মানিক-রতন – ছোট গল্প

মানিক-রতন মধ্যাহ্নের রােদ অপরাত্নে যাবে বলে সূর্যটা কেবল পশ্চিমাকাশে গা এলিয়ে দিয়েছে। রাজার হাট এখনাে পুরােদস্তুর জমে ওঠেনি। আশেপাশের ১০/১২ গাঁয়ে এমন হাট জমে না।

রাজার হাট থেকে দুই ক্রোশ দূরে উকিলপুর। পায়ে হাঁটা পথ। সেখান থেকেই প্রতি হাটবারে সবজি বিক্রি করতে রাজার হাটে আসে মানিক- রতন।

অজপাড়াগাঁয়ে গাড়ি-ঘােড়ার বালাই নেই। বর্ষাকালে কাদা ঠেলে আর শুষ্ক মরসুমে ধূলােবালির বাড়বাড়ন্ত সয়ে পথে চলাচল করতে হয়।

মানিক-রতন কাঠের পুল পেরিয়ে সবে হাটে এসে উঠেছে। হাটও জমতে শুরু করেছে।

অমনি, গণি মহাজন হাঁক ছাড়ে।

“অই মানিক-রতন? আরে অ-ই মানিক্যা!” মানিক-রতন দু’ভাইয়ের কানে যেন তুলাে পুড়ে দেওয়া। হয়েছে। কোন সাড়া দেয়না ওরা। কথা কানে তুলছেনা দেখে, কাছে এসে শান্ত গলায় দু’ভাইকে তােয়াজ করে গণি মহাজন৷

“আরে নগদ ট্যাহা পাবি।দিয়া দে সব।”

“না। মহাজন চাচা তােমাকে সবজি আমারা দেব না।”

“অ্যা-হ! ঢঙ দ্যাখলে বাছি না।” মুখ ভেঙচিয়ে চলে যায় গণি মহাজন।

গণি মহাজন ধুরন্ধর লােক। হাট থেকে স্বল্পমূল্যে সবজি কিনে মফস্বলে পাঠায়। তাতে তার মুনাফা নেহাত কম হয়না।

 

মহাজনকে সবজি না দিয়ে মানিক-রতন পরেছে আরেক বিপত্তিতে। একে তাে সব খুচরা ক্রেতা, তার উপর কত সময় লাগবে বিক্রি শেষ হতে তার নিশ্চয়তা নেই। তবুও মহাজনের অর্ধ্বেক মূল্যের চেয়ে ভালাে।

বিক্রি শেষে যখন তারা বাড়ির পথ ধরেছে, সন্ধ্যার লালিমা প্রায় নিশ্চিহ্ন। কাঠের পুল পেরিয়ে ওরা কঁচা রাস্তার বাঁকে এসে উঠেছে।

“আচ্ছা মিঞা ভাই সড়ক দিয়ে ঘুরে না গিয়ে মাঠ বরাবর কোনকোনি গেলে কেমন হয়?” প্রস্তাবের স্বরে বলে রতন।

“ঠিক বলেছিস।অতাে ঘুরতে যাব কেন? চল মাঠ দিয়েই যাই।” ওদের কথায় যুক্তি আছে। মাঠ বরাবর গেলে এক ক্রোশ। পথের মামলা এমনি চুকে যাবে।তাছাড়া ওদের সাথে হারিকেন – দেশলাই তাে আছেই!

 

সন্ধ্যা হবার পরই চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। হয়তাে অমাবস্যা বা তার আশপাশের কোন রাত হবে।মাঠজুড়ে কাঁচাপাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ।

সরু আইল ধরে হাঁটছে মানিক-রতন।চারপাশটা কেমন যেন থমথমে। অন্য দিনের মতাে কোন ঝিঝি পােকার কর্কশ শব্দ শােনা যাচ্ছে না আজ। চোখ ঢেকে দেওয়া এই কৃষ্ণ আঁধার সমুদ্রে এই ভাইদ্বয় মাত্র দু’টো প্রাণী।

মানিক সামনে হাঁটছে হাতে হারিকেন নিয়ে। মাথায় সবজির ফঁাকা খাচা নিয়ে তাকে অনুসরণ করছে রতন।

সামনের কাশেম জাইল্যার ভিটার কথা মনে পড়তেই, মানিক বুঝতে পারে। তারা মস্ত ভুল করেছে। এমন ঘাের অমানিশায় এদিকে তাদের যাতায়াত সমীচীন হয়নি।

কাশেম জাইল্যা মহাজনের দেনা শােধ করতে অক্ষম হওয়ায়, গ্রাম্য সালিসে তাকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়, স্ত্রী -কন্যার সামনে। লাঞ্ছনা সইতে না পেয়ে, সে মরলাে গলায় ফাঁস দিয়ে আর স্ত্রীকন্যা মরলাে বিষ খেয়ে। বিশাল মাঠে কাশেম জাইল্যার বিরান ভিটা আজ যেন এক মহাশ্মশান।

মানিক-রতন জাইল্যার ভিটার সন্নিকটে। হঠাৎ হারিকেনটা নিভে গেলাে। চারপাশে কোন রা নেই। বাতাস যেন থমকে গেছে। এমন ঘাের তিমির রাত্তিরে নিজের হাতটুকুও দেখা যাচ্ছে না।

“রতন দেশলাইটা দে তাে।” উদ্বেগ লুকিয়ে সহজ হবার মতাে করে বলে মানিক।

“মিঞা ভাই কাজ সেরেছে! চুরুট ধরাবার কথা বলে চা স্টলের ছেলেটা যে দেশলাই নিয়ে গেলাে, আর তাে ফেরত দেয়নি। আমিও বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম।”

আঁতকে ওঠে মানিক। উপায় না পেয়ে স্মৃতি আর অনুমানে নির্ভর করে সামনে এগােয় মানিক রতন।

জাইল্যার বাড়ির সামনেই প্রকান্ড তেঁতুল গাছ। এটারই কোন এক ডালে ফঁাস নিয়েছিলাে কাশেম জাইল্যা।

তেঁতুল গাছের নিচে আসতেই ওদের পা যেন আটকে যায়। শরীরের সব লােম দাড়িয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সাদা কাপড়ে জড়ানাে একটা অবয়ব সামনের ডালে ঝুলছে। মানিক-রতন বাকরুদ্ধ। চিৎকার দেয়ার মতন শক্তি তারা হারিয়ে ফেলেছে। কোন আওয়াজও বেরুচ্ছে না গলা দিয়ে।

সাদা কাপড়ের অবয়বটা একবার ডানে অন্যবার বাঁয়ে দোল খাচ্ছে সমানতালে। এমন বিদঘুটে অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যায়। রতন সবজির খাচা ফেলে মানিককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

 

সাদা অবয়বটার হাত-পা কিছু দেখা যাচ্ছে না। মাথার অংশ বােঝা গেলেও পেছনে ফেরানাে। আস্তে আস্তে দোলের গতি যেন বেড়ে চলেছে। পাশাপাশি দৈত্যাকার তেঁতুল শাখা ভেঙে পরার মটমট আওয়াজও শােনা যাচ্ছে। মানিক-রতন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ওঠে।

কিছুটা সামনে এসে মানিক বুঝতে পারে যে, অন্ধকারে পথ ভুল করে তারা জাইল্যার ভিটায় এসে পড়েছে।

আলাের মতন কিছু একটা দেখতে পেয়ে সামনে যায় মানিক। হঠাৎ তা অদৃশ্য হয়ে মরাকান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। জাইল্যার পরিত্যক্ত কুঠুরি থেকে। ওরা দেখতে পায়, জীর্ণ কুঠুরির সংকীর্ণ দাওয়ায় এক অদ্ভুত মধ্যবয়সী নারী বসে আছে। সাদা কাপড়ে উষ্কখুষ্ক চুল। মহিলার কদর্য চেহারার মুখ থেকে থুতনিসহ থেতলানাে নিচের অংশ টকটকে লাল রক্তমাখা।

মানিক-রতনের পিলে চমকে উঠছে, দৃশ্যায়নের ভয়াবহতায়।

কুঠুরির দাওয়ায় তেঁতুল গাছ থেকে একটা ক্ষীণ আলাে পড়লাে হঠাৎ

মানিক-রতনের মাথায় বিদ্যুৎ চমকে গেলাে।শরীর যেন অসার হয়ে পড়লাে। নড়তে চায়না। ঘেমে চুপচুপে হয়ে গিয়েছে পুরাে শরীর। ফতুয়া-শার্ট ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে।

আবছা ঐ আলােয় মানিক রতন দেখলাে এক ভয়ানক চিত্র। অদ্ভুত নারীটির সামনে এক কিশােরীর লাশ। পােকা খাওয়া ও স্থানে স্থানে পচে যাওয়া লাশ থেকে বিচ্ছিরি রকমের গন্ধ বেরুচ্ছে৷

এতক্ষণে মানিক-রতন অদ্ভুত নারীর মুখে লেগে থাকা রক্তের হেতু ঠিক বুঝতে পারছে।

 

সামনের স্বল্প বসনা কিশােরীর লাশ থেকে ঐ অদ্ভুত নারী নিয়মিত বিরতিতে রক্ত পান করছে। আর মরাকান্না কেঁদে যাচ্ছে। ক্ষীণ আলােয় পরিষ্কার ধরা পরছে।

রতন বুঝি অসার দেহ নিয়ে ঢলে পড়বে প্রায়। সে আর সহ্য করতে পারছে না।

কাশেম জাইল্যা ও তার স্ত্রী-কন্যার সৎকার ভালােভাবেই করা হয়েছিলাে। তবে এরা কারা???

মানিক কোন রকমে রতনের হাত চেপে ধরলাে। অন্ধকারের মধ্যেই পশ্চিমের ধানক্ষেত ভেঙে ভেঁ দৌড়। সােজা উকিলপুর সড়ক। এ যাত্রায় বেঁচে গেলাে দুই ভাই। মানিক আর রতন।

লেখক,
তানভীর আহমেদ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়