চোখের বালি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (বই রিভিউ)

বইয়ের নাম : চোখের বালি
লেখকের নাম : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বইয়ের সারসংক্ষেপ :

বিধবা রাজলক্ষ্মীর একমাত্র আদরের এবং মাতৃভক্ত ছেলে মহেন্দ্রকে নিয়ে সুখেই দিন কাটতে থাকে। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদে খুব ভালোভাবেই তাদের দিন কাটে। একমাত্র সন্তানকেও শিক্ষিত করে তুলতে থাকেন। ডাক্তারি পড়তে ভর্তি করেন মেডিকেল কলেজে। মহেন্দ্রের বিয়ের বয়স হলে রাজলক্ষ্মী বারবার পুত্রবধূ ঘরে আনার প্রস্তাব করেন ছেলের কাছে। কিন্তু মহেন্দ্র! সে তো মায়ের সুখের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিয়ে করতে নারাজ। তার এক কথা বউ ঘরে আসলে মা পর হয়ে যায়। আসলেই কি মহেন্দ্রর মনের ভাবনা এটা নাকি বিয়ে না করার পেছনে রয়েছে অন্য কিছু?
মহেন্দ্রের কাকী অন্নপূর্ণা খুব করে চেয়েছিলেন তার বোনের মেয়ে আশাকে মহেন্দ্রর বউ করে আনতে। কিন্তু সে রাজি না হওয়ায় তার বন্ধু বিহারীকে প্রস্তাব দেন অন্নপূর্ণা। বাধ্য ছেলের মতো রাজি হয়ে যায় বিহারি। মহেন্দ্র, বিহারির আশাকে জন্য দেখতে গিয়ে নিজেই পছন্দ করে আশাকে। কিন্তু বিহারি কি তা মেনে নিবে?
বিয়ের পর আশার উপর নানান কারণে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেন শ্বাশুড়ি রাজলক্ষ্মী। পুত্র এবং পুত্রবধূর উপর আক্রোশ করে গৃহত্যাগী হনতিনি। গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন বিধবা বিনোদিনীকে যার সাথে আগে মহেন্দ্রর বিয়ের কথা ছিল। তিনি বিনোদিনীর দ্বারা পুত্রের অবৈধ প্রণয়ে প্রশ্রয় দেন। রাজলক্ষ্মী কেন আশার উপর রাগান্বিত হন? কী এমন ঘটেছিল যার কারণে তিনি মা হয়ে বিনোদিনীকে প্ররোচিত করেন মহেন্দ্রকে আশা বিমুখী করতে?
উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র বিহারীর ব্যক্তিত্বখচিত দৃষ্টিভঙ্গি বিনোদিনীকে আকৃষ্ট করলেও বিহারী কখনো সে চোখে দেখেনি তাকে। আশার প্রতি বিহারীর মনের গহীনে লুকায়িত ছিল কিঞ্চিৎ ভালোবাসা। যদিও তা ছিলো অপ্রকাশিত কিন্তু বিনোদিনী তা বিনোদিনীর চোখ এড়ায়নি। বিনোদিনী কি এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে মহেন্দ্র আর আশার সম্পর্কে ফাটল ধরাবে?
আশার ভাগ্য কতটা সুপ্রসন্ন! তার প্রতি একদিকে মহেন্দ্রর স্বামী হিসেবে ভালোবাসা অন্যদিকে বিহারীর ভালোবাসা দেখে তার সুপ্রসন্ন সৌভাগ্যকে হিংসা করতে থাকে বিনোদিনী। কারণ একসময় মহেন্দ্রের বউ হওয়ার কথা থাকলেও আজ সে অন্যের বিধবা স্ত্রী। আর তার জায়গায় সুখের ঘর করছে আশা আবার তার মন আকৃষ্ট করা পুরুষের মনেও আশার বসত। তাই ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে সে। রাজলক্ষ্মীর প্রশ্রয়ে মহেন্দ্রকে আকৃষ্ট করে বিনোদিনী। কী করে বিনোদিনী কাছে টানবে মহেন্দ্রকে? সে কি তাহলে মহেন্দ্রর বাড়ি এসেছে নিজের দূর্ভাগ্যের প্রতিশোধ নিতে? না-কি উপন্যাসের সমাপ্তিতে রয়েছে অন্য কিছু?
বিনোদিনীর বন্ধুত্বসুলভ আচরণে দূর্বল হয়ে পড়ে আশা। তার সাথে গড়ে তোলে সখ্যতা। আশার সারল্য ও শিথিলতা মহেন্দ্র ও বিনোদিনীর অবৈধ সম্পর্ককে আরো কাছাকাছি আনে। বিহারীর প্রতি আশার বিবেচনাশূন্য দৃষ্টিভঙ্গি বিহারীকে কর্ম ও জীবনক্ষেত্র থেকে উন্মুলিত করে। মহেন্দ্র ও বিনোদিনীর পরষ্পরের কখনো আকর্ষণ, কখনো বিকর্ষণবোধ উপন্যাসের ঘটনাধারাকে প্রবাহিত করে।
কী হবে মহেন্দ-আশার সম্পর্কের পরিণতি? চারটি চরিত্রের ভাগ্যে কী আছে উপন্যাসের শেষে?

ভাষা ও চরিত্র বিশ্লেষণ: 

সাধুভাষায় রচিত চোখের বালি উপন্যাসটি ছিল পাঠক বোধগম্য। শব্দের গুরুগম্ভীরতা পাঠককে বিভ্রান্ত করেনি। আর চরিত্র রূপায়ণ ছিল বেশ প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ। লেখক পাঠকের মাঝে ঘটনাবলির আবর্তনে সৃষ্টি করেছেন আকর্ষণ। প্রতিটি চরিত্রে ছিল নিজস্ব স্বকীয়তা। সবচেয়ে ভালো লাগার মতো চরিত্র ছিল বিহারি। নিঃস্বার্থ, বন্ধু পরায়ণ এমন চরিত্র বাস্তব জীবনে পাওয়া কঠিন। তাছাড়া বিনোদিনী চরিত্রটিতে ছিল বহুরূপী। তাকে বুঝা পাঠকের জন্য যেন ছিল কাঠ খড় পোড়ানো। সে কখনো পাঠকের দৃষ্টিতে খল নায়িকা আবার কখনো অতি ভালো একজন মানুষ যাকে শুধুমাত্র উপন্যাসের নায়িকা রূপেই মানায়। এদিকে উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র মহেন্দ্র। তার প্রতিটি কর্মই যেন মনে হয়েছে সে শুধু পেতেই এসেছে দিতে নয়। উপন্যাসের সবচেয়ে নির্লিপ্ত চরিত্র ছিল আশা। জগতের যেন এক অবুঝ শিশুসুলভ ভাব ছিল তার চরিত্রে। আর রাজলক্ষী চরিত্রটিও পাঠক দৃষ্টিতে নজর কেড়েছে। সম্পূর্ণ উপন্যাস জুড়েই তিনি ছিলেন স্বার্থপর মা। তার ব্যক্তিগত অভিমত ছিল নিজের ছেলেকে সর্বদাই নিজের বাধ্যগত রাখা। হয়তো তিনি তা পেরেছিলেন কিংবা পারেননি।

পাঠ প্রতিক্রিয়া:

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের বই পড়ে মন্তব্য করার সাধ্য আমার মতো ক্ষুদে পাঠকের নেই। তবুও কিছু কথা না বললেই নয়। আমার কাছে মনে হয় রবি ঠাকুরের বই মানেই অনন্য এক সৃষ্টি। আর চোখের বালি উপন্যাসটি একটি অসাধারণ ব্যতিক্রমধর্মী প্রেমের উপন্যাস। কারণ গতানুগতিক অন্যসব উপন্যাসের মতো রোমান্টিকতা ও ভাবালুতা আশ্রিত নয়। বিনোদিনী-মহেন্দ্রসহ আশা ও বিহারী সমেত আরো অনেকের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার বাস্তবভিত্তিক রচনা এই বইটি।প্রতিটি চরিত্রের স্বকীয় স্বাতন্ত্র্য উপন্যাসের কাহিনী ও চরিত্রচিত্রণকে প্রচালিত করেছে। এই উপন্যাসের প্রধান কাহিনী ছিলো মহেন্দ্র বিনোদিনীর প্রেম খেলা। এই প্রেম খেলার শুরুটা ছিলো মহেন্দ্রের মায়ের ঈর্ষাপরায়ণতা যা উপন্যাসটিকে ভিতর থেকে ধাক্কা দিয়ে দারুণ করে তুলেছিল। এই ঈর্ষা উপন্যাসের ঘটনাগুলো একে একে বের করে আনে। আমার পাঠক হৃদয়কে এসব ঘটনাবলীর পরিশেষ জানার আগ্রহ বইটি পড়ার প্রতি প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। বইটি পড়তে গিয়ে বারবার আমার অনুভূতির পরিবর্তন আমার মাঝে সৃষ্টি করে মিশ্র অনুভূতির আবেশ। যতটা আগ্রহ নিয়ে আমি বইটি পড়া শুরু করেছিলাম তার চেয়ে বেশি উপভোগ করেছি বইটি। সর্বসাকুল্যে মনে হয় বইটি পড়ে সার্থক আমার পাঠক হৃদয়।

পাঠক দৃষ্টিতে বইটির গ্রহনযোগ্যতা:

বাংলা সাহিত্যে যুগে যুগে অনেক লেখক রেখে গেছেন তাদের অমর সৃষ্টি। তার মধ্যে চোখের বালি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। বাংলা উপন্যাসের এক সার্থক উপন্যাস চোখের বালি যার রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই সার্থক উপন্যাসের স্বাদ নিতে আপনার একবার হলেও পড়া উচিৎ চোখের বালি উপন্যাসটি। বাস্তবধর্মী এই উপন্যাস থেকে নিজের জীবনের কিছু ঘটনারও শিক্ষা পেতে পারবে পাঠক।
আপনি বইটি পড়লে জানতে পারবেন বইটির নামকরণের কারণ, পুত্রবধূর প্রতি রাজলক্ষ্মীর ঈর্ষার কারণ, মহেন্দ্র-বিনোদিনীর অবৈধ প্রেমের শেষ পরিণতি, বিহারীর অপ্রকাশিত ভালোবাসার ফলাফল, আশার সারল্যতার পরিণাম।

উপন্যাস মূল্যায়ন: 

ভালো দিক: সামাজিক উপন্যাসের বই চোখের বালি। বইটি সহজ শব্দ চয়নে সাধুভাষার প্রয়োগ যে কোনো পাঠকের বোধগম্য। পারিবারিক সম্পর্কের আদলে গড়া এই উপন্যাসটিতে সমাজের নৈতিক সমুৎকর্ষমূলকতার দর্শনকে নির্দেশিত করে। তাছাড়া ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ত্যাগের মহিমাকেই আদর্শায়িত করা হয়েছে উপন্যাসটিতে। লেখক প্রতিটি চরিত্রকে উত্তমরূপে রূপায়ণ করেছেন। যার ফলে পাঠক দৃষ্টিতে প্রতিটি চরিত্র এবং তাদের কর্মকাণ্ড মূখ্যরূপে অবতীর্ণ হয়েছে। সবমিলিয়ে চিত্তাকর্ষক একটি উপন্যাস চোখের বালি। লেখকের চমৎকার উপস্থাপনা উপন্যাসটিকে করে তুলেছে প্রাণচঞ্চল। পাঠক পেয়েছে সাহিত্যের অমৃত স্বাদ।

খারাপ দিক : 

বইটি একাধিকবার পড়েছি। কিন্তু আদৌ কি কোনো খারাপ দিক আছে বইটির? না আমি কোনো খারাপ দিকই খুঁজে পাইনি। কী করে পাবো! চোখের বালি বইটি যে একটি সর্বাঙ্গসার্থক উপন্যাসের বই। তবে একটা দিক মনে হচ্ছে লেখক চাইলে বিনোদিনীকে ভিন্নভাবে তুলে ধর‍তে পারতেন। বিনোদিনী তার শিক্ষার সাথে বা ব্যক্তিত্বের সাথে মিল রেখে আরও উন্নতভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন লেখক। তবে এটা শুধুই আমার একান্তই মনের ধারণা। কিন্তু লেখক তার স্বতঃস্ফূর্ততায় যতটুকু সাজিয়েছেন তার কাছে আমার ধারণা তুচ্ছ।

প্রিয় উক্তি:

“যাহা যথার্থ গভীর এবং স্থায়ী তাহার মধ্যে বিনা চেষ্টায় বিনা বাধায় আপনাকে সম্পূর্ন নিমগ্ন করিয়া রাখা যায় বলিয়া তাহার গৌরব আমরা বুঝিতে পারি না। যাহা চঞ্চল ছলনামাত্র যাহার পরিতৃপ্তিতে ও লেশমাত্র সুখ নাই তাহা আমাদিগকে পশ্চাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘোড় দৌঁড় করাইয়া বেড়ায় বলিয়াই তাহাকে চরম কামনার ধন মনে করি।”
“বিবাহ না করিয়া ঠকা ভালো , বিবাহ করিয়া ঠকিলেই মুশকিল।”
লেখক,
মোঃ আনারুল ইসলাম রানা
ইসলাম শিক্ষা বিভাগ,
কারমাইকেল কলেজ, রংপুর