বদ জ্বীনের গল্প -পর্ব -১

#কে এলো?
বাজার থেকে ফিরতে রাত একটু বেশিই হয়ে যায় বাবুল মিয়ার। দরজার সামনে এসে দরদ মাখা কন্ঠে নিজের স্ত্রীকে ডাক দেয়ঃ কইগো মাহিনের মা, বাজারটা রাখ।
দরজা খুলে পারভীন বেগম তড়িঘড়ি করে এসে ব্যাগ হাতে নেয়। তারপর বলেঃ আসতে এত রাইত হইল যে? পোলাটারে ও লগে নিছেন। আমারতো চিন্তায় ধরছিল। যান হাত মুখ ধুইয়া আসেন। আমি খানা আনতাছি।
বাবুল মিয়াঃ ফাহিম কই? 
পারভীনঃ ও খাইয়া ঘুমায়া পড়ছে। 
বাবুল মিয়াঃ আচ্ছা আমরা তাইলে হাত মুখ ধুইয়া আসতাছি।
গ্রামের এক নির্জন প্রান্তে বাবুল মিয়ার বাড়ি। টিনশেড বাড়ির উঠানে হরেক রকম ফল-ফলাদির গাছ।বাড়ির সামনে রাস্তা।আর রাস্তার পাশেই কবরস্থান।প্রতিবেশিদের ঘর খানিকটা দূরে।তাই এদিকটায় লোকজনের আনাগোনা একটু কম। দুই ছেলে মাহিন, ফাহিম আর স্ত্রী পারভিন কে নিয়ে সুখের সংসার বাবুল মিয়ার। তবে এই সুখ টাকার নয়। এ সুখ ভালোবাসার। শান্তশিষ্ট মিষ্টভাষী বাবুল মিয়ার সুন্দরী স্ত্রী পারভিন। দুই যুগ ধরে তারা যুগলবন্দী।সংসারে  অর্থকষ্ট থাকলেও ভালবাসার কাছে তা নিতান্তই তুচ্ছ।
অভাব থাকলে ভালবাসা নাকি দৌড়ে পালায় কিন্তু পারভিন আর বাবুলের ক্ষেত্রে তা বোধহয় মিথ্যা।বাড়ির পাশেই কিছু জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে বাবুল।সে জমির আয় দিয়ে সংসার চলে কোনোমতে।তবে এ নিয়ে পারভিন বেগম কারো কাছে হা হুতাশ করেছে বলে কেউ শোনেনি। উল্টো সংসারের অভাবের কথা আসলে বাবুলের পক্ষই নেয় পারভিন।
লোকটা সারাদিন আমাদের জন্যই রোদে পুড়ে কাজ করে। নিজে ছেঁড়াটা পরে আমাদের নতুন কিনে দেয়। সংসারে অভাব থাকলেও না খেয়ে তো আর থাকিনা! আরো কত কি! 
যাইহোক হাত-মুখ ধুয়ে বাবুল মিয়া, পারভীন ও বড় ছেলে মাহিন খাবার খেতে বসে। পারভীন ভাত তরকারি দেয় দুজনের পাতে। তারপর নিজে নিয়ে খাবার খাওয়া শুরু করে। বাবুল আর পারভিনের অর্ধেক ভাত খাওয়া না হতেই মাহিন বলেঃ মা আমারে ভাত দেও। পারভিন মাহিনকে ভাত দেয়। নিমিষেই এই প্লেট ভাত শেষ করে মাহিন আবারো ভাত চায়। অনেকদিন খাবার না খেলে মানুষের যেমন খিদে পায় মাহিনের বোধহয় ঠিক তেমনই খিদে পেয়েছে। পারভীন মাহিনকে আবারো ভাত দেয়।
মাহিন এ প্লেট ভাতও মুহূর্তেই শেষ করে উঠে গিয়ে ভাইয়ের পাশে শুয়ে পড়ে। 
বাবুল মিয়া শুধু মাহিনের খাওয়ার দৃশ্য  দেখছিল। হঠাৎ করে ১৭-১৮ বছরের ছেলেটা এতগুলো ভাত খেলো! যা আশ্চর্যই লাগল তার কাছে। মাহিন ছেলেবেলা থেকে ভাত খাওয়াতে উদাসীন। আজ দুপুরেও সামান্য ভাত খেয়ে উঠে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে তার এমন ভাত খাওয়া কেমন জানি অস্বাভাবিক মনে হয় বাবুলের কাছে। পারভীন বেগম ও আশ্চর্য হয়। কিন্তু বাবুলকে বলেঃ পোলাটার আজকে খিদা পাইছে বেশি। হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে বাবুল। তারপর খাবার শেষ করে  শুয়ে পড়ে।
পারভীন বেগম ঘুমানোর আগে দুই ছেলের রুমের লাইট বন্ধ করে আসে।  তারপর নিজের রুমে এসে দেখে বাবুল মিয়া গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সারাদিন পরিশ্রম করা লোকটা ঘুমিয়ে পড়েছে তাড়াতাড়ি। পারভীন বেগমও আজ বড্ড ক্লান্ত। ঘরের কাজ সব একাই  করতে হয়। কাল সকাল সকাল উঠে আবার নাস্তা বানাতে হবে। নিজের রুমের লাইট বন্ধ করে যেইনা খাটের দিকে আসে অমনি পাশের রুম থেকে মাহিনের চিৎকারঃ মাগো! মাগো! আমারে লইয়া তো লইয়া গেল। ওমা!মাগো!
প্রচন্ড চিৎকারে পারভিন বেগম অন্ধকারেই মাহিনের রুমে  যায়।লাইট জ্বালিয়ে দেখে মাহিন মেঝেতে পড়ে আছে। দেখেই মনে হয় অনেকটা দূরে কেউ তাকে টেনে নিয়ে এসেছে। ফাহিম খাটের ওপর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পারভিন বেগম মাহিনকে জিজ্ঞেস করেঃ কি হইসে তোর ? এইখানে কেমনি আসলি?
মাহিনঃ আমারে কে জানি ঠেং ধইরা টাইনা এইখানে নিয়া আসছে। লইয়া যাইতে লইছিল আমারে।
পারভিন কিছু বুঝতে না পেরে বাবুল মিয়াকে সজোরে ডাক দেয়। তার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে  বাবুল মিয়ার। দ্রুত এসে দেখে মাহিন মেঝেতে বসে আছে। পারভিন বেগমও তার সাথে বসা।
বাবুল বলেঃ কি হইসে?  তোমরা এইখানে বসা? 
পারভিন বেগম সবকিছু খুলে বলে। বাবুল মিয়া সমস্ত ঘর দেখে এসে বলেঃ দরজা জানালাতো দেখি সব বন্ধ আছে। পোলডার গা টা একটু বন্ধ কইরা দেও। ফাতেহা আর চার কুল পইড়া ফুঁ দেও।
বাবুলের চোখের দিকে তাকিয়ে যা বোঝার বুঝে নেয় পারভিন। তারপর মাহিনের গা বন্ধ করে। বাবুলের দিকে তাকিয়ে বলেঃ আপনারে কতদিন কইছি পোলাডারে বাজারে নিলে সন্ধ্যার আগেই ফিরা আইসেন। শ্মশানের পাশের রাস্তাটা ভালোনা। কালকে সকালে ইমাম সাবরে ডাইকা  বাড়িটা বন্ধ করতে হইব। পারভিন  বাড়ি বন্ধের কথা বলার পরপরই কেউ টিনের চালে তিনটা বাড়ি দেয়। পুরো ঘর কেঁপে ওঠে।
লেখকঃ জোনাইদ হোসেন
পেশাঃ সাংবাদিক
READ MORE:  হে পৃথিবী