ফাগুন চণ্ডাল – ছোটগল্প

ধু-ধু মাঠ আর মাঠ মাঝখানে এঁকেবেঁকে চলে গেছে রাস্তাটি দুধারে সারি সারি গাছ,সন্ধ্যার পর বয়স্ক লোকটি গ্রামের মোড়ে বসে কিছুক্ষণ তসবি জপে উঠে রাস্তার মাথায় বরকতের বাড়িতে গিয়ে রাতে একটু থাকার আশ্রয় চায়,বরকতের মা বাইরে এসে দেখে একজন হুজুর সামান্য আশ্রয়ের আশায় এই ভর সন্ধ্যায় এসেছে কি আর করা।
বরকতের বউ এসে জিজ্ঞাসা করে,কি হইছে মা?
দেখ বউ একটা মুন্সি আচ্চে থাকপার জাগা চায়।
হামার বাড়িত থাকার জাগা চায়?
হ্যাঁ,
মা একনা এত্তি আইসো
মানুষটার যদি মতলব ফির ভালো না হয় তাইলে?
মোর তো দেখি ভালে নাগেছে বউ।
তোমার ব্যাটা যদি কিছু কয়?
বরকত কিছু কবার নয়, মুই বরকত’ক বুঝি কইলে সব মানবে, যা মা নিয়া যা।
হুজুর ভিতরে গিয়ে ওযু করে এশার নামায পড়ে,নামায শেষে অনেক সময় দু হাত তুলে মোনাজাত করে।
বিস্ময়কর দৃষ্টিতে হুজুরের দিকে তাকিয়ে আছে বরকতের চার বছরের ছেলেটি, এই অদ্ভুত লোকটি সম্পর্কে তার চার বছরের মনে চার হাজার প্রশ্ন জমা হয়ে গেল।
একটু কাছে এসে হুজুর বরকতের ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে দেয়,বরকতের মা রাবেয়া বেগম এসে বলে, হুজুর আইসো,হামরা গরিব মানুষ সন্ধ্যায় যে ডাল ভাত রান্না হইছে একনা মুখত দেও।
এই ভদ্র মানুষটিকে যেন বরকতের মা আর বউয়ের অনেক দিনের চেনা কেউ মনেহল।
রাতে বরকত বাড়ি ফিরলে তার মা সব খুলে বলে,বরকতও আর কোন আপত্তি করলো না।
পরদিন ফজরের আযান শুনে হুজুর ঘুম থেকে উঠে নামায শেষ করে দীর্ঘ সময় দোয়া করে,হঠাৎই হুজুর জিকির করতে থাকে,রাবেয়া বেগম নামায পড়ে উঠে সব লক্ষ করে দূর থেকে,জিকির করতে করতে হুজুর মূর্ছা পড়েন মাটিতে,রাবেয়া বেগম চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ির সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে, হুজুরের চোখে মুখে পানির ছিটা দিলে হুজুর উঠে বসে বরকতের দিকে বড় বড় দৃষ্টি করে বলে,তুই বরকত,কাল রাতে এই বান্দা তোর মা বউয়ের কাছে আশ্রয় নেয়,আর তুই বাড়ি ফিরে তাকে সন্দেহ করিস তাই না?
শোন,
আমি জলের তলের পীর
জলে আমার বাস,
বেশি বুঝলে জলে ডুবিয়ে
তোর করবো সর্বনাশ।
একথা শুনে প্রচণ্ড ভয় পায় রাবেয়া বেগম, সে পায়ে পড়ে বলে বাবা, মোর বেটা ছোট মানুষ না বুঝি আপনাক অপমান করছে ওক তোমরা মাফ করি দেও।
ওঠ,তুই খুব ভালো বুদ্ধিমতী মেয়ে মানুষ,
তোর ছেলেকে মাফ চাইতে হবে আমার এই বান্দার কাছে,এখন আমি চলে যাচ্ছি আমি আবার আসবো।
পর মূহুর্তেই হুজুর আমার মূর্ছা যায়, আবার তার চোখে মুখে পানি দিলে সে সম্বেত ফিরে পায়। এবার আর কোন কথা কয় না,শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সবার দিকে,বরকতের বউ তারাতারি চা করে আনে হুজুরের জন্য।
চা খাওয়া শেষে হুজুর যখন বসে ঠিক তখনই বরকত গুড়মুড় করে তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে। হুজুর তার মাথায় হাত দিয়ে বলে, ওঠো বাবা, তোমরা ছেলে মানুষ ভুল করবা আমরা বড়রা ক্ষমা করে দিব এটাই দুনিয়ার নিয়ম।
এরই মধ্যে আশেপাশের মানুষজন জেনে গেছে এই পীর বাবার কথা,পাশের বাড়ির রমিচের দুদিন থেকে জ্বর কোন ভাবেই কমছে না, হুজুরের কথা শুনে সর্বপ্রথম রমিচের মা একশিশি সরিষার তেল আর তিন বাড়ি থেকে তিন রকমের সুতা নিয়ে আসে হুজুরের কাছে, হুজুর প্রথমে না করলেও প্রবল বিশ্বাসের কাছে হেরে যায় হুজুর, হুজুর নিজের বিশ্বাসের উপর ভরসা করতে না পারলেও তার বিশ্বাসের নির্ভরতা এই গ্রামের মানুষগুলো অনেকগুন বাড়িয়ে দেবে।অবশেষে যাপপাকা তেল পড়া নিয়ে রমিচের মা চলে গেল।
আর পুতে গেল এক উলঙ্গ বিশ্বাসের খুঁটি।দিনে দিনে হুজুরের পরিচিতি দূর দুরান্তরে পৌঁছে গেল,এখন অনেক দূর থেকে মানুষ আসে হুজুরের পানি পড়া নিতে।বরকতের থাকার ঘরের পিছনে হুজুরের জন্য একটি আস্তানা গড়ে দিয়েছে গ্রামের মানুষ।প্রতি সন্ধ্যায় বসে পীরের আস্তানা,কত পীর যে এসে হুজুরের গায়ে ভর করে,তার ইয়োত্তা নেই।
মাগরিবের নামাযের পর হুজুর যখন তার আস্তানায় বসে আছেন এমন সময় হঠাৎ হুজুরের ভরং পরিবর্তন হয়ে গেল,হুজুর কেমন জানি উন্মাদের মত আচরণ শুরু করে দিয়েছে, রাবেয়া বেগম তার ভক্ত মুরিদের সভাপতি, সে এসে বলে বাবা, আপনি কোন পীর হামাক কন?ক্যানে এমন করেন?হামরা অবুঝ ভক্ত তোমার।
আমি বনের তপস্যাকারী পাগলাপীর, আমার এই ভক্ত অনেকদিন তোদের মঙ্গলের জন্য আমাকে ডেকে চলেছে আমি আসি নাই কারণ তোরা আমার সম্মানে কিছুই করিস নি।
বাবা, কয়া দেন হামাক কি করা লাগবে। রাবেয়া বেগমের কাকুতিমিনতিতে পীরের মুখ ফুটে গেল।
শোন বেটি, দোলার রাস্তার মাঝখানে বড় বটগাছের নিচে আমার নামে ধাম করে আমার পূজা করতে হবে। এর অন্যথা হলে তোদের অনেক ক্ষতি হবে।
বাবা ধাম কেমন করি করা নাগে হামরা তো জানি না?
শোন তাহলে, খর দিয়ে সুন্দর করে একচালা একটা ঘর করবি কোন বেড়া দেওয়া যাবে না, তার নিচে ছোট ছোট তিনটা মাটির ঢিঁপি করবি প্রতি শনিবার সেই ঢিঁপি মাটি দিয়ে লেপে দিবি, চালার সামনের দুইটা উঁচুখুঁটি হবে বাঁশের তার মাথায় পাট ঝুলানো থাকবে আর প্রতি সন্ধ্যায় তুই বাতি দিবি,মনে থাকবে।
কেমন করি আপনার পূজা করবো বাবা? সেটাও বলছি শোন, কিছু যুবক ছেলে শাড়ি পড়বে, আর কিছু যুবক বড় বড় বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথার পাট দিয়ে আগুন লাগিয় নেচে গেয়ে আমার ধাম থেকে পূজা যাত্রার আয়োজন করতে হবে, মনে রাখিস এর যেন কোন ব্যত্যয় না হয়।
না বাবা আপনার কথার কোন হেরফের হবার নয় সব পালন করমো হামরা।
পীর চলে গেলে হুজুর আস্তে করে ঢোলে পড়লো বিছানায়।
দৌড়ে আসে তার সহকারী বরকত মুখে পানি দিয়ে হুজুরের জ্ঞান ফিরিয়ে আনলো,এটা আমাদের শত বছরের বিশ্বাসের অগ্নি পরীক্ষা।
দিনে দিনে খবর চাউর হলো চারদিক মুরিদও বাড়তে থাকলো, শুরু হলো মুরিদের জন্য নতুন সিস্টেম,এখন নাম নিবন্ধন করাতে লাগবে দুশত পঞ্চাশ টাকা,কারণ নাম নিবন্ধন হলে অন্ধকারে পীরবাবা এসে দিয়ে যাবে ভাগ্যবানদের নানান উপঢৌকন।প্রতিদিন অনেক ভাগ্যবান মুরিদের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ে পড়ে শাড়ি,কারো লুঙ্গি,আবার অনেক বাচ্চা দিনে দুপুরে কুঁড়িয়ে পান টাকা,জলবাবা যেন দুহাত ভরে দান করছেন ডাঙ্গাবাসিদের।বাবার আয়ের উৎস বর্ণনা করা আমার মত সামান্যের পক্ষে বড্ড কঠিন,আবার বলতে বলতে কাহিল হয়ে যেতে পারি তাই আবশ্যক মনে করছি না।
বরকতের বাড়ির পাশে ছোট একটা বাঁশ আড়া আছে তার নিচে একটা ছোট করে চাঙারি পাতা হয়েছে মাঝেমাঝে ব্যবহার হয় হুজুরের বিশ্রামাগার হিসেবে।সেখানেই বসে হুজুর কিবলা মুখি হয়ে বরকতের সাথে তার জীবনের নানা জটিল কথা আলোচনা করছিলো,সেখানেও একজন দুজন করে পনের বিশ ভক্তের চাপ সহ্য করতে হল,বলা ভালো হুজুরের তেল পড়ার গুনে রমিচের জ্বর সাড়ার পর থেকে হুজুরের সর্বপ্রকার বয়ানের প্রথম সারির ভক্ত রমিচের মা।
শোন বরকত আমি এর আগে এক অঞ্চলে ছিলাম সেখানে অনিলা দেবী নামের এক মেয়ে আমার খুব বড় ভক্ত ছিল একদিন তার বাবার সাথে ঝগড়া করে সে আত্মহত্যা করেছে,তার আত্মা মাঝেমাঝে পৃথিবীতে ফিরে এসে আমার শরীরে জায়গা করে নেয়,তোমরা ভয় পেয় না সেও মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে।
হুজুর আপনি ঐ অঞ্চল থাকি হামার এত্তি কেমন করি আসলেন?রমিচের মার এমন কথা বেজায় অখুশি হুজুর তারপরও উত্তর দিলেন তিনি।
তার পিছনেও অনেক কাহিনী লুকিয়ে আছে রমিচের মা,তোমাদের শোনার সময় কী হবে সে কথা?
আমি আগে মহিষখোচাগ্রামের এক মক্তবে বাচ্চাদের পড়াতাম তাই পাশের বাড়িতে আমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
এই কথা বলার পর হুজুরের চোখজোড়া ছলছল করে উঠে,যেন শুকনা তিস্তা মূহুর্তেই উছলে উঠবে,হুজুরের এই অবস্থা দেখে উপস্থিত কেউ চোখে পানি ধরে রাখতে পারলেন না।
ভাঙ্গা গলায় রমিচের মা আবার জিজ্ঞাসা করে,তারপরে কি হইছিল হুজুর।
তারপর একদিন রাতে খোয়াজবাবা আমাকে স্বপ্ন যোগে জানায় যে ঐ মক্তবের পিছনে একঘরা সোনার মোহর আছে,যা ঐ বাড়ির দুই ছেলে আর তুই সমান ভাবে ভাগ করে নিবি,আর অন্যথা যেন না হয়,
আমি তো বাবার কথা মত সব করলাম,পরের দিন সকালে তাদের সেই কথা খুলে বললে তারা আমাকে কিছু বলেনি,সেদিন রাতে আমরা তিনজনে মিলে সোনার ঘরাটা তুলে এনে ঘরে রাখি আর পরের দিন সকালে এগুলো সমান ভাবে ভাগ করা হবে,আমরা যে যার মত ঘুমাতে যাই।
তারপর কি হইল হুজুর,বলে রমিচের মা।
তারপর যা ঘটলো তা আমার জীবনের দৃষ্টান্ত,পরের দিন ভোরে উঠে বাড়ির ছোট বউ আমাকে জাগিয়ে দিয়ে বলে,হুজুর যদি বাঁচতে চান তাহলে এখনই পালান,আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন?
সে উত্তরে বলে আপনাকে ওরা দুইভাই সোনার মোহরের ভাগ না দেওয়ার জন্য মেরে ফেলবে,আমি এই কথা শোনার পর আর এক মূহুর্ত সেখানে থাকিনি।
আপনারা ভাবতে পারেন আমি ভয়ে পালিয়ে এসেছি,কিন্তু না!
আমি চলে এসেছি বাবার নির্দেশে।আর তাছাড়া আমি ঐ সোনার মোহর নিয়ে কি করবো?
ওগুলো আমি মসজিদে দান করে দিতাম।
সমবেত সকলের চোখেই পানি ছলছল করে গড়িয়ে পড়ছে।
বরকত এবার আর চুপ করে থাকতে পারলো না সে কান্না জড়িত কন্ঠে বললো,বাবা হামরা জানি ঐ টাকা সোনা দানার প্রতি আপনা কোন লোভ নাই।ওখান থাকি আচ্চেন বলিই তো হামরা আপনাক ফিরি পাইছি।
রাবেয়া বেগম কিছু একটা হুজুরের কানেকানে বলে যেতেই হুজুর বললো এখন সবাই যাও সন্ধ্যারপরে দেখা হবে।
আজকের আসর জমেছে ভালো,হঠাৎ একজন লোক এসে বলে বাবা আজ মুই মাটির থাকি চার আঙ্গুল উপর দিয়া উড়ি আসনু,এগুলা সব তোমার কুদরতের খেলা,উপস্থিত সকল মানুষ একবাক্যে তার কথা মেনে নিল,এখানে প্রতিবাদ করার কেউ নেই আছে শুধু বাবার অন্ধভক্ত। দিনের পর দিন মানুষ ঠকিয়ে সে নিজের ভাগ্য বদল করছে।
সুরুজ আলি অনেকদিন থেকে প্যারালাইজডে ভুগছে তাকেও নিয়ে আসা হয়েছে আজ তার নাম নিবন্ধন সহ যাবতীয় কাজ শেষ করে ভিতরে গিয়ে দেখে,হুজুর সুন্দর করে সুর করে বলছে,
শোন শোন ভক্তগণ শোন দিয়ে মন,
নামটি আমার জলপীর করি যে বর্ণন।
তারপর অন্ধকারের মধ্য দাঁত কটমট করছে,সবার বোঝার আর বাকি রইলো  না যে উনি খোয়াজবাবা,পানির নিচে থাকেন,যখন সুরুজ আলিকে তার সামনে এনে হাজির করা হলো তখন বাবা তাকে দেখেই বললো এর অবস্থা বিশেষ ভালো না।তারপরও অনেক আশা নিয়ে এসেছিস তাই তোকে আমি নিরাশ করবো না,খুব দ্রুত বরকতকে নির্দেশ দেওয়া হলো জঙ্গল থেকে পুরান ঢেঁকি পাতা নিয়ে আসতে সাতটা, বরকত বললো তার সহকারীকে তার সহকারী বললো,তার সহকারীকে এভাবে কয়েক হাত বদলের পর বাবার হাতে এসে পৌঁছায় ঢেঁকি পাতা।
গভীর রাতে সবকাজ সেরে ভক্তদের বিদায় করে বাবা কিছুক্ষণ গভীর ধ্যানে বসে তারপর চলে মোনাজাত, তারপর বাবা গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন পরবর্তি নৈশফগুনের জন্য।
আজ সকাল থেকে রাবেয়া খাতুন ব্যস্ত, খোয়াজ বাবার আর পাগলাবাবার পূজার জন্য চলছে পূজার এন্তেজাম দুজনের দু রকম এন্তেজাম,বরকতের বউ ব্যস্ত পাগলাবাবার ছেলেদের মেয়ে সাজাতে,এক ছেলে বললো ভাবি,মুই একেলকায় পাইম শাড়ি পিন্দিবার,
আরে পাবার নইস,মুই একনা সাহায্য করং তাইলে তারাতারি হইবে,বলেই হাত লাগায় বরকতের বউ।
কেউ ঢুলি সাজছে কেউবা আবার লাঠি ঠিক করছে,হঠাৎ রাবেয়া বেগমের ডাক দেয় বরকতের বউকে,বউ এত্তি আয় তো!বউ বাইরে এলে বলে,তুই ভাল করি দেখিস,মুই যাং নদী।
বরকতের চার বছরের ছেলেটি অবাক বিস্ময়ে সব দেখে,তার দাদী তাকে ডাক দিলে,সে ছুটে আসে,দাদী মুইও যাম তোর সাথে।
আয় দাদা আয়,নাতির হাত ধরে নদীর তীরে বসে সে সব বেড় করে ব্যাগ থেকে, এই পীরের পূজার অভিনব পদ্ধতি,কলার পাতা কেটে তার মাঝখানের ডাটা দিয়ে ছোট ছোট ভেলা বানাতে হয়,সেই ভেলার উপর কলাগাছের খোল দিয়ে ছোট্ট থালা তৈরি করে তার মধ্যে ময়দা,কলা,দুধ,আর জবা ফুল দিয়ে একসাথে মেখে ছোট্ট খোলের থালায় ঢেলে তা ছোট ভেলায় করে ভাসিয়ে দিতে হয়।
সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা নিজেই তদারক করেছেন হুজুর।
আটপৌরে বিশ্বাস আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে,মুক্তির উপায় খুঁজতে গেলে হয়তো প্রতিক্ষার শিকর গজাবে তবুও মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর হুজুরের স্ত্রী আজ সকালে বরকতের বাড়ির খোঁজ পেয়েছে হুজুরের সাথে তার দেখাও হয়েছে কিন্তু হুজুর তার স্ত্রী থেকে একটু বরাবর দূরেই থাকে,সবার মুখে হুজুরের প্রশংসা শুনে তার স্ত্রী আর কিছু বলে না,সে সব অবলোকন করে চলছে।সন্ধ্যার পড়ে সে যা দেখলো তাতে তার চোখ ছানাবড়া!হুজুরের স্ত্রী বলে তার সম্মান হুজুরের পরে,একেক বার একেক জন পীর এসে তার শরীরের ভর করছে,রীতিমত বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে হুজুরের স্ত্রী,স্বামীর অভিনব ব্যবসা দেখে।
দাঁত কটমটিয়ে যখন খোয়াজবাবার আগমন চারিদিকে তখন শুনশান নিরবতা কারন জলের তলের পীর সারাদিন জলে ডুবে থাকার পরও তার মেজাজ এতো খারাপ থাকে যে সে ভক্তদের ঘ্যানঘ্যান একদম পছন্দ করে না।
চার পাঁচ বছরের কিছু ছেলে মেয়েকে বরকত বিছানায় শুয়ে রেখেছে,পীর এসে তার পরিচয় দেওয়ার সাথে সাথে বাচ্চাগলোকে চুপ করিয়ে দেওয়া হলো,আর সবার নাকের উপর একটা করে নতুন গামছা ধরা হলো,বরকত চিৎকার করে বলছে,সবাই বাইরে যাও এবার নিঃশ্বাস নেওয়া হবে, হুজুরের গায়ে ভর করা পীর এসে এক এক করে সবার নাকের ডগায় হাত দিচ্ছে আর বাচ্চাদের বলা হচ্ছে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে এক নাকের নিঃশ্বাসকে হাতের মুঠোয় ভরে নতুন গামছার মধ্যে বেঁধে রাখা হল,এসব দেখে হুজুরের বউ তো অবাক কি করছে তার স্বামী।
এলাকায় তাকে সবাই টুপি চোরা মুন্সি বলে গালি দিত আর সে–ই কিনা এখানে এসে এতোগুলো মানুষকে ফাঁকি দিচ্ছে,তারপরও সে চুপ করে থাকল, তারপর কি ঘটে তা দেখার জন্য,এবার হুজুর বাইরে গিয়ে এক এক করে নিঃশ্বাস বাঁধা গামছাগুলো সবার সামনে কিবলা মুখি করে উড়িয়ে দিল,অন্ধকার আকাশ ভেদ করে গামছাগুলো অজানার পথে ছুটে চলেছে।
এবার হুজুর চিৎকার করে বলতে শুরু করল,শোনেন সবাই এই নিঃশ্বাসগুলো সপ্তম আসমান ভেদ করে আড়শে মাকাম থেকে দীনে এলেম শিক্ষা নিয়ে ১৩ বছর পর আবার দুনিয়ায় ফিরে এসে যার যার শরীরে ঢুকে যাবে আমরা এক এক জন দীনদার পরহেজগার খোদার ভক্ত পাব,শুধু তাই নয় প্রত্যেক রমজান মানে তারা বায়তুল ইজ্জা থেকে লওহে মাহফুজের অতিথি হয়ে ঘুরে বেড়াবে,যারা এই সন্তাদের বাবা মা তারা খুব ভাগ্যবান তারা জান্নাতের টিকেট পেয়ে গেলেন,বরকত এই কথা শোনার পর নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছে কারণ তার একমাত্র পুত্রের নিঃশ্বাস পাঠান হয়েছে বলে,আর যাদের ছেলে মেয়ের নিঃশ্বাস পাঠানো হয় নি তারা মন খারাপ করলেও হুজুরের প্রতি ক্ষুদ্ধ হন নি,তারা আশাও ছাড়েন নি,ভাগ্যবানদের যে মোটা অংকের নিবন্ধন ফিও দিতে হয়েছিল।
হুজুর তার আসনে একটু ঠাণ্ডা হয়ে বসতে না বসতে হঠাৎই নিজের কাপর নিজেই খুলতে শুরু করে দিয়েছে দেখে উপস্থিত সকলেই বুঝলো ল্যাংটাবাবার আবির্ভাব, হুজুরের স্ত্রী হতভম্ব কি করছে তার ভোলাভালা মুন্সি স্বামী কিন্তু নিজে খুবই দ্বিধান্বিত কি করবে সে, এতোক্ষণে ল্যাংটাবাবার নজর পড়েছে তার উপর, শান্ত হয়ে ল্যাংটাবাবা বলতে শুরু করলো
তোদের এখানে আজ এক বিশেষ মেহমানকে দেখতে পাচ্ছি,তার জন্য আমার তরফ থেকে বিশেষ উপহার এই জান্নাতি ফুল মরিয়ম, ফুলটি হাতে নিয়েই তার কেমন জানি সন্দেহ হলো, এই ফুলটি তো সে বাড়িতে অনেক খুঁজেছে কিন্তু পায়নি।
ল্যাংটাবাবা আবার তাকে বলে তুই মনেহয় আমার এই উপহারে খুশি হস নি মা! বল মা তোর কি চাই? সুযোগ বুঝে হুজুরের বউ কাছে গিয়ে জোর গলায় কান্না জুড়ে দিয়ে বলে, আমি আমার স্বামীর স্বাভাবিক জীবন ফিরে চাই বাবা!
না রে মা, তোর স্বামী আমাদের পীরদের কাছে খুবই প্রিয়, তার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীতে বারবার ফিরে আসতে চাই এ কথা বলেই বুদ্ধিমান হুজুর আবার মূর্ছা গেল।
হুজুর নাওয়া খাওয়া সেরে যখন ঘুমতে যাবে তখন তার স্ত্রী বলে, তুমি মানুষের সাথে কি শুরু করেছো?
কি শুরু করেছি, মানে কি?
কিছু বোঝ না!
এই গ্রামের ভালো মানুষগুলোর ভালো মানুষির সুযোগ নিয়ে তাদের ঠকাচ্ছো,তাদের তাবত রোজগারে নিজের দাবী করছো,এই প্রপঞ্চের জীবন থেকে চল আমরা মুক্তি নিয়ে ফিরে যাই নিজের গ্রামে।
এই চুপ একবারে জানে মেরে ফেলবো শয়তানি কোথাকার,আমার সুখ আর সম্মানে তোর হিংসা হচ্ছে তাই না।নিরব আছিস নিরব থাক।
হুম নিরব থেকে দেখছি তোমার চারপাশের মানুষগুলো কত সরব তোমার জন্য।এই জ্ঞান অন্ধ মানুষগুলোর সাথে তুমি যা করছো তারা যদি একদিন জানিতে পারে তাহলে মনে রেখো ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ে ভাঁজবে তোমারে, তোমার জলের তলের পীর কে জলে চুবিয়ে মারবে, আর ল্যাংটাবাবারে মোটা কাপড় পড়ায়ে নাচাবে।
চুপ বাবাদের নিয়া একটাও কথা কবি না আমার মরিয়ম ফুল চুরি করে আমারে দিয়ে বল বিশেষ উপহার।
তাতানো বালুর উপর দিয়ে বরফের জুতা পড়ে চলাচল করছো,ভীষণ ভয়াবহ এই পথ!
এবার হুজুর আর কোন কথা না বলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো।
পরদিন সকাল থেকে হুজুর চিন্তা করতে লাগলো কিভাবে তার বউকে শিক্ষা দেওয়া যায়?তার কপালে চিন্তার ভাঁজ,হঠাৎ হুজুর কাঁপতে কাঁপতে হিচকি দেওয়া শুরু করলো,দিনের বেলা এই অবস্থা দেখে রাবেয়া খাতুন দৌড়ে আসে, তারাতারি বরকত কে ডাকে,
বরকত  টপটপে আয় দেখ হুজুর কেমন করচে।
বরকত এসে দাঁড়াতেই হুজুর বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে বলে,তোরা এক অবিশ্বাসী মহিলাকে এই বাড়িতে জায়গা করে দিয়েছিস,উপস্থিত মা ছেলে দুজনই অবার,একে অন্যের মুখের দিকে তাকায়,তারপর আবার হুজুরের দিকে তাকাতেই হুজুর বলে,আজ রাতেই তার ফয়সালা হবে,আমি পাহাড় পীর,আমি পৃথিবীর বিভিন্ন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াই,পাহাড় যেমন নড়ে না আমার কথার তেমন কোন নড়চড় হবে না।
হুজুরের বউ সবই বুঝল কিন্তু এতোগুলো মানুষের বিশ্বাসের মুলে কুঠারাঘাত করা কিভাবে সম্ভব?
যাকে সবাই গ্রহণ করেছে তাকে অবিশ্বাসী করে তোলার কোন রাস্তা সে খুঁজে পায় না।তবুও তার পরিণতি সে আঁচ করছে।
সন্ধ্যার পর বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধে তাকে শিকল পড়িয়ে একটা খুঁটি সাথে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিলেন তিন পীর,উপস্থিত সকলই অবাক! পাহাড়বাবা,ল্যাংটাবাবা,আর খোয়াজবাবা,তিন জনের আদেশ আজ সারারাত সে শিকলে বাঁধা থাকবে বাইরে, কাল প্রত্যুষে তাকে উঠানের মাঝখানে জীবন্ত দাফন করা হবে আর তাকে পাহারা দেবে পাগলাপীর।
সবাই চলে গেছে,ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি নিয়ে বরকতের সামনে কাঁদ কাঁদ গলায় হুজুর বলে পীরের আদেশ,আমি কি করতে পারি বউ?
একরাশ তৃপ্তি নিয়ে হুজুর ঘুমাতে গেল।
এ বাড়ির কুকুরটা সারারাত পাহারা দিল তাকে পীরের হাত থেকে কিন্তু বাইরের হিম বাতাসে সে জমে যাওয়ার উপক্রম।
ভোরের দিকে আবছা ঘুমঘোরে, তখন সে দেখতে পায় কুকুরটা খুঁটির চারপাশের মাটিগুলো সরিয়ে দিচ্ছে পা দিয়ে আর তাতে খুঁটিটা বেশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। অনেক নড়ানড়ি করে খুঁটিটা উপ্রে নিয়ে কোন রকমে খুঁটি থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয়, ভোরের আলো তখনও ফোটে নি।পিছনে শিকলে বাঁধা হাত,অন্ধকারের মধ্যে কুকুরটাই তার নিশ্চিন্ত ভরসা।
পীরদের নাগালের বাইরে তাকে রেখে আবার ফিরে এলো কুকুরটা তখন পূবকোণে রক্তিম আভা।
প্রত্যুষে সকলই যখন উপস্থিত তখন কোথায় সে অপরাধী?
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাকে আর পাওয়া গেল না।
হুজুরের মনে এক অজানা ভয় জলন্ত চুল্লির মত দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।।
লেখক,’
সাদ্দাম বিশ্বাস 
হাতিবান্ধা, লালমনিরহাট