ক্রীতদাসের হাসি – বই রিভিউ

ক্রীতদাসের হাসি
-শওকত ওসমান
আরবের সুপ্রাচীন এবং সকলের পরিচিত গ্রন্থ ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা’-(সহস্র ও এক রাত্রি) কিন্তু মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিলো ‘আলেফ লায়লা ওলা লায়লানে’ অর্থাৎ ‘সহস্র ও দুই রাত্রি’। ক্রীতদাসের হাসি সেই বিখ্যাত গ্রন্থের সর্বশেষ অনুচ্ছেদের অনুবাদ। লেখক দৈবচক্রে এর পাণ্ডুলিপি হাতে পেয়েছিলেন। দৈবচক্রে কেন? চলুন পেছনের ঘটনা জানা যাক।
লেখক একবার তাঁর দু’বন্ধু(মৌলনা জালাল ও মাসুদ)কে নিয়ে ছুটি কাটাতে ঘুরতে বেড়িয়েছিলেন। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য তাদের ছিলোনা অর্থাৎ নেহায়েত নিরুদ্দেশের পাড়ি কিন্তু নানা দুর্বিপাকে এসে পৌঁছালেন এক অখ্যাত পাড়াগাঁয়ে লেখকেরই এক সহপাঠিনী রউফুন নেসা’র বাড়িতে। দশ বছর যাবৎ তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিলোনা। এখানে এসে লেখক জানতে পারলেন রউফুন নেসা নিজ গ্রামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং নিজে প্রধান শিক্ষক, সংসারে আছেন কেবল নব্বই বছরের পিতামহ শাহ্‌ ফরিদউদ্দীন জৌনপুরী। যিনি গত ত্রিশ বছর যাবৎ বাইরের জগতের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেন না। কেননা তিনি ঠিকমতো কানে শুনেন না আবার চোখেও দেখেন না। প্রথম জীবনে বর্মাযুদ্ধের সময় লুসাই অঞ্চলে লড়াইয়ে যান এবং পরে গৃহত্যাগ করে যান বিহার-যুক্ত প্রদেশ এলাকায়। ফিরে আসেন আরবি-ফার্সির বিরাট মৌলানারূপে। তাঁর সংগৃহীত পাণ্ডুলিপিশালা যেকোনো প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিরাট সম্পদ।লেখকরা তিনজন- বন্ধুর বাসায় একদিন কাটিয়ে পরদিন সকালে বিদায় নেন। অতিথি আপ্যায়নে ঘটা ছিল বেশি। তাই জালাল রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘রউফুন, তুমি কী আমাদের সেই ‘সহস্র ও এক রজনী’ বা ‘আলেফ লায়লা ও লায়লা’র পেটোরোগী বানাতে চাও যে গৃহকর্তা রুটি আনতে গেলে তরকারি খেয়ে বসত আর তরকারি আনতে গেলে রুটি খেয়ে ফেলত।’ তারপর সকলে তুমুল হাসি হাসছিলো।

দাদু সাহেব কানে না শুনলেও হট্টগোলে সচেতন। দাদু রউফুনকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। ফরিদউদ্দীন জৌনপুরীর কানের কাছে রউফুন মুখ নিয়ে বলেছিলো, “দাদু, ওরা ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা’র গল্প নিয়ে হাসাহাসি করছে।”
দাদু হেসে হেসে বলেছিলেন “বন্ধুগণ, ওটা আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা(সহস্র ও এক রাত্রি) নয়। ও কেতাবের পুরো নাম “আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে (সহস্র ও দুই রাত্রি)।”

-‘দাদু আমি ইংরেজির ছাত্র, আমি শুনেছি ‘Thousands and one night’ সহস্র ও এক রাত্রি।’- জবাব দেয় মাসুদ।
-তোমরা ভুল শুনেছ। তোমরা ত পড়ো বেঈমান ইংরেজের কেতাব। যাদের গোলাম ছিলে দেড়শ’ বছর। আসল বই ত দ্যাখোনি। দাদু চোখে না দেখলেও উঠান-ঘর, ঘরের ভিতর কোথায় কী আছে সব মুখস্থ। আলমারি খুলে ঠিক তৃতীয় সেলফের মাঝখান থেকে একটা কেতাব বের করলেন।
বিরাট পাণ্ডুলিপি। ছাপা কেতাব নয়। মলাট খোলার পর দেখা গেল কেতাবের নামঃ আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে।

লেখক শওকত ওসমানসহ সবাই অবাক হলেন। মাসুদ জিজ্ঞেস করলো- “দাদু আপনি এই পাণ্ডুলিপি কোথায় পেয়েছেন?”
দশ মিনিট ধরে তিনি ইতিহাস শুনালেন। হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের সময় এই পাণ্ডুলিপি আসে হিন্দুস্থানে। নানা হাত-ফেরীর পর পৌঁছায় শাহ্‌ সুজার কাছে। তিনি আরাকানে পালায়নের সময় পাণ্ডুলিপি মুর্শিদাবাদে এক ওমরাহের কাছে রেখে চলে যান আর সেখান থেকে পান তিনি-ফরিদউদ্দীন জৌনপুরী।

সবাই উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করলো। মাসুদ জিজ্ঞেস করলো- “দেখেন ত শেষ গল্পটা কী? অর্থাৎ হাজার এক রাত্রির গল্পটা।”
মাওলানা জালালা বলল- “শাহজাদা হাবিবের কাহিনী”।
-তাহলে ঠিক আছে। তারপরের কাহিনীর নাম কী?
মাওলনা জালাল পাণ্ডুলিপি ঘেঁটে জবাব দিলেন, ‘জাহাকুল আবদ’ অর্থাৎ গোলামের হাসি।
লেখকরা সবাই বিস্মিত। বিশ্বের বিস্ময় এই পাণ্ডুলিপি। জনাব শওকত ওসমান প্রস্তাব দিলেন -“দাদু এইটা আমরা কপি করে নিতে চাই আমাদের লাইব্রেরির জন্যে পরে আপনেরটা আপনার কাছে পাঠিয়ে দিব।” ঈষৎ কাঠখড় পোড়ানোর পর দাদু রাজি হলেন। রউফুন তাদেরকে বলল দাদু এসব নিজের কাছ থেকে কখনো দূরে সরান না।

লেখক জনাব শওকত ওসমান পাণ্ডুলিপিটি পেয়ে খুশিতে প্রায় আত্মহারা হয়ে গেছিলেন। এই রত্নগুহা থেকে আবিষ্কৃত একটি রত্ন পৃথিবীকে না দেখানো পর্যন্ত তাঁর আর স্বস্তি লাগছিলো না। বন্ধু মাওলানা জালালকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন কেননা জালালেই এই পথ ধরে নিয়ে এসেছিলো তাকে। শহরে ফিরেই শওকত ওসমান বন্ধু মাওলানা জালালের সহায়তায় ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে’র শেষ কাহিনীটা বাংলায় তরজমা করে ফেললেন- “ক্রীতদাসের হাসি” নামে।

‘ক্রীতদাসের হাসি’তে মঞ্চ নাটকের সংলাপের মতো পুরো বই জুড়ে কথোপকথন। কখনোবা খলিফা হারুনের সাথে বেগমসাহেবা জুবায়দার, দৃশ্যপট পালটে কখনোবা মাশরুর(পুরাতন জল্লাদ), কবি ইসহাক, কবি নওয়াস, হুকুমপালনকারী মোহাফেজ(রক্ষক)। আবার অন্যান্যরা নিজেদের মধ্যে। মূল ঘটনা বাঁদী মেহেরজান ও হাবসি গোলাম তাতারীকে নিয়ে।

বেগমসাহেবা জুবায়দা, বাঁদী মেহেরজানের সাথে হাবসী গোলাম তাতারীর গোপনে দেখা করার সুযোগ করে দেন খলিফা হারুনের অগোচরে। মেহেরজান খুব ভয়ে থাকেন যদি খলিফা দেখে ফেলেন। তাতারী অপেক্ষায় থাকে তরুলতা শোভিত প্রাঙ্গণ চত্বরের শেষ প্রান্তে। সেখানে মেহেরজান আর তাতারী পরস্পরের গোপন সান্নিধ্যে আসে। আজ মেহেরজানের খুব ভয় করছে তার যেতে ইচ্ছে করছেনা কিন্তু তাতারী ত অপেক্ষায় থাকবে অপরদিকে বেগমসাহেবাও অভয়বাণী দিচ্ছেন।

হারুন আর মাশরুর কথোপকথন চলছে। হারুনের কিছু ভালো লাগে না। পুরাতন স্মৃতিরা বারবার মনে পড়ে। নিজের বোন আব্বাসাকে মেরে একাই রাজত্ব নিয়েছেন। মাশরুর বলে জাঁহাপনা কিছুদিন বাগদাদের ঝামেলা ছেড়ে অন্য কোথাও চলুন যাই। হারুন বলে কিন্তু আব্বাসা আমার সঙ্গ ছাড়বেনা। ঘরের মধ্যে জ্যান্ত কবরে দাফন হল তার। সোজা কথায়, পুঁতে ফেললাম, কতটুকু তার অপরাধ ছিলো? বলেই খলিফা হারুনর রশীদ হা হা রবে উন্মত্তের মত হেসে উঠলেন। মাশরুর পাথরে মূর্তির মত ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। খলিফা পায়চারী করতে করতে বলে উঠলো- উপ্রে ফেলতে চাই সমস্ত স্মৃতি।
মাশরুর বলে জাঁহাপনা চলুন বাগানে যায়।
খলিফা তার কথায় রাজি হয়ে বাগানে হাটতে বের হলেন। হাটতে হাটতে রাজ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলে এবং মাশরুরকে ধন্যবাদ জানান বাগানে নিয়ে আসার জন্য। এখানে এসে তাঁর খুব শান্তি লাগছে। হঠাৎ হারুনর রশিদ থমকে দাঁড়ান হাসি শুনে। আমার মহলের গায়ে কে হাসছে এত রাতে মাশরুর? চতুর্দিকে যেন হাসির শব্দে দোলা খাচ্ছে। মাশরুর কে হাসছে আমার দেওয়ালের ওদিকে?
মাশরুর বলে জাঁহাপনা ওদিকে গোলামরা থাকে। আমার হিংসা হয় মাশরুর, আমি বাগদাদ অধীশ্বর সুখ ভিক্ষুক, গোলামেরা এমন হাসি হাসতে পারে? মনে হয় জ্বীন-পরীর হাসি। কিন্তু মিহি মোটা দুটা হাসি যেন একত্রে আসছে। সকাল হয়ে আসছে প্রায়। হারুন মাশরুরকে নিয়ে চলে গেলেন এবং বললেন এঘটনা কেউ যেন না জানতে পারে।
২য় রাত্রিতে আবার ঘুরতে এসে সেই হাসি শুনতে পান আজ আরো বড় তীব্র, মানব-মানবীর মিলিত হাসি।
মাশরুর এর তল্লাশ কর। মাশরুর প্রহরীদের নিয়ে তল্লাশ করতে চাইলে তিনি বাধা দেন। হট্টগুলে সব পশু হয়ে যায়। তাড়াহুড়োই কিছু হবেনা।
৩য় রাত্রিতে মাশরুর খলিফা হারুনকে দূরের গাছের আড়াল থেকে উঁচু ডালে উঠে দেখালেন আর্মেনীয় মেহেরজান ও তাতারীর গোপন আলিঙ্গন। মাশরুদের সাথে ছিলেন কবি ইসহাক।

মরুভূমিতে বাতাসে ধূলাবালী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ঘরের জানালা উপরে হয়ে থাকে তাই সমতল জায়গায় দাঁড়িয়ে রুমের ভিতরে দেখা যায় না।
মাশরুরকে খলিফা জিজ্ঞেস করলেন আমার মহলের কোন বেগম না বাঁদী? মাশরুর মাথা নিচু করে থাকে। কিছু বলতে চায়না সে মাফ চাই।
-মাথা তুলো মাশরুর। ব্যভিচারিণী কোন বেগম থাকলে তোমার কি উচিত নয় হুঁশিয়ার হওয়ার জন্যে খবর দেওয়া?

অন্যদিকে তাতারী আর মেহেরজানে প্রেমে মত্ত।বেগমসাহেবা তাদের সুযোগ করে দিয়েছে তাহলে আর কিসের ভয়। তাতারী আর মেহেরজান প্রেমালাপে অন্ধকারে হাসতে থাকে।

কবি ইসহাক এসেছে আমিরুল মুমিনিনকে কবিতা শুনাতে। ইসহাক ইরানী ও মিশরীয় মেয়েদের নিয়ে কবিতা শুনালেন। খলিফা হারুন আর্মেনিয়া মেয়েদের নিয়ে কবিতার কথা জিজ্ঞেস করলেন। কবি ইসহাক বললেন জাঁহাপনা আজ প্রথম দেখলাম আরমেনী মেয়ে। কী দেখলে? দেখলাম কিন্তু বুঝতে পারলাম না- দেহের প্রতীক ছন্দ নাকি ছন্দের প্রতীক দেহ।

পরদিন রাত্রে- গোলাম বস্তী নিঝঝুম। মেহেরজান ও তাতারী ঘুমিয়েছিলো, মৃত্যু-রূপা ঘুম, একে অপরের অঙ্গের পাকে পাকে একাকার। হঠাৎ খলিফা হারুন, মাশরুর, ইসহাক ও কয়েকজন কোতোয়াল নিয়ে এসে হাজির গোলামদের এই বস্তিতে। দরজায় করাঘাত করা হল। কোন সাড়া শব্দ নেই। এই গোলাম দরজা খোল। মেহেরজান ভয়ে আতঙ্কিত। তাতারী দরজা খোলে দেয় আর ততক্ষণে মেহেরজান কালো বোরখা পরে অন্ধকারে দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে থাকে। তাতারী আমেরুল মুমেনিনকে দেখে ক্ষমা চাচ্ছেন, শির ঝুঁকিয়ে কঠোর সাজা চাচ্ছেন। খলিফা হারুন বলেন- ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়েছিস, আরো আলো, আরো রোশনাই চাই।
-গরিবের তো আর কিছু নেই। কতোয়ালদের দিয়ে মাশরুরের মাধ্যেম আলো আনালেন।তাতারী ভয়ে করজোড়ে -গোস্তাখি মাফ করবেন জাঁহাপনা আপনার পয়জার এই গোলামদের বস্তীতে জিল্লুল্লাহর আবির্ভাব?
কবি ইসহাক জবাব দেয় -জাঁহাপনা তোর হাসি শুনে সন্তুষ্ট হয়েছে। তোর জন্য ইনাম(পুরস্কার) নিয়ে এসেছেন।
তাতারী- আমাকে আর গোনাহগার করবেন নানা, গোলামের আবার হাসি।
কোতোয়ালের আলোতে চোখে পড়ে দেওয়ালের সাথে লেগে থাকা কালো বোরখা। হারুন জিজ্ঞেস করে ঐটা কী?
উত্তর না দিয়ে তাতারী চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকায়, খলিফা হারুন মাশরুরকে আদেশ করেন -এর জিভ ছিঁড়ে নাও এখনো জবাব দিচ্ছেনা।

তবু তাতারী কোনো কথা বলছেনা দেখে আবার হারুন বলে উঠেন একে কতল করো এখনি।
বোরখা খুলিতে খুলিতে মেহেরজান বেরিয়ে আসে এবং বলে ওকে মাফ করুন।
খলিফা হারুন মাশরুরকে বলে থামো উত্তর পাওয়া গেছে এ দেয়ালের ভিতর থেকে চাঁদ কোথা থেকে উদয় হল?
নতজানু হয়ে মেহেরজান বলে আমি আপনার আরমেনী বাঁদী।
তাতারীর প্রতি খলিফা হারুন বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং তার স্পর্ধা নিয়ে কথা বলেন। তাতারী বলে জাঁহাপনা বান্দা গোনাহগার, আপনার যা মরজি তাই করুন। তাতারীর চমৎকার কথায় হারুন খুশি হন। কবি ইসহাক বলে যারা সুন্দর কথা বলে তারা সুন্দর হাসতেও পারে খলিফা হারুন সকলকে ডেকে বলেন এই বান্দা বান্দি যে কাজ করেছে তার শাস্তি কী? তলোয়ারে গর্দান গ্রহন করা যায়, অঙ্গচ্ছেদ করা চলে? কিন্তু তলোয়ারের আরো ক্ষমতা আছে, সে লোহার জিঞ্জির ছিন্ন করতে পারে।  আজ থেকে এ দুজন আজাদ, মুক্ত- স্বাধীন নাগরিক।সকলে হারুনের প্রশংসায় মারহাবা মারহাবা ধ্বনি দেন। হারুন তাতারীকে বাগদাদ শহরের বাগীচা এবং এখানকার গোলাম, মালমাত্তা আসবাব সবকিছুর মালিক করে দেন। মেহেরজানকে জায়েদার কাছে নিয়ে যান সে এখন আর বাঁদী নয়।

তাতারীর বাগিচা। কার্পেট শোভিত কক্ষ।
হারুন, কবি ইসহাক, আতাহিয়া, কবি নওয়াস সবাই তাতারীর খোঁজ খবর নিতে এসেছে এবং তার হাসি শুনবে। কিন্তু তাতারী কিছুতেই হাসতে পারছেনা। মাশরুরকে তলোয়ার খুলতে বললেন। কবি নওয়াস বলল হাসির জন্য উপাদান লাগে জাঁহাপনা। হারুন বলে উঠে তোমাদের মত কবি সঙ্গে থাকলে আর খেলাফত চলবেনা। মাশরুর তরবারী নামাও তাতারীর জন্য উপাদানের ব্যবস্থা কর।বাগদাদের সবচেয়ে সুন্দরী বাঁদি বুসায়ানাকে পাঠানো হল তাতারীর ঘরে। তাতারী কোনকিছুতেই বুসায়ানাকে গ্রহণ করলো না। কিন্তু বুসায়ানা প্রতিজ্ঞা করেছিলো তাতারীকে হাসাবেই নয়তো সে মুখ দেখাবেনা। তাতারী বলল সকালে আমি জাঁহাপনার কাছে সব বলব তুমি ঘুমিয়ে থাক। কিন্তু বুসায়ানা এখান থেকে পলায়ন করে নিজেকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করে। দোষ এসে পড়ে তাতারীর ঘাড়ে।  তাতারী কোন কথা বলেনা। নওয়াস বলে জাঁহাপনা তাতারী কালো পাথর, কালো পাথর কোনদিন নকল হয়না। হারুন নওয়াসকে ধমক দেয়-চুপ কর, তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো। নেওয়াস বলে – ভুলকে ভুল বলা কবিদের ধর্ম।
আমি ভুল করেছি নওয়াস? তোমার বুকের পাটা আল্লাহ্‌র জমিন ছাপিয়ে যাচ্ছে। নওয়াসকে সকলের সামনে মাফ চাইতে বলা হল কিন্তু নওয়াস বলল-জাঁহাপনা আমার কোন ভুল নেই। হারুন মাশরুরকে আদেশ দিলো- নেওয়াসকে কয়েদখানায় রাখো, কাল দরবারে নতুন বিচার হবে এই নাফরমান অবাধ্য কবির।

তাতারীর মুক্তি মিলবে যদি সে হাসি শুনাতে পারে। তাকে তিনদিন সময় দেওয়া হল কিন্তু সে কোন কথায় বলল না। তার উপর বেত্রাঘাত চলতে থাকলো তবু কোন কথা নেই। এভাবে চার বছর চলে গেলো শরীরে চামড়া খসে পড়েছে, ক্ষত হয়েছে, মাংস বলতে শরীরে আর কিছু নাই। চেহারায় আর তাতারীকে চেনা যায় না। তবু মুখ থেকে হাসি ত দূরের কথা কোন কথা বের হলনা। তাতারীর সামনে মেহেরজানকে আনা হল। মেহেরজান চিনতেই পাড়েনি। সে জিজ্ঞেস করে কে এই গোলাম? হারুন বলে তুমিই জিজ্ঞেস করে জবাব নাও। কিন্তু সেও ব্যর্থ হল। হারুন বলে মেহেরজান তুমি ওকে চেনো। মেহেরজান অবাক হয়ে বলে আমি চিনি? হারুন বলে হ্যাঁ। ওই কোঁকড়া কঠিন চুলের দিকে তাকাও। গায়ের চামড়া ত আর কালো নেই, চুল ঠিক আছে।

মেহেরজান বলে-তুমি কে কয়েদি? জবাব দাও।
হারুন বলে আমরা চারবছর ধরে জবাব পাইনি।
-কিন্তু একে আমি চিনতে পারছি না জাঁহাপনা।
খলিফা হারুন হাসতে হাসতে বলে গোলাম তাতারীকে আজ চিনতে পারলে না, মেহেরজান?
মেহেরজান বলল কিন্তু তার এই অবস্থা কেন?তার কী অপরাধ?
-মুখের কথা বন্ধ করেছে। বাগবাগিচা, বাঁদী গোলাম, ইমারৎ কী দেইনি। মুখের কথা বন্ধ করলো, হাসি শুনালো না।
মেহেরজান বলে উঠলো যে নাফরমান তাকে কতল করলেন না কেন?
-ওকে হিকামতে শাস্তি দিব বলে। আজো ও কথা বলুক আমি মাফ করে দিব।
মেহেরজান তাতারীকে কথা বলার জন্য অনুরোধ করে বলতেছে তাতারী জবাব দাও, তোমার শরীর জখমে খুনে জারেজার, এই যন্ত্রণা কেন সহ্য করবে? কথা বল।
তাতারী নিরুত্তর।
হারুনর রশীদ উচ্চস্বরে হাসতে লাগিলেন।
মেহেরজান হারুনর রশীদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইছেন- তাতারীকে কতল করুন, ওর এই যন্ত্রণা আর সহ্য করা যাচ্ছে না।
হারুনর রশীদ বললেন না না এত সহজে তাকে কতল করবো না তাকে মারবো তিলে তিলে দগ্ধে দগ্ধে।
মেহেরজান তার পূর্ব স্মৃতিচারণা করে তাতারীকে বলে, তুমি যা বলতে- এত যন্ত্রণা বুকে আজও তাই মনে রেখেছো। তুমি বলতে- মেহেরজান, গোলামের মহব্বত আলাদা চিজ। গোলামের প্রেম ধ্রুবতারার মত স্থির -আকাশের একটি প্রান্তে একাকী মৌন-অবিচল, তুমি তেমনই অবিচল আছো কিন্তু আমি বিনিময়ের ভাঁটিতে সিদ্ধ হয়ে গেলাম আর বন্ধী থাকলাম না।
হারুন দুই প্রহরীকে আদেশ দিলেন- এই সাহেবাকে বাইরে নিয়ে যা।

মেহেরজান পশ্চাতে মুখ করে- তোমার যন্ত্রণা মুছে নিতে পারলাম না, তোমার নির্মল দেহ স্পর্শের যোগ্যতা আমার আর নেই, নাই বা স্পর্শ করলাম এই কলঙ্কিত হাতে। চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলো তাতারী তাতারী।
-তাতারী মেহেরজানের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে- শোন হারুনর রশীদ
হারুন বেয়াদব বলে- মাশরুরকে চাবুক চালাতে বলেন।
তাতারী সেই অবস্থায় বলে- শোন হারুনর রশীদ, দীরহাম দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস-গোলাম কেনা চলে। বান্দী কেনা সম্ভব কিন্তু ক্রীতদাসের হাসি- না- না- না।
পতন ও মৃত্যু বেগে আবু নওয়াস প্রবেশ করে বলে- আমিরুল মুমেনীন হাসি মানুষের আত্মারই প্রতিধ্বনি।
(এরপর পাণ্ডুলিপি ছিন্ন মানে পাণ্ডুলিপিতে বাকি পাতা গুলো আর পাওয়া যায়নি।)
এই ছিলো ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে’র শেষ পরিচ্ছদ ‘জাহাকুল আবদ’র তরজমা শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’।

লেখক,
মোঃ মতিউর রহমান সুমন
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।