স্থাপন করতে হবে। মোবাইল ফোন বাজারজাত করার আগে সেটির বিকিরণের মাত্রা পরীক্ষা করে নিতে হবে। সর্বোপরি বলা যায়, আমাদেরকে সচেতন হতে হবে তড়িৎ দূষণ সম্পর্কে। মনে রাখতে হবে  সুস্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।